কাবা
আরবি : الكعبة (আল-কা-বাহ)।
সমার্থক শব্দাবলি : কাবা, কাবাঘর, কাবা শরীফ

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্রগৃহ এবং প্রধান তীর্থগৃহ। এই গৃহের দিকে মুখ করে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা নামাজ বা সালাত আদায় করেন। এছাড়া হজ্জ এবং ওমরাহ পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ করেন। এটি সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে ' মসজিদ আল হারেম' নামক মসজিদের মাঝখানে অবস্থিত। এর ভৌগলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫ ডিগ্রি দক্ষিণ এবং ৩৯.৮২৬২০১৩ ডিগ্রী পূর্ব।

এরা আকার প্রায় ঘন। আরবি শব্দ
ا (আল-কা-বাহ) অর্থ ঘন। এই শব্দ থেকে কাবা এই নামটি গৃহীত হয়েছে। একটি নিকবর্তী পাহাড় থেকে আহরিত  গ্রানাইট পাথর দ্বারা নির্মিত। এর ভিত্তিভূমি মার্বেল পাথরের তৈরি। এর অভ্যন্তর ভাগের মেঝে মার্বেল পাথর ও চুনাপাথরে তৈরি। দেয়ালের অর্ধেকটা দামি মার্বেল পাথরে মোড়া। আর দেওয়ালের উপরিভাগে রয়েছে সবুজ রঙের কাপড়। এই কাপড়ে কোরআন শরীফ লিপিবদ্ধ রয়েছে।

শরীফের উচ্চতা পূর্ব দিক থেকে ১৪ মিটার, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক থেকে ১২.১১ মিটার এবং উত্তর দিক থেকে ১১.২৮ মিটার। এর ভেতরের মেঝে রঙ্গিন মার্বেল পাথরে তৈরী। এর সিলিংকে তিনটি কাঠের পিলার ধরে রেখেছে। প্রতিটি পিলারের ব্যাস ৪৪ সে.মি.। কাবা শরীফের দুটি সিলিং রয়েছে। এর ভেতরের দেয়ালগুলি সবুজ ভেলভেটের পর্দা দিয়ে আবৃত। এই পর্দাগুলি প্রতি তিন বছর পর পর পরিবর্তন করা হয়। এর ছাদে ১২৭ সে.মি লম্বা ও ১০৪ সে.মি. প্রস্থের একটি ভেন্টিলেটার আছে যেটি দিয়ে সূর্যের আলো ভেতরে প্রবেশ করে। এটি একটি কাচ দিয়ে ঢাকা থাকে। কাবা ঘরের ভেতর প্রতি বছর দুবার ধোয়া হয়।  একবার শাবান মাসের ১৫ তারিখ এবং অপর বার মহররম মাসের মাঝামঝি সময়ে। এই সময় মেঝে এবং দেয়াল গোলাপ ও আতর মিশ্রিত জমজমের পানি দিয়ে ধোয়া হয়। ধোয়ার পরে মেঝে এবং দেয়াল সাদা কাপড় দিয়ে মোছা হয়। এরপর দেয়ালগুলোকে আতর দিয়ে সুগন্ধিত করা হয়। কাবা শরীফের কালো কাপড়ের আবরণটিকে বলা হয় কিশওয়া। এটি প্রতি বছর ৯ই জিলহজ্জ পরিবর্তন করা হয়। — সুত্র : সৌদি গেজেট, ৩ জানুয়ারী, ২০১০।

মাকামে ইব্রাহিম: কাবাঘরের পাশে অবস্থিত একটি বর্গাকৃতির পাথর রয়েছে। একটি লোহার বেষ্টনীর ভেতর একটি ক্রিস্টালের বাক্সের ভিতর এই পাথরটি রাখা আছে। এই পাথরটির নাম মাকামে ইব্রাহিম এর আভিধানিক অর্থ কালো পাথর। মুসলমানদের কাছে এটি অতি মূল্যবান ও পবিত্র পাথর হিসাবে স্বীকৃত। হজের সময় তাওয়াফ (কাবা শরিফ সাতবার চক্কর দেওয়া) শুরুর স্থান হিসাবে এই পাথরটি নির্ধারিত চিহ্ন হিসাবে নির্দেশিত হয়।

পাথরটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমান, প্রায় ১৮ ইঞ্চি। আরবি মাকাম শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে দাঁড়ানোর স্থান। কথিত আছে অর্থাৎ হজরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর দাঁড়ানোর স্থান ছিল এই পথরটি। এই পাথরে দাঁড়িয়ে তিনি কি করতেন, তা নিয়ে মতভেদ আছে। এগুলোর মধ্যে বহুল প্রচলিত গল্পটি হলো, কাবা শরিফের দেয়ালের উঁচু অংশ নির্মাণের সময় তিনি এর উপর দাঁড়িয়ে কাজ করতেন। পাথরের মাঝখানে একজোড়া পায়ের ছাপ আছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা বিশ্বাস করেন, হজরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর অলৌকিক স্পর্শের  কারণে শক্ত পাথরটি ভিজে তাতে তাঁর পায়ের দাগ বসে যায়। আগে এই পাথরট অন্যত্র ছিল। হযরত উমর (রাঃ)-এর সময় পাথরটিকে সরিয়ে বর্তমান জায়গায় বসানো হয়।


কাবাঘরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, তাওয়াফের জায়গা থেকে দেড় মিটার উঁচুতে একটি কালো বর্ণের পাথর স্থাপিত আছে। একে বলা হয় হজরে আসওয়াদ

ইতিহাস
ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন যে, এই ঘরটি প্রথম তৈরি করেছিলেন হজরত আদম (আঃ)। কোরআন-এর সুর ইমরানের ৯৬ সংখ্যক আয়াতে বলা হয়েছে — ' নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্য হেদায়েত ও বরকতময় ।'

আদিতে কাবা ছিল একটি কালো বর্ণের উল্কাপিণ্ডকে ঘিরে চারটি দেওয়াল বিশিষ্ট ঘনাকৃতির স্থাপনা। এর কোনো ছাদ ছিল না। স্থানীয় অধিবাসীরা এই উল্কাপিণ্ডকে ভক্তি করতো। তারা মনে করতো আকাশ থেকে দেবতারা এই পবিত্র পাথর প্রেরণ করেছে।

এর পর দীর্ঘদিন অতিক্রমণের পর এই ঘরটি নষ্ট হয়ে যায় এবং আরবের লোকেরা এই ঘরের কথা ভুলে গিয়েছিল। আল্লাহর নির্দেশে এই ঘরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন হজরত ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আঃ)। সুরা বাকারা'র ১২৭ সংখ্যক আয়াতে এই সম্পর্কে বলা হয়েছে — ' স্মরণ কর যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা বাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিল। তারা দোয়া করেছিলঃ পরওয়ারদেগার! আমাদের থেকে কবুল করL নিশ্চয়ই, তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ।' হজরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর নেতৃত্বে নির্মিত কাবাঘরের তত্ত্বাবধান করেছেন পরবর্তী আরবের বিভিন্ন গোত্র। মক্কায় যেসব গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতিপত্তি ছিল, তাদের দায়িত্ব থাকতো কাবা শরিফ রক্ষণাবেক্ষণের। এ দায়িত্ব পালনকে তারা সম্মানিত ও গর্বের মনে করতো। এই তত্ত্বাবধানের প্রথম দিকে দায়িত্ব নিয়েছিল মক্কার জুরহাস সম্প্রদায়। 
১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে বন্যায় কাবাশরিফ
৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে কাবাঘরকে সংস্কার করেছিলেন মোজার সম্প্রদায়। হজরত মুহাম্মদ সাঃ নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে কাবাঘর সংস্কার করে মক্কার বিখ্যাত কোরাইশ বংশ। কোরাইশরা কাবা শরিফ সংস্কারের পর হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। এর মীমাংশা করেছিলেন হজরত মুহাম্মদ সাঃ। এই গৃহে পরবর্তী সময়ে হজরে আসওয়াদ নামক পাথর স্থাপন করা হয়।

মুসলমানরা প্রথম এই ঘরের সংস্কার করেন ৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে। ধারণা করা হয়, এই ঘরটি তৈরিতে ব্যাবহার করা হয়েছিল লোহিত সাগরের কুলে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি বাইজেন্টিয়ান বা আবসিনিয়ার জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে। এই সময় এই ঘর এবং এর পার্শ্বর্তী অঞ্চলকে পবিত্র অঞ্চল বা হারাম বলে গণ্য করা হতো। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মুসলমানরা নামাজ পড়তো জেরুজালেমের আল-আক্‌সা মসজিদের দিকে মুখ করে। ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে 'মসজিদুল হারাম' তথা কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ার নির্দেশ আসে আল্লার পক্ষ থেকে।সূরা আল-বাক্বারাহ-র ১৪৪ আয়াতে এই নির্দেশ পাওয়া যায়। ' নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেদিকে মুখ কর। যারা আহ্‌লে-কিতাব, তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ্ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে।' [ সূরা আল-বাক্বারাহ-র ১৪৪]

১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় ভয়ানক বন্যা হয়। এর ফলে কাবা'র চার পাশ প্লাবিত হয়েছিল।
সূত্র: