খ্রিষ্টান ধর্ম
প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর একটি, এটি একটি ইব্রাহিমীয় ধর্ম
হিসেবে খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলাম ধর্মের সাথে সম্পর্কিত। এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন-
হজরত ঈসা (আঃ)। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৪০ কোটি মানুষ খ্রি ষ্ট ধর্মাবলম্বী। ইউরোপ, আমেরিকা এবং সাব-সাহারান আফ্রিকায় এই ধর্মের অনুসারী সবচেয়ে বেশি। দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশেও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ একটি বড় সংখ্যক মানুষ এই ধর্ম পালন করেন।
খ্রিষ্টান শব্দের উৎপত্তি
'খ্রিষ্টান' শব্দের উৎপত্তি মূলত একটি দীর্ঘ ভাষাগত বিবর্তনের ফসল। শব্দটির
আদি উৎস হলো হিব্রু শব্দ 'মশীহ' (Māshîa), যার অর্থ হলো 'অভিষিক্ত' বা 'যাঁকে
পবিত্র তেল দ্বারা রাজপদে বরণ করা হয়েছে'। ইহুদি ঐতিহ্যে একজন প্রতিশ্রুত
ত্রাণকর্তার জন্য এই উপাধিটি ব্যবহৃত হতো। হিব্রু 'মশীহ' শব্দটির গ্রিক অনুবাদ হলো
'খ্রিস্টোস'
(Christos)। বাইবেলের নতুন নিয়ম বা নিউ
টেস্টামেন্ট গ্রিক ভাষায় রচিত হওয়ায় যিশুকে সেখানে 'যিশু খ্রিষ্ট '
বা 'ইয়েসুস খ্রিস্টোস' বলে সম্বোধন করা হয়। এই 'খ্রিষ্টোস '
শব্দ থেকেই মূলত 'খ্রিষ্ট ' এবং পরবর্তী
সময়ে 'খ্রিষ্টান' শব্দের উদ্ভব।
বাইবেলের 'প্রেরিতদের কার্যবিবরণী' (Acts 11:26) অনুসারে, যিশুর অনুসারীদের সর্বপ্রথম 'খ্রিষ্টান' (Christianos) বলে ডাকা শুরু হয়েছিল সিরিয়ার প্রাচীন শহর আন্তিয়খিয়ায়। উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক আন্তিয়খিয়া বর্তমানে তুরস্কের সীমান্তের কাছাকাছি (বর্তমানে আনতাকিয়া, Hatay অঞ্চল) হলেও প্রাচীনকালে এটি সিরিয়ার অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল।
শুরুতে অনুসারীদের নিজেদের দেওয়া নাম ছিল না; বরং যিশুর প্রতি তাঁদের অগাধ
ভক্তি দেখে অন্য মানুষজন তাঁদের উপহাস করে বা শনাক্ত করার জন্য এই নামে ডাকত। এর
অর্থ ছিল— 'খ্রিষ্টের অনুগামী' বা 'খ্রিষ্টের দলের লোক'।
খ্রিষ্টধর্মের বিশ্বাস: খ্রিষ্টধর্মের মূল বিশ্বাস হলো— খ্রিষ্টধর্মের
প্রধান বিশ্বাস হলো—ঈশ্বর এক, তবে তিনি তিনটি স্বতন্ত্র সত্তায় একই ঐশ্বরিক
সত্তার মধ্যে বিদ্যমান। এই মতবাদকে বলা হয় Trinity (পবিত্র ত্রিত্ববাদ)। এই তিন
সত্তাপিতা (God the Father)
পুত্র (Jesus Christ)
পবিত্র আত্মা (Holy Spirit)।
খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী— যিশুখ্রিষ্ট মানবজাতির মুক্তির জন্য পৃথিবীতে
আগমন করেন। তিনি মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত সাধন করেন। তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়
এবং মৃত্যুর তৃতীয় দিনে তিনি পুনরুত্থিত হন । পরে তিনি স্বর্গে আরোহণ করেন।
খ্রি ষ্টা নদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হলো বাইবেল। এটি
দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: পুরাতন নিয়ম
- পুরাতন নিয়ম
( Old
Testament ) :
এতে সৃষ্টির ইতিহাস, নবীগণের কথা এবং প্রাচীন ইসরায়েলিদের বিধিবিধান রয়েছে।
- নতুন নিয়ম
(New Testament):
এতে যিশু খ্রিস্টের জীবনী (সুসমাচার বা Gospel), শিক্ষা এবং প্রাথমিক খ্রি ষ্টীয়
মণ্ডলীর ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।
খ্রিষ্টধর্মের শাখা: খ্রি ষ্ট ধর্ম প্রধান তিনটি ধারায় বিভক্ত হয়েছে:
- ক্যাথলিক (Catholic): এটি বৃহত্তম শাখা, যার প্রধান ধর্মীয় নেতা হলেন পোপ (ভ্যাটিকান সিটি)।
- প্রোটেস্ট্যান্ট (Protestant): ১৬শ শতাব্দীতে সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে এই শাখার উদ্ভব হয়। তারা পোপের কর্তৃত্বের বদলে কেবল বাইবেলের ওপর গুরুত্ব দেয়।
- অর্থোডক্স (Orthodox): এটি মূলত পূর্ব ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রচলিত প্রাচীন শাখা।
ধর্মীয় আচার ও উৎসব
- বাপ্তিস্ম (Baptism): এটি খ্র িষ্ট ধর্মে প্রবেশের প্রাথমিক দীক্ষা বা পবিত্র স্নান।
- প্রভুর ভোজ (Holy Communion): যিশুর শেষ নৈশভোজের স্মরণে রুটি ও আঙুর রস গ্রহণ করা।
- প্রধান উৎসব: যিশুর জন্মদিন উপলক্ষে বড়দিন এবং তাঁর পুনরুত্থান উপলক্ষে ইস্টার পালন করা হয়।
উপাসনালয়: খ্রি ষ্টা নদের উপাসনালয়কে চার্চ বা গির্জা বলা হয়। প্রতি
সপ্তাহে একদিন গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা ও বাইবেল পাঠের আয়োজন করা হয়।
খ্রিষ্টধর্মের শাখাভেদে এই দিনের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।
গির্জার ধর্মীয় নেতাদের ফাদার, যাজক বা পাস্টর বলা হয়।