হজরত মুহম্মদ সাঃ-এর ছবি

হজরত মুহম্মদ সাঃ-এর কোনো সত্যাশ্রয়ী ছবি পাওয়া যায় না। মুসলমানরা কালক্রমে তাঁর ছবিকে মূর্তিপূজায় পর্যবেশিত করতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে, তাঁর ছবি সংরক্ষণ করা হয় নি। তাঁর মৃত্যুর বহু পরে কেউ কেউ তাঁর কাল্পনিক ছবি এঁকেছেন, কিন্তু মুসলমানদের প্রবল আপত্তির কারণে সে সকল ছবি ধ্বংস করে ফেলা হয়।

কথিত আছে তৈমুর লঙ-এর পৌত্র জাহির-উল্লাহ বেগ-এর আদেশে জনৈক শিল্পী মুহম্মদ সাঃ-এর ১৪৩৭ খ্রিষ্টাব্দে একটি ছবি এঁকেছিলেন। 

১৩৩৭ বঙ্গাব্দের দিকে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের পুস্তক প্রকাশক ভোলানাথ সেন  'প্রাচীন কাহিনী' পাঠ্যপুস্তকে এই ছবিটি ছাপিয়েছিলেন। বইটি ছাপার আগে টেক্সটবুক কমিটির মুসলমান সদস্যরা আপত্তি করেছেলেন বলে জানা যায় না। বইটি ছাপার পর, সাড়া ভারতবর্ষে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এরপর ভোলানাথ পাঠ্যপুস্তক থেকে এই ছবি প্রত্যাহার করেন এবং 'ছোলাতান' পত্রিকায় ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে দুইজন পাঞ্জাবী মুসলমান ভোলানাথ সেন ও তাঁর দুই কর্মচারীকে হত্যা করে। পরে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য এই দুইজন পাঞ্জাবী মুসলমানের মৃত্যুদণ্ড হয়।
সূত্র: রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ও প্রবাসী। শঙ্করীপ্রসাদ বসু। দেশ সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৯৭
মুহম্মদ সাঃ, হজরত
ইসলাম ধর্মের শেষ নবী ও রাসূল। তিনি মানবজাতির জন্য আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ পথপ্রদর্শক হিসেবে সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত। তাঁর আরেকটি নাম 'আহমদ', যা পবিত্র কুরআনেও উল্লেখিত হয়েছে।

আরব উপদ্বীপের মক্কা নগরীতে কুরাইশ বংশের বনি হাশিম গোত্রে জন্ম গ্রহণ করেন। এঁর পিতার নাম আব্দুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও মাতার নাম আমিনা বিনতে ওহাব। তাঁর জন্মের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। শৈশবে মাতৃহারা হওয়ার পর তিনি পিতামহ আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন।

এঁর জন্ম তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিরোধ আছে। এ সম্পর্কে মোহাম্মদ আকরাম খাঁ প্রণীত মোস্তফা চরিত নামক গ্রন্থে লিখিত হয়েছে-
১. 'সোমবার, ৯ই রবিউল্-আওয়াল , ২০শে এপ্রিল, ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ ১লা জ্যৈষ্ঠ , ৬২৮ বঙ্গাব্দ, ব্রহ্মমুহূর্ত বা ছোব্‌হ-ছাদেকের অব্যবহিত পরে জন্মগ্রহণ করিলেন। ...তাবারি, এবনে-খাল্লেদুন, এবনে-হেশাম, কামেল প্রভৃতি ১২ই রবিউল-আউওল তারিখ নির্দেশ করেছেন। কিন্তু আবুল-ফেদা বলেন, ঐ মাসের ১০ই তারিখে হজরতের জন্ম হইয়াছিল। তবে সমস্ত লেখকই এক বাক্যে স্বীকার করিতেছেন যে, রবিউল্ আউওল মাসে সোমবারে হজরতের জন্ম হয়। আধুনিক মুছলমান লেখকগণ সূক্ষভাবে হিসাব করিয়া দেখাইয়াছেন যে, ১২ই বা ১০ই তারিখে সোমবার পড়িতে পারে না। উহা ৯ই ব্যতীত অন্য কোন তারিখ হইতে পারে না। মিসরের স্বনাম খ্যাত জ্যোতির্বিদ পণ্ডিত মাহমুদ পাশা ফারুকী, স্বতন্ত্র একখানা পুস্তক রচনা করিয়া ইহা অকাট্যরূপে প্রতিপন্ন করিয়াছেন। পাশা ম: হোদয়ের প্রমাণগুলির সংক্ষিপ্ত সার নিম্নে উদ্ধৃত করিয়া দিতেছি। তিনি বলেন- ছহী হাদীছে বর্ণিত আছে , হজরতের শিশুপুত্র এব্রাহিমের মৃত্যুর দিন সূর্য গ্রহণ হইয়াছিল।

২. হিজরী ৮ম সালের জিলহজ মাসে এব্রাহিমের জন্ম হয় , ১৭ বা ১৮ মাস বয়সে হিজরীর দশম সালে তাঁহার মৃত্যু হইয়াছিল।
৩. অঙ্ক কষিয়া দেখিলে বুঝিতে পারা যাইবে যে , উল্লিখিঁত সূর্যগ্রহণ ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই নভেম্বর তারিখে ৮টা ৩০ মিনিটের সময় লাগিয়াছিল।
৪. এই তারিখ ধরিয়া হিসাব করিয়া দেখিলে জানা যায় যে , হজরতের জন্ম সনে ১২ই এপ্রিল তারিখে রবিউল আউওল মাসের ১লা তারিখ আরম্ভ হইয়াছিল।
৫. জন্মদিনের তারিখ নির্দেশ স ম্বন্ধে মতভেদ আছে বটে, কিন্তু রবিউল-আউওল মাসের ৮ই হইতে ১২ই পর্যন্ত এই মতভেদ সীমাবদ্ধ রহিয়াছে। সোমবার সম্বন্ধেও কাহারও মতভেদ নাই।
৬. ৮ই হইতে ১২ই রবিউল আউওলের মধ্যে ৯ই ব্যতীত সোমবার নাই।

নামকরণ ও উপাধি: এঁৱর নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। পিতৃহীন শৈশব: হযরত মুহাম্মদ (সা.) মাতৃগর্ভে থাকাকালেই তাঁর পিতা  আব্দুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব  ব্যবসায়িক কাজে ইয়াসরিব (বর্তমান মদিনা) গমন করেন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন। ফলে তিনি জন্মের পূর্বেই পিতৃহীন হন। জন্মের পর তিনি তাঁর পিতামহ আব্দুল মোত্তালিব -এর তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন।

দুধমাতার কাছে প্রতিপালন: তৎকালীন অভিজাত আরব পরিবারের রীতি অনুসারে , ভদ্রসমাজের মহিলাগণ , নিজ সন্তানদের স্তন্যদানকে অগৌরবের কাজ মনে করতেন। সে কারণে হজরতের জন্মের পর প্রথম স্তন্যপান করিয়েছিলেন, আবুলাহাবের ছোওয়ায়বা নামক একজন দাসী। এরপর তাইফবাসিনী ছা-আদ বংশের বিবি হালিমার উপর হজরতের প্রতিপালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সে সময়ে আরবের বেদুইন পল্লী থেকে শিশুদের স্তন্যদান করার জন্য বেদুইন নারীরা মক্কায় আসতেন। তাঁরা মূলত সম্পদশালী পরিবারের শিশুদের স্তন্যদানে আগ্রহী ছিলেন। কারণ এসকল পরিবার থেকে তাঁরা সম্মানী পেতেন বেশী। একই কাঋনে পিতৃহীন শিশুদের ক্ষেত্রে তাঁরা অনাগ্রহ পোষণ করতেন। হালিমা নামক ধাত্রী অধিক সম্মানী পাওয়া যাবে, এমন কোনো পরিবারের সন্ধান না পেয়ে, তাঁর স্বামী হারেছের সাথে আলোচনা করে মুহাম্মদ (সা.) -এর দায়িত্ব নেন।

উল্লেখ্য সে সময়ে আরবের হওয়াজেন বংশের বানি-ছাআদ গোত্র বিশুদ্ধ আরবির ভাষার জন্য বিখ্যাত ছিল। হালিমার কাছে প্রতিপালিত হওয়ার সূত্রে
মুহাম্মদ (সা.)- বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। মুহাম্মদ (সা.) -এর সাথে  প্রতিপালিত হয়েছিলেন- হালিমার চারটি সন্তান। এঁরা হলেন পুত্র আব্দুল্লাহ এবং তিন কন্যা- আনিসা, হোজায়ফা ও হোজাফা।

হালিমা তাঁকে দুই বৎসর স্তন্যপান করানোর পর , আমিনার কাছে নিয়ে আসেন। কথিত আছে, এই সময় একদিন নবী এবং হালিমার সন্তান আব্দুল্লাহ বাড়ির কাছে পশু চরাচ্ছিলেন। এই সময় দুইজন ফেরেস্তা এসে নবীর বক্ষ বিদীর্ণ করে, হৃদপিণ্ড থেকে শয়তানের অংশ অপসারিত করেন। ঘটনা বর্ণিত হয়, যা 'শক্কে সাদর' নামে পরিচিত।

হালিমার কাছে পুনরায় প্রতিপালন তৎকালীনমক্কায় সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব হওয়ায়, পুনরায় হালিমাকে হজরতের প্রতিপালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। হজরতের পাঁচ বৎসর বয়সে ধাত্রী হালিমা, তাঁর মায়ের কাছে হজরতকে ফিরিয়ে দেন।

মাতৃবিয়োগ: ৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর যখন ছয় বৎসর বয়স, তখন তাঁর মাতা আমিনা তাঁকে ও একজন দাসী উম্মে আয়মনকে সাথে নিয়ে মদিনায় যান। মদিনায় তাঁর পিতার মামার কাছে একমাস থাকার পর মক্কায় ফেরার সময় আবওয়া নামক স্থানে আমিনার মৃত্যু হয়। এরপর উম্মে আয়মনের সাথে তিনি তাঁর পিতামহের কাছে নীত হন।

পিতামহের মৃত্যু: ৫৭৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব তাঁর ৮২ বৎসর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের কাছে প্রতিপালিত হন। এই সময় তিনি মাঠে মাঠে মেষ ও ছাগল চড়াতেন। ফলে, তিনি অক্ষরজ্ঞানহীন থেকে যান।

প্রথম সিরিয়া ভ্রমণ: ৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে, তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে, চাচার ব্যবসার সঙ্গী হিসাবে সিরিয়া যান।  যাত্রাপথে বসরায় (তৎকালীন রোম অধিকৃত রাজ্যের রাজধানী) আবু তালিব তাঁবু ফেললেন। কথিত আছে, সে সময়ে বসরায় বসবাসকারী জারজিস সামে (অন্যা নাম বুহাইরা বা বহিরা) নামক এক খ্রিষ্টান পাদ্রী, যাত্রীদের সেবা করতে এসে,তিনি বালক মুহম্মাদ (সাঃ) কে দেখে শেষ নবী হিসেবে চিহ্নিত করেন।

সিরিয়া থেকে ফিরে তিনি চাচার সাথে হরবুল ফিজার বা অপবিত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধে তিনি সরাসরি যুদ্ধ করেন নি। যুদ্ধের সময় নিক্ষিপ্ত তীর সংগ্রহ করে চাচার হাতে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ। এই যুদ্ধের ভয়াবহতা ও প্রাণহানি তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। এই আত্মঘাতী যুদ্ধে বহু লোকের মৃত্যু দেখে, হজরত এবং অপর কয়েকজন যুবকের চেষ্টায় একটি শান্তি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংঘটির নাম ছিল- হিল্‌ফ-উল-ফুজুল। সম্ভবত ৫৯০ থেকে ৫৯১ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে এই সংগঠনি তৈরি হয়েছিল।

এর কিছুদিন পর জায়েদ নামক এক বালককে-

প্রথম বিবাহ : তাঁর বিশ বৎসর বয়সের সময়, বংশ ও পারিবারিক রীতি অনুসারে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। এই সময় তাঁর সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার কারণে, মক্কার ব্যবসায়ীরা তাঁকে আল্-আমীন বা বিশ্বস্ত আখ্যায়িত করেছিলেন। তাঁর সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠায় আকৃষ্ট হয়ে মক্কার খাদিজা (রাঃ) নামক এক বিধবা ধনবতী রমণী তাঁকে তাঁর সাথে ভাগে ব্যবসা করার প্রস্তাব করেন। প্রথমাবস্থায় মুহম্মদ (সাঃ)
কোনো উত্তর না দিয়ে, গরে ফিরে আসেন এবং আবু তালেবকে বিষয়টি জানান। আবু তালেব আনন্দের সাথে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে মুহম্মদ (সাঃ)-কে রাজি হতে বলেন। এরপর তিনি বাণিজ্য-যাত্রা করেন। এই ব্যবসায় প্রচুর লাভ হওয়ায়, এবং মুহম্মদ (সাঃ)-এর অন্যান্য গুণে মুগ্ধ হয়ে খাদিজা (রাঃ)  তাঁকে বিবাহ করার প্রস্তাব দেন। ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে এঁদের বিবাহ হয়। এই মুহম্মদ (সাঃ)-এর বয়স ছিল ২৫ বৎসর বয়সে, এবং খাদিজা (রাঃ)-এর বয়স ছিল ৪০ বৎসর।

 পবিত্র কৃষ্ণপাথর (হজরে আসওয়াত

৬০১ খ্রিষ্টাব্দের (আনুমানিক) খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই সেপ্টেম্বর কাবাগৃহের অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ হজরত আলী (রাঃ) জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য এই সময় কাবা একটি দেওয়াল ঘেরা অংশ ছিল মাত্র। এর উপরে ছাদ ছিল না। তাঁর মা ফাতিমা বিন্ত আসাদ কাবা'র রক্ষণাবেক্ষণের অংশভাগী ছিলেন। তাঁর গর্ভযন্ত্রণা উপস্থিত হলে- তিনি কাবাগৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এবং সেখানে আলী (রাঃ)-এর জন্ম হয়। জন্মের পর তিনি ও তাঁর মা তিন দিন পর্যন্ত কাবার অভ্যন্তরে অবস্থান করেন। এরপর এই গৃহের বাইরে আসার পর হজরত মুহম্মদ (সাঃ) তাদের অভ্যর্থনা জানান এবং নবজাতককে অন্নপ্রাশন করান। হজরত মুহম্মদ (সাঃ) নিজেই শিশুটির নাম রাখেন 'আলী' । এর অর্থ হলো- 'উন্নত ও মহান'। শৈশব তাঁর পিতা  আবু তালিব অর্থ সংকটে পড়লে-  মুহম্মদ (সাঃ) ও তাঁর স্ত্রী খাদিজা রাঃ - তাঁকে দত্তক নেন।  শিশুকালে মুহম্মদ (সাঃ)-তাঁকে পুত্রস্নেহে লালন করেন।

৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে কাবা সংস্কারে হাত দিয়েছিল মোজার সম্প্রদায়। এই সময় কাবাঘরটি ছিল অপেক্ষাকৃত নিচু স্থানে। ফল বর্ষায় প্রবল বেগে জলস্রোত এই ঘরে প্রবেশ করতো। এই জলস্রোতের কারণে কাবাঘরটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। তাই এই ঘরটি সংস্কারে ভাবনা কোরাইশরা ভেবেছিল। কাবাঘরের বাইরের দেওয়াল না থাকায়- এই দেওয়াল অতিক্রম করে, চোরের দল কাবার অভ্যন্তরে দেবতাদের অলঙ্কারাদি চুরি করেছিল। এই দেওয়াল ঘেরা অংশের ভিতরে একটি কূপ ছিল। কিছুদিন পরে এই কূপে একটি বড় সাপ এসে বাসা তৈরি করেছিল। সাপটি প্রায়ই কাবার দেওয়ালের উপর চলাফেরা করতো। ফলে সাধারণ মানুষ এই ঘরের কাছে ঘেঁষতে ভয় পেতো। একদিন একটি বাজপাখি এই সাপটিকে চোঁ মেরে নিয়ে যায়। এরপর স্থানীয় লোকেরা মনে করে যে দেবতারা বাজ পাখি পাঠিয়ে সাপটিকে নিয়ে গেছে। এই ঘটনার মাধ্যমে স্থানীয় লোকেরা ভাবতে শুরু করে যে- দেবতারা কাবগৃহ মেরামতের ইঙ্গিত দিয়েছে। এরপর কোরাইশ বংশের সকল গোত্র কাবগৃহ নির্মাণে সংকল্প করে। এই সময় জেদ্দা সামুদ্রিক বন্দরে ঝড়ে একটি বড় জাহাজ ভেঙে পড়ে। অলিদ ও তাঁর সঙ্গীরা ওই জাহাজের কাঠ জেদ্দা থেকে কিনে এনে কাবাগৃহের ছাদ তৈরি করে।

কাবা শরিফ সংস্কারের পর হাজরে আসওয়াদ নামক পাথে স্থাপন নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। সকল গোত্রই এই পাথর স্থাপনের অধিকার লাভ করতে চেয়েছিলেন। চারদিন পর্যন্ত এই বিবাদ চলার পর- গোত্রগুলো রক্তপূর্ণ পাত্র হাত ডুবিয়ে মৃত্যুপণ লাড়াই করার প্রতীজ্ঞা করেছিল।

এর মীমাংশা করেছিলেন হজরত মুহাম্মদ সাঃ। তিনি একটি চাদরের উপর হজরে আসওয়াদওয়াদ নামক পাথর স্থাপন করে, এরপর গোত্রের প্রতিনিধিরা ও চাদরের প্রান্তদেশ ধরে পাথরটি স্থানান্তর করার অনুরোধ করেন। হজরতের এই মীমাংশ সকল গোত্রই সানন্দে মেন নিয়েছিলেন।

এই বৎসরে জন্মগ্রহণ তাঁর প্রিয় কন্যা হজরত ফাতিমা (রাঃ)

হজরতের নিভৃতে আধ্যাত্মিক সাধনা
এবং নবুওত লাভ: তৎকালীন আরবের বিবেকবুদ্ধি বিবর্জিত বর্বরোচিত মারামারি, কাটাকাটি, জুয়াখেলা, মদ্যপান, ব্যভিচার ইত্যাদি দেখে তাঁর মন তিক্ততায় ভরে ওঠে। অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে এবং এই অন্ধকারময় অবস্থান থেকে মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে তিনি মক্কার তিন মাইল দূরের জাবাল-আল্-নুর পাহাড়ের হেরা নামক পাহাড়ের গুহায় ধ্যান শুরু করেন। এইভাবে দীর্ঘদিন তিনি তাঁর প্রার্থনা অব্যহত রাখেন।  হেরা পর্বতের গুহায় মুহম্মদ (সাঃ) যখন ধ্যানমগ্ন থাকতেন, এই সময় হজরত আলী (রাঃ)  প্রায়ই তাঁর সাথে থাকতেন। কখনো কখনো তাঁরা একসাথে ৩-৪ দিন পর্যন্ত পাহাড়ে অবস্থান করতেন। এই সময় হজরত আলী (রাঃ) মাঝে মাঝে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জন্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যেতেন।

অবশেষে চল্লিশ বৎসর বয়সে তিনি নবুয়ত লাভ করেন। আল্লাহর প্রেরিত জিব্রাইল (আঃ) নামক ফেরেস্তার দ্বারা তিনি সুশিক্ষিত হয়ে ওঠেন। উল্লেখ্য, ৬১০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ আগষ্ট (সোমবার ২১শে রমজান) রাতে, ফেরেস্তা জিব্রাইল তাঁর কাছে আসেন- এবং নবীকে বলেন-

১. 'তুমি পড় তোমার সেই রব্বের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।
২. সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে।
৩. পড় এবং তোমার রব্ব মহামহিমান্বিত,
৪. যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।
৫. তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে (এমন জ্ঞান) যা সে জানতো না।
কোরান শরীফে এই পাঁচটি আয়াত-সহ মোট ১৭টি আয়াত সুরা 'আলাক' নামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

মুহম্মদ (সাঃ) -এর নবুয়ত লাভের পর- খাদিজা রাঃ প্রথম ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন। এরপরই দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে হজরত আলী (রাঃ)  এই ধর্মগ্রহণ করেছিলেন। প্রথমে এঁরা জিব্রাইল (আঃ) দ্বারা প্রাপ্ত আল্লার বাণীসমূহ গোপনে প্রচার শুরু করেন।   প্রথম তিন বৎসরে মাত্র ৩০জন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

৬১০ থেকে ৬১৩ খ্রিষ্টা\ব্দ পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত গোপনে কেবল নিকটাত্মীয় এবং বিশ্বস্ত বন্ধুদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন।
৬১৩ খ্রিস্টাব্দে আল্লাহর পক্ষ থেকে সূরা হিজর -এর ৯৪ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হয়:
' অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরওয়া করবেন না।"
মূলত ৬১৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকেই মূলত  তৎকালীন আরবের পৌত্তালিকরা, খ্রিষ্টানইহুদিরা মুসলমানদের বিরোধিতা শুরু করে।এই বিরোধিতা অত্যাচারের রূপলাভ করলে, ৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে নবুয়তের পঞ্চম বৎসরে একদল মুসলমান মক্কা ত্যাগ করে আবসিনিয়ায় গমন করেন।

৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে আরবের দুজন প্রভাবশালী এবং অসম সাহসী বীর ইসলাম গ্রহণ করেন, যা মক্কার প্রেক্ষাপট বদলে দেয়। এঁরা হলেন- ইসলামের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ঠেকাতে কুরাইশরা সব গোত্র মিলে একটি অমানবিক চুক্তি করে। তারা বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিব গোত্রকে (যারা রাসুলুল্লাহ সা.-কে রক্ষা করছিল) সামাজিকভাবে বয়কট করে। চুক্তির প্রধান শর্তগুলো ছিল: ৬১৭ থেকে ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অবরুদ্ধ জীবন
এই বয়কটের ফলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর বংশের লোকজন এবং অনুসারীদের নিয়ে মক্কার উপকণ্ঠে 'শিআবে আবি তালিব' নামক একটি সংকীর্ণ গিরিসংকটে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। দীর্ঘ ৩ বছর এই অবরোধ চলে। এই সময়টি ছিল বর্ণনাতীত কষ্টের। আরবের তপ্ত মরুভূমির মধ্যে খাদ্যহীন অবস্থায় মুসলমানরা গাছের পাতা ও শুকনো চামড়া চিবিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছেন। ক্ষুধার জ্বালায় অবোধ শিশুদের কান্নায় মক্কার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠত, কিন্তু কুরাইশরা তাদের ওপর দয়া করেনি।

১৯ খ্রিষ্টাব্দে অবরোধের সমাপ্তি ঘটে। এর পেছনে একটি বিশেষ অলৌকিক ঘটনা ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন যে, কাবার দেয়ালে ঝোলানো সেই অন্যায্য চুক্তিনামাটি উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে, কেবল 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' (আল্লাহর নাম) অংশটি বাদে। পরীক্ষা করে দেখা গেল তাঁর কথাটি হুবহু সত্য। এই অলৌকিকতা এবং মক্কার কিছু বিবেকবান নেতার প্রতিবাদের মুখে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।

অবরোধ থেকে মুক্তি পাওয়ার আনন্দ মুসলমানদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এই দশম বর্ষেই মহানবী (সা.) তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দুই স্তম্ভকে হারান । এঁরা হলেন- ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরি সনের শাওয়াল মাস) , মক্কায় কুরাইশদের অত্যাচার যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) ইসলামের দাওয়াত ও আশ্রয়ের আশায় তায়েফ অভিমুখে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি ১০ দিন অবস্থান করেন, কিন্তু তায়েফের সর্দাররা তাঁর সাথে অত্যন্ত অভদ্র আচরণ করে এবং একদল বখাটে ও যুবককে তাঁর পেছনে লেলিয়ে দেয়। তায়েফবাসীর পাথরের আঘাতে তিনি রক্তাক্ত হয়েছিলেন, এমনকি তাঁর জুতো রক্তে ভিজে শক্ত হয়ে গিয়েছিল।

সবে মেরাজ: আনুমানিক ৬২০-৬২১ খ্রিস্টাব্দ (হিজরতের প্রায় ১-১.৫ বছর আগে)। কিছু সূত্রে ২৬ ফেব্রুয়ারি ৬২১ খ্রি. উল্লেখ করা হয়। এটি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে এক অলৌকিক ঘটনা — মক্কা থেকে জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাস (ইসরা) এবং তারপর ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ (মেরাজ)। এই রাতেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়।

হযরত মুহম্মদ সাঃ - এর দ্বিতীয় বিবাহ
৬২১ খ্রিষ্টাব্দে  হজরত তাঁর ৫১ বৎসর বয়সে, সাওদা (রাঃ) নামক এক ৫০ বৎসর বয়স্কা নিঃস্ব বৃদ্ধাকে বিবাহ করেন। মহানবী (সা.)-এর ফুফু হযরত খাওলা বিনতে হাকিম (রা.)-এর প্রস্তাবে সাওদা (রা.)-এর সাথে এই বিবাহ সম্পন্ন হয়।    

হযরত মুহম্মদ সাঃ - এর তৃতীয় বিবাহ:
৬২১ খ্রিষ্টাব্দে, হজরত আবু বক্কর (রাঃ) এর কন্যা আয়সা (রাঃ) এর সাথে হজরতের সাথে আকদ্-হয়। আর বিবাহ হয় ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে । কথিত আছে তৎকালীনকালীন আরবের প্রধান দুটি সংস্কার ভঙ্গের জন্য হজরত এই বিবাহ করেছিলেন। সংস্কার দুটি ছিল এরূপ -    

১। রীতি ছিল যে , রক্তের সম্পর্ক নেই এমন ভাই সম্বোধনকারী ব্যক্তির কন্যার সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ। উল্লেখ্য, আয়সা (রাঃ)-এর পিতা আবু বক্কর (রাঃ) , হজরতের এরূপ ভাই ছিলেন।
২। প্রাচীন আরবে কোন এক সময় প্লেগ রোগ মহামারী আকার গ্রহণ করেছিল। এই মহামারী সওয়াল মাসে হয়েছিল বলে- এই মাসে কোন বিবাহ হতো না। উল্লেখ্য এই বিবাহ সওয়াল মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

হিজরত : বিধর্মীদের অত্যাচারের কারণে মুসলমানরা ধীরে ধীরে মক্কা থেকে মদিনায় চলে যান। এক সময় এরা হজরতের হত্যার পরিক ল্পনা গ্রহণ করলে , ইনি মক্কা থেকে মদিনায় গমন করেন। হজরতের জন্মভূমি মা পরিত্যাগ করে মদিনায় যাওয়া হিজরত নামে অভিহিত হয়ে থাকে। আল্লাহ'র নির্দেশ আসার পর, তিনি হজরত আলী-কে ডেকে, তাঁরে শয্যার উপর চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে নির্দেশ দেন এবং রাতের অন্ধকারে আবু বকর সিদ্দিকী (রাঃ) -কে সাথে নিয়ে মক্কা ত্যাগ করেন তিনি ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর এঁরা মদিনার নিকটবর্তী কুবা নামক স্থানে উপস্থিত হন। মুহম্মদ (সাঃ) একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। বর্তমানে এই মসজিদটি কুবা মসজিদ বা মাজিদ আল-কুবা নামে খ্যাত। এখানে চারদিন অবস্থান করার পর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর (১২ রবিউল আওয়াল) তারিখে তাঁরা মদিনাতে পদার্পণ করেন। এখানে এসে ইনি তাঁর প্রচারণা অব্যাহত রাখেন। অল্পদিনের মধ্যেই ইহুদিরা ব্যতীত মদিনার প্রায় সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। নামাজের প্রবর্তন, মদিনা চুক্তি এবং কেবলা পরিবর্তন : ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে অজু , পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুম্মার নামাজের প্রবর্তন হয়। মদিনা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে ইনি একটি সাধারণ প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন। মোট ৪৭টি শর্ত সম্বলিত এই চুক্তিটি মদিনা চুক্তি বা মদিনা সনদ নামে পরিচিত।

খ্রিষ্টীয় এই বছর থেকে এই ইসলামি পঞ্জিকা তথা হিজরি সন প্রচলিত হয়

৬২৩ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বকাল পর্যন্ত মুসলমানেরা জেরুজালেমের আল্-আকসা মসজিদের দিকে কেবলা করে নামাজ পড়তেন। এই বৎসর থেকে আল্লাহর নির্দেশে হজরত কেবলা পরিবর্তন করে কাবা-শরীফ ( 'মসজিদুল হারাম' নির্ধারণ করেন। সূরা আল-বাক্বারাহ -র ১৪৪ আয়াতে এই নির্দেশ পাওয়া যায়।

' নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব , অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেদিকে মুখ কর। যারা আহ্‌লে-কিতাব তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ্ বেখবর নন , সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে' সূরা আল-বাক্বারাহ -র ১৪৪ এই সময় থেকে রোজার প্রবর্তন হয়। 

হযরত মুহম্মদ সাঃ- এর চতুর্থ বিবাহ:
৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে বদরের যুদ্ধের কিছুদিন পর ইনি হজরত উমর (রাঃ)-এর কন্যা হজরত হাফসা (রাঃ) -কে বিবাহ করেন। উল্লেখ্য এই বৎসরেই আয়সা (রাঃ) হজরতের গৃহে বধূ হিসাবে পদার্পণ করেন।

বদরের যুদ্ধ:  ২ হিজরি (১৭ মার্চ, ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) মক্কার এক হাজার কুরাইশ সৈন্য মদিনা আক্রমণ করে। হজরত মাত্র ৩১৩ জন সঙ্গী নিয়ে এই আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য মদিনার নিকটবর্তী বদর নামক স্থানে উপস্থিত হন। ইসলামের ইতিহাসে এই যুদ্ধকেই প্রথম যুদ্ধ বলা হয়। এই যুদ্ধে মুসলমানরা জয়ী হন। বদরের যুদ্ধের পর , মদিনাতে ইসলাম ধর্ম দৃঢ়তর হয়েছিল। এই যুদ্ধের পর হজরত আলী (রাঃ)-এর সাথে হজরতের কন্যা ফাতিমা (রাঃ)-এর বিবাহ সম্পন্ন হয়।

ওহদের যুদ্ধ
: ৩ হিজরি ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মার্চ তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। বদরের যুদ্ধের পরাজয়ের পর কুরাইশরা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য , হিজরী তৃতীয় বর্ষে ৩০০০ হাজার সৈন্যসহ মদিনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। হজরত এই আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য ১০০০ সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হন। কিন্তু পথিমধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বিশ্বাসঘাতকতা করে তার ৩০০ অনুসারী অনুচর নিয়ে কুরাইশদের পক্ষে যোগদান করেন। ফলে হজরতের অধীনে শুধু মাত্র ৭০০ সৈন্য অবশিষ্ট থাকে। উভয় বাহিনী ওহদ নাম পাহাড়ের পাদদেশে সমবেত হন। এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী অংশত পরাজিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে হজরতের সামনের দুটি দাঁত ভেঙে যায় ও হামজাসহ ৭০ জন মুসলিম সৈন্য নিহত হন। অপরদিকে কুরাইশদের ২৩ জন সৈন্য নিহত হয়েছিল।

হযরত মুহম্মদ সাঃ- এর পঞ্চম বিবাহ: ওহদের যুদ্ধে, আব্দুল্লাহ ইবনে জাহ্‌শ শহিদ হলে- তাঁর বিধবা পত্নী জয়নব (রাঃ) -কে বিবাহ করেন।

হযরত মুহম্মদ সাঃ- এর ষষ্ঠ বিবাহ: ওহদের যুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবন আবদিল আসাদ নামক অপর একজন সাহাবি শহিদ হলে, ৬২৬ খ্রিষ্টাব্দে রাসুলুল্লাহ (সা.) -এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর বিধবা পত্নী উম্মে সালামা (রাঃ)-কে বিবাহ করেন। এরপর হিজরী পঞ্চম সনে, ইনি তাঁর পালক পুত্র জায়েদ বিন হারিসার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী জয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ)-কে বিবাহ করেন।

হযরত মুহম্মদ সাঃ- এর সপ্তম বিবাহ: ওহদের যুদ্ধে, আব্দুল্লাহ ইবনে জাহ্‌শ শহিদ হলে- তাঁর বিধবা পত্নী জয়নব (রাঃ)-কে বিবাহ করেন।

খন্দকের যুদ্ধ : ৫ হিজরির শওয়াল মাসে ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল মাসে কুরাইশ , ইহুদী ও বেদুঈন- এই তিন শক্তি একত্রিত হয়ে, আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মদিনা আক্রমণের জন্য রওনা হয়। এই সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল ১০,০০০। হজরত এই বিশাল বাহিনীর প্রতিরোধের জন্য মাত্র ৩,০০০ সৈন্য সংগ্রহ করতে সমর্থ হন। হজরত প্রথমে সাহাবাদের সাথে আলোচনা করে স্থির করেন যে, এই প্রতিরোধ তাঁরা শহরের ভিতরে থেকে করবেন। এই সময় সালমান ফারসী নামক জনৈক পারস্যবাসী মুসলমানের পরামর্শে এবং হজরতের নির্দেশে মদিনার উত্তর-পশ্চিমাংশের অরক্ষিত অংশে মুসলমানরা পরিখা খনন করেন। পরিখা খননের কিছুদিনের মধ্যে- আক্রমণকারী সম্মিলিত বাহিনী পরিখার অপর প্রান্তে এসে হাজির হলো।

৩১ মার্চ তারিখে তাদের আক্রমণ শুরু হয়। সম্মিলিত বাহিনী পরিখা অতিক্রমের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে, তারা মদিনা অবরোধ করে রাখে। তারা মোট ২৭ দিন এই অবরোধ অটুট রাখতে সমর্থ হয়েছিল। ইতিমধ্যে, ঝড় ও প্রবল হিমেল হাওয়ায় সম্মিলিত বাহিনীর সদস্যরা কাহিল হয়ে পড়ে। এক সময় এদের খাদ্যাভাব দেখা দিলে , সম্মিলিত বাহিনীর অধিনায়ক আবু সুফিয়ান অবরোধ তুলে ফেলে স্বদেশে যাত্রা করলো। এই যুদ্ধে পরিখা খনন করে মদিনা রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে- এই যুদ্ধ খন্দকের যুদ্ধ নামে খ্যাত। উল্লেখ্য আরবী খন্দক শব্দের অর্থ হলো পরিখা। মদিনা অবরোধ কার্যকরী না হওয়াতে, মুসলমানরা বিভিন্নভাবে যথেষ্ঠ লাভবান হয়। প্রথমেই ইহুদী ও বেদুঈনরা, কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। ফলে আক্রমণকারী কুরাইশদের শক্তি হ্রাস পায়। পক্ষান্তরে মদিনা রক্ষা পাওয়ায়- হজরতের সম্মান বৃদ্ধি পায় এবং মদিনাবাসীরা তাঁকে একমাত্র নেতা হিসাবে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করেন। এই সাথে দিন নব-মুসলমানরা এসে মুসলমানদের জনশক্তিকে বৃদ্ধি করে তোলে।

হযরত মুহম্মদ সাঃ- এর অষ্টম বিবাহ: উক্ত যুদ্ধে, বনী মুস্তালিক গোত্রের প্রধানের কন্যা জুয়াইরিয়া বিনতে হারেস বন্দী হন। জুয়াইরিয়া (রা.) যুদ্ধবন্দী হিসেবে সাহাবী সা'বেত ইবনে কায়েস (রা.)-এর অংশে পড়েন। অভিজাত পরিবারের মেয়ে হওয়ায় তিনি দাসত্বের জীবন মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি সা'বেতের সাথে একটি চুক্তিতে (মুকাতাবা) আসেন যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিলে তিনি মুক্তি পাবেন। কিন্তু তাঁর কাছে কোনো অর্থ ছিল না। জুয়াইরিয়া (রাঃ) সাহায্যের আশায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হন এবং নিজের পরিচয় দিয়ে চুক্তির অর্থ পরিশোধের আবেদন জানান। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর মর্যাদা রক্ষা করার জন্য একটি প্রস্তাব দেন: "আমি কি তোমার জন্য এর চেয়েও উত্তম কিছু করব? আমি তোমার পক্ষ থেকে ওই অর্থ পরিশোধ করে দেব এবং তোমাকে বিবাহ করব।" জুয়াইরিয়া (রা.) অত্যন্ত আনন্দের সাথে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ৫ হিজরির শাবান মাসে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়।

হযরত মুহম্মদ সাঃ- এর অষ্টম বিবাহ: ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে কুরাইশ , ইহুদী ও বেদুঈন-দের সাথে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই ঘটনার পর রাইহানা (রাঃ) মুসলমানদের অধীনে আসেন। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন বলে বহু ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
ধারণা করা হয় ষষ্ঠ বা সপ্তম হিজরীতে রেহানা (রাঃ)-কে বিবাহ করেছিলেন।

হযরত মুহম্মদ সাঃ- এর নবম বিবাহ: উম্মে হাবিবা (রাঃ) ইসলামের একদম শুরুর দিকেই তাঁর স্বামী ওবায়দুল্লাহ ইবনে জাহাশ-সহ ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কার কাফেরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁরা সপরিবারে হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করেছিলেন। হাবশায় থাকাবস্থায় তাঁর জীবনে এক চরম বিপর্যয় নেমে আসে। তাঁর স্বামী ওবায়দুল্লাহ ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং সেখানে মদ্যপ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। উম্মে হাবিবা (রা.) একাকী হয়ে পড়লেও নিজের ঈমান হারাননি। তিনি তাঁর শিশুকন্যা হাবিবা-কে নিয়ে অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে প্রবাস জীবন কাটাতে থাকেন। (এই মেয়ের নাম অনুসারেই তাঁর ডাকনাম হয় 'উম্মে হাবিবা')।

মুরাইসীর যুদ্ধ: ৫ হিজরির সাবান মাসে ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে বনী মুস্তালিক গোত্রের প্রধান হারেস বিন আবু দিরার একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। এই সংবাদ মদিনায় পৌঁছিলে- এদেরকে বাধাদানের উদ্দেশ্যে হজরত অগ্রসর হন। মুরাইসী নামক স্থানে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে বনী মুস্তালিক গোত্রের যোদ্ধারা পরাজিত হয়।

আয়সা (রাঃ)-এর ইফক (মিথ্যা অপবাদ) ঘটনা: ৫ হিজরি (বা কিছু সূত্রে ৬ হিজরি), বনু মুস্তালিক (মুরাইসী) অভিযান থেকে ফেরার পথে। ঘটনা:  আয়সা (রাঃ) সফরে একটি হার (নেকলেস) হারিয়ে ফেলেন। তিনি তা খুঁজতে গিয়ে হাওদা (উটের পালকি) থেকে নেমে পড়েন। কাফেলা না জেনে চলে যায়। তিনি সেখানে অপেক্ষা করতে থাকেন। পরদিন সকালে সাফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল (রা.) তাঁকে দেখতে পান, নিজের উটে চড়িয়ে কাফেলার সাথে মিলিয়ে দেন। এই সাধারণ ঘটনাকে মুনাফিকদের নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল ও তার অনুসারীরা মিথ্যা অপবাদ (ইফক) দিয়ে ছড়িয়ে দেয় যে, আইশা (রা.) ও সাফওয়ান (রা.)-এর মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক হয়েছে। এই গুজব মদিনায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। নবী মুহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত মর্মাহত ও বিব্রত হন। আইশা (রা.) গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কষ্ট ভোগ করেন। আবু বকর (রা.) ও তাঁর পরিবারও চরম মানসিক কষ্টে ভোগেন। কিছু সাহাবীও এই গুজবে প্রভাবিত হন।

অবশেষে সূরা আন্-নূর-এর ১১ থেকে ২০ আয়াত নাযিল হয়। এতে আইশা (রা.)-এর পবিত্রতা ও নির্দোষিতা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয় এবং মিথ্যা অপবাদকারীদের তীব্র নিন্দা করা হয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, যারা সৎ নারীদের উপর অপবাদ দেয়, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি রয়েছে। এ ঘটনার পর আইশা (রা.)-এর প্রতি নবী (সা.)-এর ভালোবাসা ও সম্মান আরও বৃদ্ধি পায়।



জুয়াইরিয়া (রাঃ)-এর এই বিবাহের খবর যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাহাবীগণ বলতে শুরু করেন— "যে গোত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিবাহ করেছেন, তারা তো এখন রাসুলুল্লাহর আত্মীয় (শ্বশুরবাড়ির লোক); তাঁদের আমরা বন্দী হিসেবে রাখতে পারি না।" সাহাবীগণ তাৎক্ষণিকভাবে বনু মুস্তালিক গোত্রের প্রায় ১০০টি পরিবারের সকল বন্দীকে মুক্তি দিয়ে দেন। এই অভাবনীয় ঘটনা দেখে জুয়াইরিয়া (রা.)-এর পিতা এবং তাঁর গোত্রের অধিকাংশ লোক ইসলাম গ্রহণ করেন।

হযরত মুহম্মদ সাঃ- এর দশম বিবাহ: এই যুদ্ধে ইহুদীরা পরাজয়ের পর তিনি  খাইবারের সাবিহা নামক স্থানে ইহুদী কন্যা সাফিয়া (রাঃ)-কে বিবাহ করেন। তাঁর পিতা হুয়াই ইবনে আখতাব ছিলেন মদিনার বিখ্যাত ইহুদি গোত্র 'বনু নাযির'-এর সর্দার। তাঁর মাতা বাররাহ বিনতে সামাওয়ালও ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত ইহুদি পরিবারের কন্যা। বংশগতভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাশীল, যাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন নবী হারুন (আ.)। খাইবার যুদ্ধে তাঁর স্বামীখ কেনানার মৃত্যুর পরই সাফিয়া (রা.) যুদ্ধবন্দী হিসেবে মুসলিমদের হাতে আসেন এবং পরবর্তী সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়।

হোদায়বিয়ার সন্ধি ও  খন্দকের যুদ্ধের পর মদিনায় হিজরতকারী মুসলমানরা মক্কায় প্রত্যাবর্তনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলে , হজরত ষষ্ঠ হিজরীতে (৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ) ওমরাহ হজ ও মাতৃভূমি দর্শনের জন্য মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। জিলকদ মাসে আরবে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল বলে- ১৪০০ নিরস্ত্র মুসলমান নিয়ে তিনি অগ্রসর হন। কুরাইশরা এই দলকে বাধা প্রদানের জন্য, খালিদ ও ইকরিমরার নেতৃত্বে একদল সৈন্য প্রেরণ করে। হজরত এই সংবাদ অবগত হওয়ার পর, ঘুর পথে মক্কার নয় মাইল দূরে হোদায়বিয়া নামক স্থানে তাঁবু স্থাপন করেন। এই স্থানে কুরাইশদের সাথে হজরতের যে সন্ধি হয় তাকেই এই সন্ধি হোদায়বিয়ার সন্ধি বলা হয়।

এই সন্ধির মূল বিষয় ছিল-



 

হযরত মুহম্মদ সাঃ- এর দ্বাদশ বিবাহ:
৭ হিজরি / ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে রাসুলুল্লাহ (সা.)- যখন উমরাহ করার জন্য মক্কায় যান, তখন মক্কার অদূরে 'সারিফ' নামক স্থানে মায়মুনা (রাঃ) - এরা সাথে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি হযরত আব্বাস (রা.)। ৪ শত দিরহাম মোহরানার বিনিময়ে এই বিবাহ সম্পন্ন হয়।

হযরত মুহম্মদ সাঃ- এর দাসী মারিয়া কিবতিয়া (রাঃ)
হোদায়বিয়ার সন্ধির পর হজরত মক্কা মদিনার আশেপাশের রাষ্ট্রগুলিতে দূত মারফত ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। এই দাওয়াতের জবাবে মুকাউস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করেও, হজরতের সম্মানার্থে কিছু উপহারসহ দুজন খ্রিষ্টান রমণীকে পাঠান। এই দুজনের নাম ছিল মারিয়া কিবতিয়া (রাঃ) ও শিরিন। এঁরা দুজন হজরতের অনুরোধে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। হজরত মারিয়া কিবতিয়া (রাঃ) -কে নিজের জন্য রেখে শিরিনকে তাঁর এক সাহাবীর কাছে প্রেরণ করেন। মারিয়া কিবতিয়া (রাঃ) কে বিবাহ না করলেও ইনি তাঁকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে রাখেন। এঁর গর্ভে হজরতের একটি পুত্র সন্তান জন্মেছিল। এই পুত্রের নাম ছিল- ইব্রাহিম।

খাইবার বিজয় ইতি পূর্বে বিশ্বাসঘসাতকতার কারণে যে সকল ইহুদী মদিনা থেকে বিতারিত হয়েছিলেন। সে সকল ইহুদীরা মদিনার শতাধিক মাইল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত খাইবার নামক স্থানে হজরতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এমনকি তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য প্রায় চার সহস্রাধিক লোক সংগ্রহ করেন। হজরত এই বিষয় অবগত হয়ে সপ্তম হিজরীতে ১৬০০ জন সৈন্য নিয়ে খাইবার অভিযানে বের হন। এই যুদ্ধে ইহুদীরা চরমভাবে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করে।


রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন তাঁর এই কঠিন পরিস্থিতির কথা জানতে পারেন, তখন তিনি হাবশার রাজা নাজাশী-র কাছে চিঠি পাঠিয়ে উম্মে হাবিবাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। হাবশার রাজা নিজেই এই বিবাহের আয়োজন করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষে সাহাবী খালিদ ইবনে সাইদ (রা.) ওকালতি করেন। রাজা নাজাশী নিজের পক্ষ থেকে ৪ শত স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) মোহরানা প্রদান করেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম অনন্য বিবাহ, যেখানে বর (রাসুলুল্লাহ সা.) সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না।


মুতার যুদ্ধ :
রোমীয় সামন্তরাজ শোরাইবিল মুতা নামক স্থানে মুহম্মদ (সাঃ) প্রেরিত মুসলিম রাজদূতকে হত্যা করে। ফলে, অষ্টম হিজরীতে জায়েদ বিন হারিসের নেতৃত্বে একদল সৈন্য মুতায় প্রেরিত হয়। সিরিয়া সীমান্তের কাছে মুতা প্রান্তরে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রথম দিকে যুদ্ধে মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে এই যুদ্ধে মুসলমানদের জয় হয়।

মক্কা বিজয়
: মুতার যুদ্ধের জয়ের পর মুসলমানদের শক্তি আরো বৃদ্ধি পায়। অপর দিকে রাজনৈতিক মতভেদ , কুরাইশদের প্রখ্যাত বীরদের ইসলামধর্ম গ্রহণ ইত্যাদি কারণে- কুরাইশরা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর মধ্যে মুসলমানদের পক্ষে যোগদানকারী খোজা স ম্প্রদায়কে- কুরাইশদের আশ্রয়পুষ্ট বানু সম্প্রদায় আক্রমণ করে এবং খোজা স ম্পদায়ের কয়েকজনকে হত্যা করে। ফলে হোদায়বিয়ার সন্ধি লঙ্ঘিত হয়। এরপর মুহম্মদ (সাঃ) এই হত্যার বিচার ও মীমাংশার জন্য কুরাইশদের কাছে প্রস্তাব তুললে , কুরাইশরা তা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে মুহম্মদ (সাঃ) প্রায় দশ হাজার সৈন্য নিয়ে ম ক্কা অভিযানে অগ্রসর হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিনা যুদ্ধে ম ক্কা বিজয় স ম্পন্ন হয়। এই বিজয়ের পর কুরাইশদের সকল অতীত কার্যাবলীর জন্য মুহম্মদ (সাঃ) সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। এই সময় কাবা শরীফে রক্ষিত ৩৬০টি মূর্তি অপসারিত করা হয়।

হুনায়ুনের যুদ্ধ
: মক্কা বিজয়ের পর, মক্কা তায়েফের মধ্যবর্তী অঞ্চলের হাওয়াজিন ও সাকীফ গোত্রদ্বয় ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এরা বেদুইনদের সাথে নিয়ে প্রায় ২০ ,০০০ সৈন্যে বলিয়ান হয়ে ম ক্কার তিন মাইল দূরে হুনায়ুন উপত্যাকায় সমবেত হয়। মুসলমানদের সাথে এই যুদ্ধে বিদ্রোহীরা স ম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়।

তাবুক অভিযান : ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত রোম সম্রাট আরব তথা নূতন-মুসলিম রাষ্ট্র দখল করার সিদ্ধান্ত নিলে- মুহম্মদ (সাঃ) রোমান বাহিনীকে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে- একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে তাবুক নামক স্থানের দিকে অগ্রসর হন। মুসলমানদের বিশাল আয় োজনের সংবাদ পেয়ে- রোমান সৈন্যরা পলায়ন করে। ফলে বিনা যুদ্ধে অভিযান শেষ হয়। এই অভিযান শেষে মুহম্মদ (সাঃ) আরবের বিভিন্ন গোত্রকে ধর্মীয় আদর্শে একক নেতৃত্বের অধীনে আনেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈদেশিক স ম্পর্ক সুদৃঢ় করেন।

দশম হিজরীতে (৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি) ইনি লক্ষাধিক মুসলমান নিয়ে মক্কায় হজ পালন করেন। এই হজকে বিদায় হজ বলা হয়। হজ শেষে ইনি আরাফাত পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। বিদায় হজ শেষে ইনি মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। সিরিয়ায় একজন মুসলিম দূতকে হত্যার কারণে , ইনি সিরিয়া অভিযানের নির্দেশ দেন। এই অভিযানে ইনি ক্রীতদাসপুত্র ওসামাকে সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু বিবিধ কারণে এই অভিযানে বিলম্ব ঘটে।

ইতিমধ্যে মুহম্মদ (সাঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর দীর্ঘ রোগভোগের পর ইনি একাদশ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল , সোমবার (৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই জুন) ৬৩ বৎসর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।