শব্দতত্ত্ব
Lexicology
ভাষাতত্ত্বের
একটি মৌলিক শাখা। এতে কোনো ভাষার শব্দ, শব্দভাণ্ডার, শব্দের গঠন, উৎপত্তি, অর্থ, ব্যবহার এবং পারস্পরিক সম্পর্ক বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। শব্দতত্ত্ব ভাষার শব্দসমষ্টিকে একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে এবং শব্দের রূপ, অর্থ, উৎপত্তি, ব্যবহার ও পরিবর্তনের নিয়ম ব্যাখ্যা করে। রূপতত্ত্ব যেখানে শব্দের গঠন নিয়ে আলোচনা করে এবং অর্থতত্ত্ব যেখানে অর্থ নিয়ে আলোচনা করে, শব্দতত্ত্ব সেখানে শব্দকে একটি পূর্ণাঙ্গ ভাষিক একক হিসেবে বিশ্লেষণ করে।
ব্যুৎপত্তি: শব্দতত্ত্ব শব্দের ব্যুৎপত্তিগত রূপ হলো- শব্দতত্ত্ব= শব্দ+ তত্ত্ব
- শব্দ=অর্থবহ ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি, যা কোনো বস্তু, গুণ, ক্রিয়া বা ভাব প্রকাশ করে।
- তত্ত্ব = মূলনীতি, বিজ্ঞান বা বিশ্লেষণ।
ইংরেজি
Lexicology
শব্দটি গ্রিক
lexis (শব্দ) এবং
logos ('শাস্ত্র' বা 'জ্ঞান') থেকে উদ্ভূত।
সংজ্ঞা: যে শাস্ত্রে কোনো ভাষার শব্দ, শব্দভাণ্ডার, শব্দের উৎপত্তি, গঠন, অর্থ, ব্যবহার এবং পারস্পরিক সম্পর্ক বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তাকে শব্দতত্ত্ব বলে।।
শব্দতত্ত্বের উদ্দেশ্য:
শব্দৱতত্ত্বের প্রধান উদ্দেশ্য হলো—
- ভাষার শব্দভাণ্ডার বিশ্লেষণ করা।
- শব্দের উৎপত্তি ও বিকাশ নির্ণয় করা।
- শব্দের অর্থ ও অর্থপরিবর্তন ব্যাখ্যা করা।
- শব্দের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ করা।
নতুন শব্দ গঠনের প্রবণতা বিশ্লেষণ করা।
- অভিধান প্রণয়নের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করা।
শব্দতত্ত্বের ইতিহাস: শব্দতত্ত্বের ইতিহাস
শব্দতত্ত্বের ইতিহাস ব্যাকরণ, অভিধান এবং ভাষার ইতিহাসচর্চার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। প্রাচীনকাল থেকেই ভাষার শব্দ সংগ্রহ, ব্যাখ্যা ও শ্রেণিবিন্যাসের প্রচলন ছিল।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর ভিতরে শব্দতত্ত্বের বিকাশ ঘটেছে।
কিন্তু বিষয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য ভাষায় শব্দতত্ত্ব শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
এই বিচারে শব্দতত্ত্বকে ঐতিহাসিকভাবে প্রাচীন
সভ্যতা অনুসারের বিচার করা হয়। যেমন প্রাচীন ভারত, গ্রিস, আরব, ইত্যাদি
সভ্যতার বিচারে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে শব্দতত্ত্বের বিকাশকে উল্লেখ করা হয়।
- প্রাচীন ভারতে শব্দতত্ত্বের বিকাশ: প্রাচীন ভারত
বৈদিক যুগে শব্দের অর্থ ও উৎপত্তি নিয়ে গবেষণার সূচনা হয়। যাস্ক-এর নিরুক্ত গ্রন্থকে শব্দার্থ ও শব্দব্যুৎপত্তি বিষয়ক বিশ্বের প্রাচীনতম গ্রন্থগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হয়। পরে পাণিনি তাঁর অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থে শব্দগঠন, ধাতু, প্রত্যয় ও শব্দরূপ সম্পর্কে সুসংগঠিত আলোচনা করেন।
- প্রাচীন গ্রিক ও রোমান শব্দতত্ত্বের বিকাশ:
গ্রিক ও রোমান পণ্ডিতেরা শব্দের অর্থ, ব্যাকরণ ও শ্রেণিবিভাগ নিয়ে আলোচনা করেন। পরবর্তীকালে অভিধান প্রণয়নের ধারার বিকাশ ঘটে।
মধ্যযুগ আরব বিশ্ব: মধ্যযুগে আরবি ভাষাবিদের হাতে আরবি
ভাষার রূপতত্ত্ব গড়ে উঠছিল।
আধুনিক যুগ: ঊনবিংশ শতাব্দীতে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের বিকাশের সঙ্গে শব্দের ইতিহাস ও ব্যুৎপত্তি নিয়ে গবেষণা প্রসার লাভ করে। বিংশ শতাব্দীতে কাঠামোবাদী ভাষাতত্ত্ব শব্দভাণ্ডারকে একটি ভাষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করে। বর্তমানে শব্দতত্ত্ব করপাস ভাষাতত্ত্ব, কম্পিউটারভিত্তিক অভিধান, যন্ত্র-অনুবাদ এবং প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণে (NLP) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
শব্দতত্ত্বের প্রধান শাখা
১. ব্যুৎপত্তিতত্ত্ব
((Etymology)
শব্দের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিকাশ নিয়ে আলোচনা করে।
২.শব্দার্থতত্ত্ব
(Lexical Semantics)
শব্দের অর্থ, অর্থের পরিবর্তন এবং শব্দের অর্থগত সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে।
৩.
অভিধানতত্ত্ব
(Lexicography):
অভিধান প্রণয়নের নীতি, পদ্ধতি ও ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে।
৪. পরিভাষাতত্ত্ব
(Derivational Morphology):
বিভিন্ন বিদ্যা ও পেশাক্ষেত্রের বিশেষায়িত শব্দভাণ্ডার নিয়ে আলোচনা করে।
শব্দতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়
- শব্দ
- শব্দভাণ্ডার
- ব্যুৎপত্তি
- শব্দার্থ
- সমার্থক শব্দ
- বিপরীতার্থক শব্দ
- শব্দ-ঊর্ধ্বক্রমোবাচকতা
- সমোচ্চারিত শব্দ
- সমরূপ শব্দ
- বহুঅর্থক শব্দ
- কৃতঋণশব্দ
- দেশজ শব্দ
- তৎসম
- তদ্ভব
- ৱবিদেশি শব্দ
- নতুন শব্দ
- শব্দপরিবার
শব্দতত্ত্বের প্রধান তত্ত্বসমূহ
- শব্দক্ষেত্র তত্ত্ব
- অর্থক্ষেত্র তত্ত্ব
- ব্যুৎপত্তিগত তত্ত্ব
- প্রোটোটাইপ তত্ত্ব
- ভাষাংশ শব্দতত্ত্ব
শব্দতত্ত্বের গুরুত্ব
- ভাষার শব্দভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে।
- অভিধান প্রণয়নের ভিত্তি প্রদান করে।
- শব্দের ইতিহাস ও অর্থ ব্যাখ্যা করে।
- ভাষা-শিক্ষায় সহায়তা করে।
- অনুবাদবিদ্যা ও পরিভাষা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ (NLP), তথ্য অনুসন্ধান ও যন্ত্র-অনুবাদে ব্যবহৃত হয়।
তথ্যসূত্র
- Introducing Morphology — Rochelle Lieber, Cambridge University Press, 2010
-
২। English Lexicology — Leonhard Lipka, Gunter Narr Verlag, 2002
- The Origin and Development of the Bengali Language — Suniti Kumar Chatterji, University of Calcutta, 1926
- বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত — মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (UPL), ১৯৮৫ (পুনর্মুদ্রিত সংস্করণ; মূল রচনা পূর্ববর্তী)
- ভাষাতত্ত্ব — রফিকুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি,
১৯৯২
-
বাংলা ব্যাকরণ প্রসঙ্গ — পবিত্র সরকার, দে'জ পাবলিশিং, ১৯৮৭)।