বাঙালি পল্টন
ব্রিটিশ ভারতে ফরাসি ও ব্রিটিশ
বাহিনীতে বাঙালিদের অন্তর্ভুক্তির ধারায় গড়ে উঠেছিল বাঙালি পল্টন। যদিও ‘বাঙালি
পল্টন’ বলতে মূলত ব্রিটিশদের উদ্যোগে গঠিত বেঙ্গলি ডাবল কোম্পানি এবং পরবর্তীকালে
গঠিত ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্ট-কেই বোঝানো হয়, বাঙালিদের যুদ্ধসৈনিক হিসেবে বিদেশি
ঔপনিবেশিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির একটি প্রাথমিক ঘটনা ঘটেছিল ফরাসিদের উদ্যোগে।
১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জুলাই থেকে
ইউরোপে
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ নভেম্বর যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে
এর সমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সের বিপুলসংখ্যক সৈন্যের
প্রয়োজন দেখা দেয়। ফরাসি ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সৈন্য সংগ্রহের
পাশাপাশি ফরাসি-অধিকৃত ভারতীয় উপনিবেশগুলো থেকেও সৈন্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ফরাসি ভারতের প্রধান কেন্দ্র ছিল পুদুচেরি (পন্ডিচেরি); বাংলায় ফরাসিদের
গুরুত্বপূর্ণ উপনিবেশ ছিল চন্দননগর।
এই সময় পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের
combatant soldier
হিসেবে নেওয়া হতো না বললেই চলে। উনিশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ সামরিক প্রশাসনের মধ্যে
বাঙালিদের তথাকথিত
‘non-martial’
বা অযোদ্ধা জাতি হিসেবে দেখার প্রবণতা গড়ে উঠেছিল। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়
বাঙালিদের সেনাবাহিনীতে গ্রহণের বিষয়টি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
ফরাসি গভর্নরের আহ্বান
চন্দননগর ছিল ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে অবস্থিত একটি ফরাসি উপনিবেশ। ১৯১৬
খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি গভর্নর Martineau
(মার্তিনো) চন্দননগর সফর করেন। গবেষণামূলক একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯১৬
খ্রিষ্ঠাব্দেএ ২৩ জানুয়ারি তিনি চন্দননগরের জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়ে
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সকে সাহায্য করার আহ্বান জানান এবং ভারতীয়দের ফরাসি
সেনাবাহিনীতে নিয়োগের কথাও বলেন। তাঁর এই উদ্যোগের পর চন্দননগরের প্রশাসনের অধীনে
C. Vincent-এর
নেতৃত্বে একটি নাগরিক কমিটি গঠিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল যুবকদের ফরাসি সেনাবাহিনীতে
যোগ দিতে উৎসাহিত করা।
চন্দননগরের এই আহ্বানে প্রায় ৭৫ জন বাঙালি যুবক
স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে আসেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জনকে
সামরিকভাবে উপযুক্ত বলে নির্বাচিত করা হয়। তাঁদের প্রথমে প্রশিক্ষণের জন্য
পন্ডিচেরিতে পাঠানো হয়।
১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ এপ্রিল ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
এঁরা সবাই 'Victoria' 'Interallie' ও 'Volunteer' নামে তিন ধরনের পদক পেয়েছিলেন। এই
বাহিনীতে অংশগ্রহণকারী সিদ্ধশ্বর মল্লিক এবং হারাধন বক্সী অস্থায়ী ব্রিগেডিয়ার
পদে উন্নীত হয়েছিলেনল
বাঙালি পল্টন ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়
ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে গঠিত বাঙালি সৈন্যদের একটি সামরিক ইউনিট। এর
আনুষ্ঠানিক নাম ছিল
49th Bengalis
বা
49th Bengal Regiment।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগ
উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়ে পড়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রয়োজনে ব্রিটিশ সরকার
সেই নীতিতে পরিবর্তন এনে পুনরায় বাঙালিদের
combatant
(যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী সামরিক সদস্য, সংক্ষেপে প্রত্যক্ষ যোদ্ধা)
হিসেবে নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এই উদ্যোগের ফলেই বাঙালি পল্টনের সৃষ্টি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও বাঙালি সৈন্য সংগ্রহ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জুলাই এবং যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়
১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ নভেম্বর। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ
সাম্রাজ্যের বিপুলসংখ্যক সৈন্যের প্রয়োজন দেখা দেয়। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীও
এই যুদ্ধের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়োগনীতি
নতুনভাবে সাজায়। এই সময় তথাকথিত
Martial Race Theory
বা ‘সামরিক জাতি’ তত্ত্বের প্রভাব ভারতীয় সেনা নিয়োগনীতিতে প্রবল হয়ে ওঠে। এই
ধারণা অনুযায়ী শিখ, গুর্খা, পাঞ্জাবি, পাঠান, জাট প্রভৃতি জনগোষ্ঠীকে সামরিকভাবে
অধিক উপযুক্ত মনে করা হতো। বিপরীতে বাংলাসহ কয়েকটি অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে
তুলনামূলকভাবে
‘Non-Martial’
বলে চিহ্নিত করা হয়। ফলে বাঙালিদের প্রত্যক্ষ যোদ্ধা হিসেবে নিয়োগ দীর্ঘদিন
অত্যন্ত সীমিত ছিল। বিশেষত বঙ্গীয় সমাজে ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক ও বিপ্লবী
আন্দোলনের প্রসার ব্রিটিশ প্রশাসনের এই অনীহাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু প্রথম
বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈন্যের প্রয়োজনীয়তা এত বৃদ্ধি পায় যে বাঙালিদেরও সামরিক
বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।
বাঙালি সৈন্য সংগ্রহের দাবি
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতা বাঙালিদের ব্রিটিশ
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নিয়োগের দাবি জানান। তাঁদের মধ্যে মহারাজা মাহতাব চাঁদ,
মতিলাল ঘোষ, এ. কে. ফজলুল হক প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
এ সময় চিকিৎসক ও শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একটি অংশও সামরিক চিকিৎসা-সেবায় বাঙালিদের
অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানায়। ডা. লে. কর্নেল সর্বাধিকারী, যিনি বেঙ্গল মেডিকেল
অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বাংলার একটি মেডিকেল দল গঠনের দাবি উত্থাপন
করেন। এর ফলে বাঙালিদের সামরিক সেবায় অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইরাকের মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে ব্রিটিশ বাহিনীর সামরিক
বিপর্যয় এবং বিপুল হতাহতের ঘটনাও ভারতীয় চিকিৎসা ও সামরিক জনবলের প্রয়োজনীয়তা
বাড়িয়ে দেয়। একই সময়ে ফরাসি বাহিনীতেও বাঙালিদের যোগদানের সংবাদ ব্রিটিশ
প্রশাসনের কাছে বাঙালি নিয়োগের প্রশ্নটি নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
প্রসঙ্গ: যোগীন্দ্রনাথ সেন
চযোগীন্দ্রনাথ সেন ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান।
প্রকৌশলবিদ্যায় শিক্ষা লাভের পর তিনি লিডসের পূর্ত বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে
কর্মজীবন শুরু করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ফরাসি বাহিনীতে
প্রাইভেট (Private)
হিসেবে যোগদান করেন। ওই বছর ২২ মে ফ্রান্সের রণক্ষেত্রে জার্মান গোলার আঘাতে তিনি
মৃত্যুবরণ করেন। [সূত্র: মুনতাসীর মামুন, ইতিহাসের খেরোখাতা সমগ্র ১, পৃ. ৬৩।]
বাঙালি ডবল কোম্পানি
১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগষ্ট কলকাতার টাগুন হলে বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ
মহতাবের সভাপতিত্বে একত সভা অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ সরকার
এই প্রস্তবটি গ্রহ করে এবং বড়লাট একট 'স্ট্রেচার বেয়ারার কোর' গঠনে সম্মত হন। কিন্তু
শেষ পর্যন্ত তা কার্কর হয় নি। এই বছরের অক্টোবর মাসে একটি 'ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্স কোর'
গঠন করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। বড়লাট শর্ত সাপেক্ষে এই প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি
হন। শর্তটি হলো- এর সকল ব্যয়ভার বাংলা প্রদেশ বহন করবে। বাঙালি নেতার তা মেনে নেন।
এই সময় বাঙালির নিজরদের অর্থ একট ভাসমান হাসপাতাল তৈরি করে। এর নাম রাখা হয়েছিল 'বেঙ্গলী'।
১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মে বেঙ্গলী যাত্রা শুরু করে। সাত দিনের মাথায় মাদ্রাজের কাছে
সামুদ্রিক ঝড়ে 'বেঙ্গলী' ডুবে যায়।
নতুন করে স্থল এ্যাম্বুলেন্স গঠন করা হয়। এর সদস্য সংখ্যা ছিল ৮২ জন। এই কোর
মেসোপটেমিয়ার যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীকে সাহায্য করেছিল। তবে এই কোরটি ব্রিটিশ
সরকারের স্বীকৃত বাহিনীর সাথে যুক্ত ছিল না।
এরপর বাঙালিদের যুদ্ধে যোগদানের পক্ষে আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে
ছিলেন- শরৎকুমার মল্লিক, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বর্ধমানের মহারাজ
মাহতাব চাঁদ। এ্ই প্রেক্ষিতে ১৯১৬
খ্রিষ্টাব্দের ৭ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের অধিবেশনে বাংলার
গভর্নর লর্ড কারমাইকেল বাঙালি সৈন্যদের নিয়ে একটি সামরিক ইউনিট গঠনের সরকারি
সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। ১৮ আগষ্ট বাঙালিদের একটি ডাবল কোম্পানি
গঠন অনুমোদিত হয়। শারীরিক যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়- ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি, বুকের মাপ ৩২ ইঞ্চি।
প্রথমাবস্থায় ২২৮ জনকে নিয়ে এই ডাবল কোর গঠনে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
এই সিদ্ধান্তের পর বাঙালি সৈন্য সংগ্রহ শুরু হয়। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে
যুবকদের নিয়োগের জন্য একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়, যা
Bengali Regiment Committee
নামে পরিচিত ছিল। কলকাতায় একটি কেন্দ্রীয় অফিস স্থাপন করা হয় এবং বাংলার বিভিন্ন
জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ মহকুমা শহরে শাখা স্থাপন করে সৈন্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়।
৩০ আগস্ট, ১৯১৬ কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে
Bengali Double Company-তে সৈন্য নিয়োগ
শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে নিয়োগের জন্য বয়সসীমা ১৬ থেকে ২৫ বছর এবং ন্যূনতম উচ্চতা
৫ ফুট ৪ ইঞ্চি নির্ধারণ করা হয়েছিল। মাসিক বেতন ছিল ১১ টাকা।
১২ সেপ্টেম্বর, ১৯১৬ বেঙ্গলি ডাবল কোম্পানির প্রথম দশজন
সৈনিক কলকাতা থেকে প্রশিক্ষণের জন্য নওশেরার উদ্দেশে যাত্রা করেন। পরবর্তী পর্যায়ে
আরও সৈনিক সেখানে পাঠানো হয়। নওশেরায় তাঁদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিল
46th Punjab Regiment।
প্রায় চার মাস প্রশিক্ষণের পর বেঙ্গলি ডাবল কোম্পানির প্রায় ২২৮ জন সদস্য ১৯১৭
খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে করাচিতে পৌঁছান। করাচিতে তাঁদের সামরিক প্রশিক্ষণ
অব্যাহত থাকে। ৪৯তম বেঙ্গলিজ বাংলায় সৈন্য সংগ্রহ অব্যাহত থাকার ফলে বেঙ্গলি ডাবল
কোম্পানির ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ সামরিক ইউনিটে রূপান্তরিত হয়।
১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের জুন-জুলাই মাসে এই ইউনিটকে সম্প্রসারিত করে
49th Bengalis
বা
49th Bengal Regiment
গঠন করা হয়। এই রেজিমেন্টটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ
সাম্রাজ্যের পক্ষে সামরিক ও নিরাপত্তামূলক কাজে অংশগ্রহণ করা। এর সদস্যদের একটি অংশ
করাচিতে অবস্থান করে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করত। এই প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি পরিচিত ছিল
Karachi Depot
নামে। উল্লেখ্য কলকাতাতেও ছিল একটি
Calcutta Depot,
যেখানে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সৈনিকরা অবস্থান করত।
পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গ থেকে ব্যাপকসংখ্যক সৈনিক নিয়োগের কারণে ১৯১৮ সালের
সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকাতেও সাময়িকভাবে একটি
Depot
স্থাপন করা হয়। মেসোপটেমিয়া অভিযান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মেসোপটেমিয়া বা
বর্তমান ইরাক ছিল ব্রিটিশ ও অটোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ
যুদ্ধক্ষেত্র।
৪৯তম বেঙ্গলিজের একটি অংশ ১৯১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে মেসোপটেমিয়ার উদ্দেশে যাত্রা
করে। প্রথম দলটি ৫ জুলাই ১৯১৭ করাচি ত্যাগ করে। তারা বসরা ও মাকিনা হয়ে
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বাগদাদে পৌঁছায়। পরবর্তী দলগুলোও ধীরে ধীরে সেখানে পৌঁছে।
তবে ৪৯তম বেঙ্গলিজকে মূলত সম্মুখযুদ্ধে ব্যবহারের পরিবর্তে গ্যারিসন, নিরাপত্তা,
যোগাযোগব্যবস্থা ও
Lines of Communication-এর
দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়। বাগদাদ ব্রিটিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসার পর শহর ও
বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক স্থাপনার নিরাপত্তার দায়িত্বও রেজিমেন্টটির ওপর ছিল।
মেসোপটেমিয়ার প্রতিকূল আবহাওয়া ও রোগব্যাধির কারণে বাঙালি সৈনিকদের মধ্যে
অসুস্থতা ও মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পায়। বিশেষত বাগদাদে অবস্থানকালে বহু সৈনিক অসুস্থ
হয়ে পড়েন এবং অনেকে মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তী সময়ে রেজিমেন্টের বিভিন্ন অংশ
আজিজিয়া, কূত ও তানুমা অঞ্চলে অবস্থান করে। সেখানে তারা নিরাপত্তার দায়িত্ব
পালনের পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখে। যুদ্ধবিরতি ও কুর্দিস্তান অভিযান
১১ নভেম্বর ১৯১৮ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়।
যুদ্ধ শেষ হলেও ৪৯তম বেঙ্গলিজের সামরিক দায়িত্ব তখনও শেষ হয়নি। যুদ্ধ-পরবর্তী
সময়ে তারা মেসোপটেমিয়ায় বিভিন্ন নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনমূলক কাজে নিয়োজিত থাকে।
১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে কুর্দিস্তান অঞ্চলে বিদ্রোহ শুরু হলে বিদ্রোহ দমনের জন্য
৪৯তম বেঙ্গলিজের একটি দল সেখানে পাঠানো হয়। প্রায় ২৩৫ জন বাঙালি সৈনিক এই অভিযানে
অংশগ্রহণ করেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তারা ১৯১৯ সালের
মাঝামাঝি তানুমা ত্যাগ করে কুর্দিস্তানের দিকে অগ্রসর হয় এবং অভিযান শেষে
সেপ্টেম্বরের দিকে তানুমায় ফিরে আসে। ভারতে প্রত্যাবর্তন ও রেজিমেন্টের বিলুপ্তি
কুর্দিস্তান অভিযান শেষে ৪৯তম বেঙ্গলিজ মেসোপটেমিয়ায় আরও কিছু সময় অবস্থান করে।
১৯২০ সালের আগস্টের মধ্যে রেজিমেন্টটি তানুমা ত্যাগ করে করাচিতে ফিরে আসে এবং সেখান
থেকে কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করে। শেষ পর্যন্ত ১৯২০ সালের ৩০ আগস্ট ৪৯তম বেঙ্গলিজ বা
বাঙালি পল্টন ভেঙে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বাঙালিদের নিয়ে
গঠিত এই বিশেষ সামরিক ইউনিটের অস্তিত্বের অবসান ঘটে।
অল্প কয়েক বছরের ইতিহাস হলেও বাঙালি পল্টন বাংলার সামরিক ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান
অধিকার করে আছে। বাঙালি পল্টন ও কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি পল্টনের ইতিহাসের সঙ্গে
সবচেয়ে বিখ্যাত যে বাঙালি সৈনিকের নাম যুক্ত, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। বাঙালি
পল্টনের সৈনিকদের ভিতরে আর যাঁরা নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, তাঁরা হলেন-
-সুবেদার মেজর শৈলেন্দ্রনাথ বসু, সুবেদার মেজর কুমার অধিক্রম মজুমদার, জমাদার
নওয়াব খাজা হাবিবুল্লাহ, জমাদার রণদাপ্রসাদ সাহা, সৈনিক মাহবুব-উল-আলম প্রমুখ।