তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব
Comparative Linguistics
ভাষাতত্ত্বের
একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এতে দুই বা ততোধিক ভাষার ধ্বনি, রূপ, শব্দভাণ্ডার,
বাক্যগঠন ও অর্থগত বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের পারস্পরিক
সম্পর্ক, উৎপত্তি ও বিকাশ অনুসন্ধান করা হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভাষাগুলোর
বংশগত (genetic) সম্পর্ক নির্ণয় করা, ভাষাপরিবার প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রয়োজনে একটি
আদিভাষার
(Proto-language)
সম্ভাব্য রূপ পুনর্গঠন করা। ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের অন্যতম প্রধান গবেষণাপদ্ধতি হলো
তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব। তবে এটি কেবল ভাষার ইতিহাস নয়, ভাষাগুলোর গঠনগত সাদৃশ্য ও
বৈসাদৃশ্যও বিশ্লেষণ করে।
ব্যুৎপত্তি:তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ব্যুৎপত্তিগত রূপ হলো- তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব = তুলনা+ মূলক+ ভাষা+তত্ত্ব
- তুলনা = দুই বা ততোধিক বিষয়ের মিল ও অমিল বিচার।
- মূলক = সম্পর্কিত বা ভিত্তিক।
- ভাষা = ভাব ও চিন্তা প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত ধ্বনি বা প্রতীকের নিয়মবদ্ধ ব্যবস্থা।
- তত্ত্ব = মূলনীতি, বিজ্ঞান বা বিশ্লেষণ।
ইংরেজি
Comparative Linguistics
শব্দগুচ্ছ
Comparative (তুলনামূলক) এবং
Linguistics (ভাষাতত্ত্ব) থেকে উদ্ভূত।
সংজ্ঞা: যে শাস্ত্রে দুই বা ততোধিক ভাষার ধ্বনি, রূপ, শব্দ, বাক্যগঠন ও অর্থের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের বংশগত সম্পর্ক, উৎপত্তি ও বিকাশ নির্ণয় করা হয়, তাকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বলে।
তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের উদ্দেশ্য:
- ভাষার ভাষাগুলোর বংশগত সম্পর্ক নির্ণয় করা।
- ভাষাপরিবার প্রতিষ্ঠা করা।
- আদিভাষার সম্ভাব্য রূপ পুনর্গঠন করা।
- নিয়মিত ধ্বনি-পরিবর্তনের ধারা নির্ণয় করা।
- সমমূল শব্দ
(Cognates) শনাক্ত করা।
ভাষার ঐতিহাসিক বিকাশ ব্যাখ্যা করা।
তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের ইতিহাস: প্রাচীনকাল থেকেই ভাষার মধ্যে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা হলেও আধুনিক তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের সূচনা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে।
১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে
Sir William Jones সংস্কৃত, গ্রিক ও লাতিন ভাষার মধ্যে গভীর সাদৃশ্য নির্দেশ করে মত প্রকাশ করেন যে, এদের একটি অভিন্ন পূর্বসূরি ভাষা ছিল। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ থেকেই আধুনিক তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
পরবর্তীকালে
Rasmus Rask, Franz Bopp, Jacob Grimm, August Schleicher, Karl Brugmann এবং নব্য-ব্যাকরণবিদগণ ভাষার নিয়মিত ধ্বনি-পরিবর্তন ও ভাষার পুনর্গঠন পদ্ধতি বিকাশ করেন।
Grimm's Law
এবং
Verner's Law তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বর্তমানে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ভাষাপরিবার নির্ণয়, ভাষার ডিজিটাল পুনর্গঠন, ঐতিহাসিক অভিধান প্রণয়ন এবং প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়
Language Family)
আদিভাষা
(Proto-language)
সমমূল শব্দ
(Cognates)
ধ্বনি-সামঞ্জস্য
(Sound Correspondence)
ধ্বনি-পরিবর্তন
(Sound Change)
ভাষার পুনর্গঠন
(Language Reconstruction)
তুলনামূলক পদ্ধতি
(Comparative Method)
কৃতঋণ শব্দ
(Loanwords)
ভাষার বিভাজন ও শাখা-প্রশাখা
ভাষার বিবর্তন
ভাষার বিবর্তন
(Language Evolution)
তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের প্রধান পদ্ধতি
- তুলনামূলক পদ্ধতি
(Comparative Method)
একই উৎসজাত ভাষার শব্দ, ধ্বনি ও রূপের তুলনা করে তাদের পূর্বসূরি ভাষার রূপ নির্ধারণ করা।
-
অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন
(Internal Reconstruction)
একটি ভাষার অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার প্রাচীন রূপ অনুমান করা।
-
ধ্বনি-সামঞ্জস্য বিশ্লেষণ
(Sound Correspondence)
ভাষাগুলোর নিয়মিত ধ্বনি-পরিবর্তনের ধারা নির্ণয় করা।
তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের গুরুত্ব
- ভাষার বংশগত সম্পর্ক নির্ণয় করে।
- ভাষাপরিবার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
- আদিভাষার পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে।
- শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয়ে সহায়ক।
- ভাষার ইতিহাস ও বিবর্তন ব্যাখ্যা করে।
- ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের অন্যতম গবেষণাপদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তথ্যসূত্র :
- Comparative Method in Historical Linguistics — Robert J. Jeffers & Ilse Lehiste, MIT Press, 1979
- Historical Linguistics: An Introduction — Terry Crowley & Claire Bowern, Oxford University Press, 2010
- Historical Linguistics — Lyle Campbell, Edinburgh University Press, 2013
- The Origin and Development of the Bengali Language — Suniti Kumar Chatterji,
University of Calcutta, 1926
বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত — মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৮৫ (পুনর্মুদ্রিত সংস্করণ)।
ভাষা ও সাহিত্য — সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স, বিভিন্ন সংস্করণ।
ভাষাতত্ত্ব — রফিকুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ১৯৯২।