নৃভাষাতত্ত্ব
Anthropological Linguistics
ভাষাতত্ত্বের
একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এতে ভাষা, মানুষ, সমাজ ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এই শাখায় ভাষাকে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, জীবনধারা, বিশ্বাস, জ্ঞান, আচার-অনুষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও বিশ্বদৃষ্টির বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নৃভাষাতত্ত্ব মূলত ভাষাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্ব -এর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি আন্তঃবিষয়ক শাস্ত্র।
ব্যুৎপত্তি: নৃভাষাতত্ত্ব ব্যুৎপত্তিগত রূপ হলো-নৃভাষাতত্ত্ব = নৃ+ ভাষা+ তত্ত্ব
- নৃ = মানুষ বা মানবসমাজ।
- ভাষা = ভাব ও চিন্তা প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত ধ্বনি বা প্রতীকের নিয়মবদ্ধ ব্যবস্থা।
- তত্ত্ব = মূলনীতি, বিজ্ঞান বা বিশ্লেষণ।
ইংরেজি
Anthropological Linguistics
শব্দটি
Anthropology
(নৃতত্ত্ব) এবং
Linguistics (ভাষাতত্ত্ব) থেকে উদ্ভূত।
সংজ্ঞা: যে শাস্ত্রে ভাষা এবং মানবসমাজের সংস্কৃতি, জীবনধারা, সামাজিক সংগঠন ও বিশ্বদৃষ্টির পারস্পরিক সম্পর্ক বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তাকে নৃভাষাতত্ত্ব বলে।
নৃভাষাতত্ত্বের উদ্দেশ্য: নৃভাষাতত্ত্বের প্রধান উদ্দেশ্য হলো—
- ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা।
- বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষাগত বৈশিষ্ট্য নথিভুক্ত করা।
- ভাষার মাধ্যমে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ব্যাখ্যা করা।
- বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণে সহায়তা করা।
- ভাষার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও বিশ্বদৃষ্টি অনুধাবন করা।
- ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা।
নৃভাষাতত্ত্বের ইতিহাস: ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা প্রাচীনকাল থেকেই থাকলেও নৃভাষাতত্ত্ব একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিকশিত হয়।
উনবিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন আদিবাসী ও স্বল্পপরিচিত ভাষার তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার সূচনা হয়।
মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ Franz Boas
নৃভাষাতত্ত্বের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি উত্তর আমেরিকার আদিবাসী ভাষা নথিভুক্ত করে ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। তাঁর শিষ্য
Edward Sapir
ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন।
পরবর্তীকালে Benjamin Lee Whorf
ভাষা মানুষের চিন্তা ও বিশ্বদৃষ্টিকে প্রভাবিত করে—এই ধারণা (Sapir–Whorf Hypothesis) উপস্থাপন করেন।
বর্তমানে নৃভাষাতত্ত্ব বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণ, ভাষাগত নৃতত্ত্ব, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ভাষা-নথিভুক্তকরণ এবং ভাষা-প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
নৃভাষাতত্ত্বের প্রধান শাখা
- ভাষা ও সংস্কৃতি
(Language and Culture): ভাষা কীভাবে সংস্কৃতির বাহক হিসেবে কাজ করে তা বিশ্লেষণ করে।
- ভাষাগত নৃতত্ত্ব
(Linguistic Anthropology): মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণে ভাষার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করে।
- বিপন্ন ভাষা গবেষণা
(Endangered Language Studies): বিলুপ্তপ্রায় ভাষার নথিভুক্তকরণ, সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবন নিয়ে গবেষণা করে।
- ভাষা ও বিশ্বদৃষ্টি
(Language and Worldview):
ভাষা মানুষের চিন্তা, শ্রেণিবিন্যাস ও বাস্তবতা উপলব্ধিকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা বিশ্লেষণ করে।
নৃভাষাতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়
- ভাষা ও সংস্কৃতি
(Language and Culture)
- ভাষা ও সমাজ
(Language and Society)
- ভাষা ও পরিচয়
(Language and Identity)
- ভাষাগত আপেক্ষিকতা
(Linguistic Relativity)
- ভাষা-নথিভুক্তকরণ
(Language Documentation)
- বিপন্ন ভাষা
(Endangered Languages)
- লোকসাহিত্য ও মৌখিক ঐতিহ্য
(Oral Tradition)
- ভাষাগত বৈচিত্র্য
(Linguistic Diversity)
- নামকরণ পদ্ধতি
(Naming Systems)
- আত্মীয়তাসূচক পরিভাষা
(Kinship Terminology)
- ভাষা ও বিশ্বদৃষ্টি
(Language and Worldview)
নৃভাষাতত্ত্বের প্রধান তত্ত্বসমূহ
- বোয়াসীয় নৃভাষাতত্ত্ব
(Boasian Anthropology)
- স্যাপির–হোর্ফ তত্ত্ব
(Sapir–Whorf Hypothesis)
- ভাষাগত আপেক্ষিকতা
(Linguistic Relativity)
- জাতিতাত্ত্বিক ভাষাচর্চা (Ethnography
of Speaking)
- সাংস্কৃতিক ভাষাতত্ত্ব (Cultural
Linguistics)
নৃভাষাতত্ত্বের গুরুত্ব
- ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে।
- বিলুপ্তপ্রায় ভাষা সংরক্ষণে সহায়তা করে।
- বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নথিভুক্ত করতে সাহায্য করে।
- ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে।
- নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের গবেষণায় সহায়ক।
- আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগের ভিত্তি সুদৃঢ় করে।
তথ্যসূত্র :
- Anthropological Linguistics: An Introduction — William A. Foley, Blackwell Publishers, 1997
- Language, Culture, and Society — Zdeněk Salzmann, Westview Press, 1998
- Language — Edward Sapir, Harcourt, Brace and Company, 1921
- Language, Thought, and Reality — Benjamin Lee Whorf, MIT Press, 1956
- The Mind of Primitive Man — Franz Boas, The Macmillan Company, 1911
- The Origin and Development of the Bengali Language — Suniti Kumar
Chatterji, University of Calcutta, 1926
ভাষাতত্ত্ব — রফিকুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ১৯৯২।