বিশ্বাস (দর্শন)
শব্দরূপ দেখুন : ধর্ম (অভিধান)
যে-কোনো সত্তা তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে বিরাজ করে। অন্য সত্তার কাছে তার রূপের অংশবিশেষ ধরা পড়ে, অনুভবের ভিতর দিয়ে। একটি সত্তার যতটুকু রূপ অন্য সত্তার কাছে ধরা পড়ে, তার সমন্বিত রূপ থেকে জন্ম নেয় ভাবমূর্তি। আর ভাবমূর্তির অনুভবকে গ্রহণ বা অগ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে উৎপন্ন হয় সত্যাসত্যের ভাবমূর্তি। আর সেই ভাবমূর্তি থেকে জন্ম নেয় বিশ্বাস।

বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় প্রতিটি সত্তার স্বতন্ত্র পরিচয়। এই বিশ্বাস থেকেই গাছপালা, নদী, গ্রহ, নক্ষত্র, ভাবনা চিন্তা, কল্পনা ইত্যাদি সবই এক একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবেই আমাদের কাছে মূর্তমান হয়ে উঠে। এর ভিতরে যে সকল সত্তার ওজন আছে এবং জায়গা দখল করে, সেগুলো মূর্ত সত্তা (ত্রিমাত্রিক জগতের বিচারে দৈহিক সত্তা)। এর বাইরের সব বিমূর্ত সত্তা। উভয় সত্তার স্বরূপ জানার চেষ্টার ভিতর দিয়ে প্রকাশ পায় বিজ্ঞানমনস্কতা। এর ভিতর দিয়ে মানুষ একটি ধারণা লাভ করে এবং ওই ধারণার ভিত্তিতে সে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। আর দৃঢ়তর সিদ্ধান্তই জন্ম দেয় বিশ্বাসের।

মানুষের বিশ্বাস সত্যাশ্রয়ী। অর্থাৎ মানুষের কাছে যখন কোনো বিষয় সিদ্ধান্তের বিচারে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়, তখনই সে তা বিশ্বাস করা শুরু করে। যতদিন না নতুন কোনো সত্য আগের সত্যকে প্রতিস্থাপিত করে, ততদিন আগের বিশ্বাসেই সে থেকে যায়।

মানুষ নানারকম সত্য ধারণ করে। নানারকম ছোট ছোট সত্যের সমন্বয়ে এক একটি মিশ্র সত্যের সৃষ্টি হয়। প্রতিটি মিশ্র সত্যই একাধিক ক্ষুদ্র বিশ্বাসকে ধারণ করে। যেমন পানি তরল পদার্থ, এটি একটি সত্য। পানির আরেকটি বাষ্পীয় রূপ আছে এটি একটি সত্য। পানিকে উত্তপ্ত করলে পানি বাষ্পীভূত হয় এটিই আরও একটি সত্য। এই তিনটি সত্যই মানুষের কাছে পানির একটি সমন্বিত বা মিশ্র সত্যের প্রকাশ ঘটাবে। এবার অন্যদিক থেকে পানিকে দেখলে দেখা যাবে― চিনি পানিতে গলে যায়, কিন্তু লোহা গলে না। পানির গলন-ধর্মের এই বৈপরীত্য নিয়েও একটি সত্য উৎপন্ন হবে। এইভাবে প্রতিটি বস্তুর ক্ষেত্রে যে সকল ধর্ম, মানুষের কাছে সত্য বলে স্বীকৃত হবে, তার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে বিশ্বাস।

মানুষের যে-কোনো বিশ্বাস অর্জনের প্রক্রিয়া চারটি ধারায় সম্পন্ন হতে পারে। এই ধারা চারটি হলো―

১. প্রত্যক্ষ বিশ্বাস: মানুষ তার ইন্দ্রিয় দ্বারা অর্জিত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে যে বিশ্বাস করে, তাই হলো প্রত্যক্ষ বিশ্বাস। যেমন আগুন গরম, এর নানারকম দ্রব্যকে দগ্ধ করার গুণ রয়েছে, এর দ্বারা পানিকে বাষ্পীভূত করা যায়, লোহাকে গলিয়ে ফেলা যায় ইত্যাদির ভিতর দিয়ে মানুষ আগুনের ধর্ম সম্পর্কে অবহিত হয়েছে। এরই মধ্য দিয়ে মানুষের ভিতরে আগুন সম্পর্কে একটি বিশ্বাসও জন্মেছে। আগুনে হাত পুড়ে যাবে, এই বিশ্বাস থেকে মানুষ আগুনে হাত দেবে না, কিন্তু লোহা গলানোর জন্য আগুন ব্যবহার করবে, পানি গরম করা বা বাষ্পীভূত করার জন্য আগুন ব্যবহার করবে। এরূপ বস্তুজগতের বিভিন্ন বস্তুর ধর্মকে প্রত্যক্ষভাবে জেনে মানুষ নানা ধরনের বিশ্বাসকে ধারণ করে এবং বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করে। আদিমানবের প্রত্যক্ষ বিশ্বাসের জ্ঞান যা ছিল, তাকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকার সংগ্রামের ভিতর দিয়ে নানা ধরনের বিষয় আবিষ্কার করেছে। এর ফলে সে অজর্ন করেছে নানাধরনের বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান। এই জ্ঞান থেকে লাভ করেছে অভিজ্ঞতা। আর এই অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে প্রত্যক্ষ বিশ্বাস।

২. পরোক্ষ বিশ্বাস: মানুষ তার নিজের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে যেমন প্রত্যক্ষ বিশ্বাস অর্জন করে, তেমনি অপরের বিশ্বাসকেও ধারণ করে থাকে। এর পিছনে থাকে একটি সত্যের আশ্বাস। পৃথিবী যে সূর্যের একটি গ্রহ এবং সূর্যের দিক থেকে এর অবস্থান তৃতীয়, তা নিজে পরীক্ষা করে দেখেছে ক’জন। কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ জ্ঞানের সূত্রে সাধারণ মানুষ এই সত্যটাকে গ্রহণ করেছে। এখানে দুটি বিশ্বাস কাজ করে। একটি হলো প্রত্যক্ষ বিশ্বাসীর উপর বিশ্বাস, অপরটি হলো প্রত্যক্ষ বিশ্বাসীর বিশ্বাসকে বিশ্বাস। যে সকল জ্যোতির্বিজ্ঞানী সূর্য এবং পৃথিবীর সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন, তাঁদের সম্পর্কে এই বিশ্বাস থাকতে হবে যে, তাঁরা মিথ্যা বলছেন না। আর তাঁরা মিথ্যা বলছেন না তাই তাঁদের কথাও বিশ্বাস করা যায়। যেহেতু বক্তার বিশ্বাসযোগ্যতা আছে, তাহলে তার বিবৃতিরও বিশ্বাসযোগ্যতা আছে। মানুষের বাস্তব জীবন চলে এই দুটি বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে।

৩. উপপ্রেয়মূলক
(Hypothetical) বিশ্বাস: এই জাতীয় বিশ্বাসে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিশ্বাস কাজ করে না। কিছু অভিজ্ঞতা, কিছু ধারণার উপর ভিত্তি করে এক ধরনের কল্প বিশ্বাস তৈরি করা হয়। বিজ্ঞানীরা কোনো সত্য আবিষ্কার করার আগে এই রকম কিছু বিশ্বাস নিয়ে অগ্রসর হন। অনেক সময় এই জাতীয় বিশ্বাস সুদূর-প্রসারী কোনো ফলাফল আনে না, কিন্তু গবেষণার ধারাকে সচল রাখে। বাস্তব জীবনে এই জাতীয় উপপ্রেয়মূলক ভাবনা কখনো কখনো সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে। এর দ্বারা কখনো মানুষ সফল হয়, কখনো বিফল হয়। ধরা যাক, প্রতিবৎসর বর্ষায় পদ্মা নদীর একটি স্থানে সস্তায় ইলিশ মাছ বিক্রয় হয়। কোনো ব্যক্তির কাছে এই বিশ্বাসটি কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিশ্বাস থেকে আসতে পারে। কোনো এক বর্ষা মৌসুমে একজন মানুষ এই বিশ্বাস নিয়ে পদ্মা নদীর ওই স্থানে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেন। ওই বছরের অবস্থা না জেনেই তিনি যে অনুমান নির্ভর বিশ্বাসের উপর ভর করে ওই স্থানে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেন, সেটাকে বলা যাবে বিশ্বাসের বিশ্বাস। বাস্তব জীবনের এই জাতীয় বিশ্বাসকে ঠিক উপপ্রেয়মূলক বিশ্বাস বলা যায় না। একে বলা যেতে পারে ধারণামূলক বিশ্বাস। উপপ্রেয়মূলক বিশ্বাসের বিষয়টি দেখা যায়, গবেষণার ক্ষেত্রে। এমন একটি বিষয়, ঘটে চলেছে, কিন্তু এর প্রকৃত কারণটা অজানা। এই অজানা রহস্যকে উন্মোচন করার জন্য কিছু কাল্পনিক সত্যকে উপস্থাপন করা হয়, যুক্তিতর্ক দিয়ে। তবে এই কল্প-বিশ্বাস এতটাই সত্যের কাছাকাছি থাকে যে, অনেক সময়, সমকালীন বিজ্ঞানীরা তার ত্রুটিই ধরতে পারেন না, বা পারলেও বিপরীত কোনো যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করতে পারেন না। যেমন ১৮০৩-০৫ খ্রিস্টাব্দের ভিতরে ইংরেজ পদার্থ ও রসায়ন বিজ্ঞানী জন ডাল্টন (John Dalton) পরমাণু সম্পর্কে একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। তাঁর প্রদত্ত স্বীকার্য পাঁচটি সূত্রে গ্রথিত। একালের বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বের নানাবিধ সমালোচনা করেন বটে, কিন্তু ১৮শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ডাল্টনের স্বীকার্যকেই বিজ্ঞানীরা মেনে নিয়েছিলেন। কারণ তখন পর্যন্ত এই স্বীকার্য অস্বীকার করার মতো যথেষ্ট প্রমাণাদি উপস্থাপন করা যায় নি। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে জে জে থমসন (J. J. Thomson) ইলেক্ট্রন আবিষ্কার করেন। এর ফলে ডাল্টনের তৃতীয় স্বীকার্যের অংশবিশেষ (পরমাণু বিভাজিত হতে পারে না) ভুল প্রমাণিত হয়। বিজ্ঞানীদের প্রায় সব তাত্ত্বিক আবিষ্কারের সূত্রপাত হয় এই জাতীয় উপপ্রেয়মূলক বিশ্বাসের সূত্রে। তার চূড়ান্ত ধারণাটা আমরা জানতে পারি বটে, বিজ্ঞানীরা যে প্রাথমিক বিশ্বাসকে জনসমক্ষে প্রকাশ করেন না, তা অজানা থেকে যায়। সাধারণভাবে আমরা যাদেরকে সাধারণ মানুষ বলি, এদের ভিতরেও এরূপ উপপ্রেয়মূলক বিশ্বাসের জন্ম হতে পারে। তবে নিষ্ঠার সাথে তারা সে সকল বিশ্বাসের সত্যাসত্য যাচাই করেন না। ফলে তাদের উপপ্রেয়মূলক বিশ্বাসগুলো অমোঘ সত্যে পরিণত হয় না বা চূড়ান্ত ফলাফল বয়ে আনে না।

৪. অলৌকিক বিশ্বাস: পার্থিব জগতের যা কিছু ঘটে তার একটি প্রকৃতি-নির্ভর সূত্র আছে। সেটা মানুষের শূন্যে ভেসে থাকা হোক, আর জলের উপরে আলোর নাচন হোক। মানুষ যখন প্রাকৃতিক বিধি অনুসারে এর ব্যাখ্যা দিতে পারে, তখন তা হয়ে যায় প্রাকৃতিক। আর লোক (মানুষ) যার সম্পর্কে আগে থেকেই জানে, তা হলো লৌকিক। এর বাইরে যা ঘটে, তা হলো অতিপ্রাকৃতিক বা অলৌকিক হিসেবে মানুষ চিহ্নিত করে। এর পিছনে একটি বিষয় মুখ্য ভূমিকা রাখে তা হলো সত্য। মানুষ যখন কোনো ঘটনাকে প্রাকৃতিক বিধি অনুসরণ করে ব্যাখ্যা দিতে পারে না বা কোনো প্রাকৃতিক সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, তখন তাকে অলৌকিক বলে। যখনই কোনো প্রাকৃতিক বিধি অনুসরণ করে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তখন তা আর অলৌকিক থাকে না। বাংলাদেশের অনেক বদ্ধ জলাশয়ের উপরে রাতের বেলায় আলোর নাচানাচি দেখা যায়। কেন এটা ঘটে, মানুষ তার ব্যাখ্যা যতদিন দিতে পারে নি, ততদিন এটা ছিল আলেয়া নামক ভুতের আলো। এটা ছিল সম্পূর্ণ অলৌকিক বিশ্বাস। এখন আলেয়াকে কেউ অলৌকিক আলো বলে না।

এই অলৌকিক বিশ্বাস থেকে জন্ম নিয়েছে মানুষের উপধর্মসমূহ। [মানুষের ধর্ম]