হরবুল ফিজার
হরবুল ফিজার ছিল ইসলাম-পূর্ব আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোত্রীয় যুদ্ধ, যা আনুমানিক ৫৮২-৫৯০ খ্রষ্টাব্দের মধ্যে সংঘটিত হয়।

আরবি ভাষায় 'হারব' মানে যুদ্ধ এবং 'ফিজার' অর্থ হলো পাপ বা অন্যায়। আরবে জিলকদ, জিলহজ, মহরম এবং রজব—এই চারটি মাসকে 'আশহুরে হুরুম' বা নিষিদ্ধ মাস হিসেবে গণ্য করা হতো। এই মাসগুলোতে যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আরবের কুরাইশ ও কায়েস গোত্র এই পবিত্র মাসের মর্যাদা লঙ্ঘন করে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল বলে একে 'হরবুল ফিজার' বা 'অন্যায় যুদ্ধ' বলা হয়।

এই যুদ্ধের মূল সূত্রপাত ঘটেছিল বাণিজ্য এবং গোত্রীয় অহমিকা নিয়ে। হিরার রাজা নুমান বিন মুনজিরের একটি বাণিজ্য কাফেলা পাহারা দেওয়াকে কেন্দ্র করে কেনানা গোত্রের 'বাররাজ বিন কায়েস' এবং কায়েস গোত্রের 'উরওয়া বিন উতবাহ'-এর মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধে। বাররাজ বিশ্বাসঘাতকতা করে উরওয়াক হত্যা করলে কুরাইশ ও কেনানা গোত্রের সাথে কায়েস ও হাওয়াজিন গোত্রের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ একটানা প্রায় ৪ বছর ধরে চলেছিল। এতে উভয় পক্ষের প্রচুর লোক মারা যায় এবং আরবের সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ শান্তি স্থাপনে সম্মত হয় এবং রক্তপণের মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে।

এটি ছিল হজরত মুহম্মদ (সাঃ), জীবনের প্রথম সরাসরি দেখা কোনো যুদ্ধ। এই যুদ্ধে তিনি সরাসরি কোনো অস্ত্র চালান নি বা কাউকে আঘাত করেন নি। তিনি মূলত তাঁর চাচাদের নিক্ষিপ্ত তীরগুলো কুড়িয়ে দিতেন এবং ঢাল দিয়ে তাঁদের রক্ষা করতেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং প্রাণহানি দেখে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন।

এই যুদ্ধের ধ্বংসলীলা এবং অন্যায়ভাবে মানুষের মৃত্যু যুবক হজরত মুহম্মদ (সাঃ)-এর হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। তিনি অনুভব করেন যে, আরবে শান্তি বজায় রাখা এবং মজলুম বা অসহায় মানুষকে রক্ষা করার জন্য একটি সংগঠন প্রয়োজন। যুদ্ধের পর তিনি তাঁর চাচা জুবায়ের বিন আবদুল মুত্তালিবের সহযোগিতায় এবং বনু হাশেম ও অন্যান্য গোত্রের কিছু সৎ মানুষকে সাথে নিয়ে 'হিলফুল ফুজুল' (শান্তি সংঘ) গঠন করেন। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল—অসহায়কে সাহায্য করা, জুলুম বন্ধ করা এবং মক্কায় আগত বিদেশি বণিকদের নিরাপত্তা দেওয়া।