আবদুল খালেক দেওয়ান
পূর্ণ নাম আব্দুল খালেক দেওয়ান
(১৯০৯-২০০৩ খ্রিষ্টাব্দ)

বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত সাধক, কবি, গীতিকার এবং শিল্পী। তিনি লোকসঙ্গীত, বাউল সঙ্গীত এবং অাধ্যাত্মিক গানের জগতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। দেওয়ান পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি তার পিতা আলেপ চান্দ শাহ্ ওরফে আলফু দেওয়ান এবং ভাই মালেক দেওয়ানের সঙ্গে মিলে বাংলা লোকসংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন।

১৩১৬ বঙ্গাব্দের ১২ ফাল্গুন  (১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ) ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ থানার শাক্তা ইউনিয়নের বামনসুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলেপ চাঁদ শাহ (আলফু দেওয়ান) ছিলেন একজন সাধক এবং অাধ্যাত্মিক গানের রচয়িতা ছিলেন। মায়ের বিবরন নেসা। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার তৃতীয় সন্তান। তাঁর বড় ভাই  মালেক দেওয়ান (জন্ম ১৩০৮) একজন বিখ্যাত গীতিকার ছিলেন। বড় বোন ফাতিমা বেগম (জন্ম ১৩০৯), স্থানীয় রওশন আলীর সাথে বিবাহের পর গৃহবধূ হিসেবেই জীবন অতিবাহিত করেন ।  

তিনি স্থানীয় নয়াবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এর পাশাপাশি গ্রামের মাদ্রাসায় তিনি আরবি ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। এই সময় তিনি সুরেলা কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করে সবাইকে মুগ্ধ করতেন।  

প্রাথমিক বিদ্যালাভ শেষ করে তিনি কালিন্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু অভিনয় ও সঙ্গীতে আকৃষ্ট হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়েন। এই সময় এলাকার তরুণদের সঙ্গে একটি শৌখিন যাত্রাদল গঠিত হয়। তিনি সেই দলে অভিনয় এবং গানের অংশ নেন। এই সময় তিনি হারমোনিয়াম বাজানো শিখেন এবং কিছু কিছু গানে তিনি  নিজেই সুরারোপ করা শুরু করেন।  

এই সময় তাঁর বড় ভাই মালেক দেওয়ান তাঁদের গ্রামে চার-পাঁচ মাইল পূর্বে 'বাঘৈর' গ্রামের একটি আসরের জন্য অগ্রিম বায়নার টাকা গ্রহণ করেছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে মালেক দেওয়ান জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। যথাসময়ে বাঘৈর থেকে লোক এসে এই অবস্থা দেখে, তাঁরা তাঁর পিতা আলফু দেওয়ান-কে আসরে যেতে বললে, তিনি আসরে নামা ত্যাগ করেছেন বলে- যেতে অস্বীকার করেন। ফলে অগত্যা খালেক দেওয়ানকে তাঁরা নিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত তিনি বাঘৈর গ্রামে আয়োজিত আসরে নামেন। প্রতিপক্ষ গায়ক একটি গান গেয়ে খালেককে কিছু প্রশ্ন করলে, তিনি মন্দিরা বাজিয়ে  গানের মাধ্যমে উত্তর দেন। সারা রাত ধরে তিনি গানে গানে প্রশ্নোত্তরে আসর মাতিয়ে রেখেছিলেন। কোনো প্রতিপক্ষের সাথে এটাই ছিল তাঁর প্রথম গানের প্রতিযোগিতা।

১৩৩২ বঙ্গাব্দের শেষের দিকে (১৯২৫-১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর পিতা আসামের চাউলখোয়ায় তাঁর ভক্ত নবাবজানের কাছে পাঠান। কিছুদিন নবাবজানের বাসায় থাকার পর, তিনি খালেকের ব্যবসার জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেন। এই সময় তিনি সপ্তাহের ছুটির দিনে বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী চা বাগানে ফিরি করে বেচা শুরু করেন।

চা বাগানের একজন বাঙালী ডাক্তারের দুই মেয়েকে ডিব্রুগড়ের একজন ওস্তাদ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এসে গান শেখাতেন। দূর থেকে খালেক দেওয়ান ওস্তাদজীর গানের তালিম শুনতেন। বিষয়টি ওস্তাদজী লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি একদিন খালেক দেওয়ানকে ডেকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে, খালেক বলেন- তিনি গান শিখতে চান। উত্তরে ওস্তাদ বলেন যে, গান শিখতে গেলে একটি হারমোনিয়াম কিনতে হবে। এর কিছুদিন পরে, তিনি লক্ষ্য করলেন তাঁর দোকানের সামনে বসা খেদমত আলী দোকানী বসে বসে ঝিমুতে থাকেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি জানতে পারলেন যে, খেদমত আলী'র শালা  সারারাত ধরে বাঁশী বাজায়, তাই রাতে তিনি ঘুমাতে পারেন না। উল্লেখ্য, ওই অঞ্চলে হারমোনিয়ামকে বলা হতো বাঁশী। খালেক এই হারমোনিয়ামটা খেদমত আলী বিক্রয় করবেন কিনা, তা জানতে চাইলে, খেদমত আলী সাগ্রহে রাজী হন। এরপর তিনি খুব অল্প দামে সিঙ্গেল রিডের এই হারমোনিয়ামটি কিনে ফেলেন। এরপর লুকিয়ে শোনা ওস্তাদজীর শিক্ষণ অনুসারে, অনুশীলনের মাধ্যমে হারমোনিয়াম বাদন এবং এর সাথে গান গাওয়ার অভ্যাস করতে থাকেন।  এর প্রায় মাসখানেক পরে ওস্তাজীর সাথে তাঁর দোকানের সামনে খালেকের দেখা হয়। তিনি ওস্তাজীকে ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে হারমোনিয়ামটি দেখান এবং হারমোনিয়াম বাজিয়ে 'তুমি যে গিয়াছ বকুল বিছানো পথে' গানটি শোনান। ওস্তাদ এই গায়ন-বাদন শুনে সন্দেহ করেন যে, খালেক আগে থেকেই গান জানেন।  তিনি যে ওস্তাজীর সরগম অনুসরণে হারমোনিয়াম বাজনা রপ্ত করেছেন, সেটা বিশ্বাস করলেন না। শেষ পর্যন্ত ওস্তাদজী খালেককে 'ঢাকাইয়া বাটপার' বলে সেখান থেকে বিদায় নেন।

১৩৩৭ বঙ্গাব্দের (১৯৩০-খ্রিষ্টাব্দ) শুরু দিকে  তাঁর পিতা আলফু দেওয়ান অসুস্থাবস্থায় খালেককে দেখতে আসেন। নবাবজানের কাছে খালেকের সঙ্গীতচর্চার কথা শুনে, খালেককে সাথে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। আলফু দেওয়ান খালেকের আসামে যাওয়ার আগের বাড়ি ত্যাগ করে বামনসুরের অন্যত্র একটি নতুন বাড়ি তৈরি করেছিলেন। এই বাড়িটিই বর্তমানে দেওয়ান বাড়ি নামে পরিচিত। আসাম থেকে ফিরে এসে এঁরা এই বাড়িতে উঠেছিলেন। এই বাড়িতে আলফু দেওয়ান দেওয়ানের তত্ত্বাবধানে আসাম থেকে আনা হারমোনিয়ামের সাথে বেহালার সুর মেলানো এবং গানের অনষঙ্গী যন্ত্র হিসেবে তা ব্যবহারের চেষ্টা করেন। তিনি তাঁর দুই পুত্রকে নিয়ে তাঁদের গানের সাথে বেহালা ও হারমোনিয়াম একই সাথে বাদন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর কিছুদিন পর তাঁর গানের সাথে বাঁশীর ব্যবহার শুরু হয়েছিল।

প্রথম দিকে তিনি বড় ভাই মালেক দেওয়ানের গানের সাথে দোহার হিসেবে কণ্ঠ মেলাতেন। এরপর পিতা এবং বড় ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে তিনি দোহারী থেকে মূল গায়ক হিসেবে আসরে নামা শুরু করেন। সঙ্গীতের ত্রুটি বিচ্যুতি শুধরে দিতেন  তাঁর বড় ভাই। তাই খালেক দেওয়ান বড়ভাই মালেক দেওয়ানকে 'বড়কর্তা' হিসেবে সম্মান করেছেন সারাজীবন। এই সময় তিনি আসরে তাঁর ভাইয়ের সাথে দোহারী কখনো একক গান পরিবেশন করতেন।

১৩৩৯ বঙ্গাব্দের (১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ) একটি ঘটনায় তাঁর একক শিল্পী হয়ে ওঠার ক্ষেত্র তৈরী হয়েছিল।  ১৩৩৯ বঙ্গাব্দের ২৬ চৈত্রে লক্ষ্যা নদীর পারে সিদ্ধিরগঞ্জে, কুমিল্লার দাউদকান্দির আক্কাস আলীর বায়াতীর সাথে মালেক দেওয়ানের পালা গান গাওয়ার বায়না ছিল। সে সময়ে মালেক দেওয়ান বিক্রমপুরে ছিলেন। কথা ছিল, খালেক দেওয়ান বেহালা, হারমোনিয়াম এবং ঢুলী মনা ভাইকে সাথে নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ যাবেন। আর নির্দিষ্ট দিনে বিক্রমপুর থেকে মালেক দেওয়ান সিদ্ধিরগঞ্জের আসরে যোগদান করবেন। খালেক দেওয়ান যথা সময়ে সিদ্ধিরগঞ্জ উপস্থিত হলেও মালেক দেওয়ান আসতে পারেলেন না। ফলে আসরে খালেক দেওয়ানই আক্কাস আলীর বায়তীর সাথে পাল্লা গানে অংশ নেন।

এই আসরে, খালেক দেওয়ান সার্থকভাবে আক্কাস আলীর সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেকে বাউল গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেছিলেন। এই আসরে আক্কাস আলী দোতরা ব্যবহার করেছিলেন। এই সূত্রে খালেক দেওয়ান তাঁর গানে দোতারা ব্যবহার শুরু করেছিলেন। এরপর থেকে একক ভাবে নিজের দলের অধিকারী হয়ে আসরে নামা শুরু করেন। এরপর বহু আসরে তিনি মালেক দেওয়ানের প্রতিপক্ষ হয়ে আসরে নেমেছেন। এই সূত্রে নতুন গান রচনা করে নিজের সুরে আসরে পরিবেশন করা শুরু করেন।  এছাড়া তিনি অন্যান্য যাঁদের সাথে প্রতিপক্ষ হিসেবে আসরে নামতেন- এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন- ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের (১৯৩৬) শেষের দিকে তিনি বিক্রমপুরে গায়ের বায়না নিয়ে বিক্রমপুরে যান। সেখানে তিনি প্রায় পনের দিন জুলমত সাধুর ছেলে রসিক সাধুর বাড়িতে ছিলেন। এই সময় আলফু দেওয়ান লোক পাঠিয়ে তাঁকে বাড়িতে আসার কথা জানান। খালেক গ্রামে ফিরে এসে জানতে পারেন যে, তাঁর পিতা তাঁর বিবাহের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। পিতার আদেশে তিনি একই গ্রামের মোঃ উকিল উদ্দিন মিয়ার একমাত্র কন্যা হাসমতিয়া খানম ওরফে বকুল বেগমকে বিয়ে করেন। কথিত আছে এই বিয়েতে সাত দিন ধরে একটি সানাই বাদক দল, সানাই বাজিয়েছিল।

এই সময় মালেক দেওয়ান দেওয়ান পরিবারের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে খালেক দেওয়ান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গায়ের বায়না নিয়ে যেতেন। এই সূত্রে তিনি প্রচুর গান রচনা করেছিলেন। এরই মধ্যে ১৩৪৬ বঙ্গাব্দে (১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর প্রথম পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু জন্মের একদিন পরেই এই সন্তান মারা যায়।  ১৩৪৯ বঙ্গাব্দে (১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর দ্বিতীয় সন্তান খায়রুল বাসার বাদলের জন্ম হয়।  ১৩৫২ বঙ্গাব্দে (১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর তৃতীয় সন্তান খায়রুল জাহান মাখনের জন্ম হয়। 
 
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সরকার, ভারতে বেতার সম্প্রচার উন্নয়নের জন্য ৪০ লাখ রুপি বরাদ্দ করে। এরই সূত্র ধরে ঢাকায় একটি বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র স্থাপিত হয়। এই কেন্দ্রটর উদ্বোধন হয় ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর। এই কেন্দ্রের নাম রাখা হয়েছিল- 'ঢাকা ধ্বনি-বিস্তার কেন্দ্র' [দ্রষ্টব্য: বাংলাদেশ বেতার ]

পূর্ববঙ্গের সঙ্গীতশিল্পীদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিয়েছেলন তাৎকালীন বেতারের সঙ্গীত ও নাট্যকলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ। এঁদের প্রচেষ্টায়- খালেক দেওয়ানকে বাউল সঙ্গীত বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বেতারে তাঁর গাওয়া প্রথম গান ছিল- 'আমার দেহতরী ভাসাইলাম দয়াল তোমারই নামে'।

১৩৫৩ বঙ্গাব্দে (১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি ভারতের বিহার রাজ্যের জমশেদপুরে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ পান। তিনি তবলাবাদক মনা ভাইকে সাথে জমশেদ নগরে পৌঁছান। সে সময়ে কলকাতায় হিন্দু মুসলমানদের দাঙ্গার কারণে সেখানে ১৪৪ ধারা জারি হয়। ফলে এই অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় একমাস পরে স্থানীয় শ্রমিকদের প্রচেষ্টায়, স্থানীয় একটি স্কুলের মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন। এরপর মৌভাণ্ডার তামা-পিতল কারখানার শ্রমিকরা ঘাটশিলায় তাঁদের কারখানার ভিতরে গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এরপর তিনি টাটানগরের অনেক শ্রমিকের বড়িতে ঘরোয়া অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এক রাত্রে স্বপ্নে পিতাকে অসুস্থ দেখতে পান। তাই তিনি টাটানগর থেকে ঢাকার পথে রওনা দেন। কলাকাতায় দাঙ্গার কারণে তিনি আসানসোল বর্ধমান হয়ে গোয়ালন্দে আসেন। পরে সেখান থেকে ঢাকা আসেন। তাঁর ফিরে আসার পর ১৩৫৩ বঙ্গাব্দের ৩রা ভাদ্র  (১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দ ১৮ আগষ্ট) আলফু দেওয়ান মৃত্যুবরণ করেন।

এর কিছুদিন পর, তিনি ময়মনসিংহ যান। সেখানে তাঁর পিতা ভক্ত আবদুল আলী মোড়ল তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন। আবদুল আলী  তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন এবং স্থানীয় শিল্পীদের সাথে পালা গানের ব্যবস্থা করেন। খালেক দেওয়ান প্রতিট আসরে স্থানীয় শিল্পীদের পরাস্ত করেন। পরে তাঁর প্রতিপক্ষ হিসেবে তাঁরই ভাই মালেক দেওয়ানকে আনা হয়। এই সূত্রে এক রাত্রে দুই ভাইয়ের ভিতরে প্রতিযোগিতামূলক পালাগান অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রতিযোগিতায় দুই ভাই-ই অপরাজিত থাকেন।

১৩৫৬ বঙ্গাব্দে (১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) খালেক দেওয়ানের শ্যালক তোফায়েল দেওয়ান ওস্তাদ লতাফত হোসেনন খানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর এই ওস্তাদের কাছে তিনি কিছুদিন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাঠ নেওয়া শুরু করেন। ১৩৫৭ বঙ্গাব্দে (১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) ওস্তাদ লতাফত হোসেনন খানে ঢাকা ত্যাগ করে তাঁর জন্মস্থান মুম্বাইয়ে চলে যান। এরপর থেকে খালেক দেওয়ান লোকজ সুরের সাথে রাগের মিশ্রণ ঘটিয়ে তাঁর গানে সুরারোপ করতে থাকেন।

১৩৫৯ বঙ্গাব্দে (১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ) মালেক দেওয়ান ও খালেক দেওয়ানের পরিবারের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া, এঁদের মা দুই পরিবারকে পৃথক করে দেন।

১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের সংবিধান স্থগিত করে সামরিক আইন জারি করেন। এই সময় বাউল গান ও পালা গান বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অন্যান্য শিল্পীদের মতই খালেক দেওয়ানের পরিবার আর্থিক কষ্টে পড়ে যায়। ইতিমধ্যে তাঁর পরিবারের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই সময় তাঁর সন্তানাদি ছিল ৭জন (বাদল, মাখন, রতন, রেহানা, কমল শ্যামল এবং মোহন) এঁদের মধ্যে বাদল, মাখন, রতন স্কুলে লেখা পড়া করতো। এই সময় এক ঔষধ বিক্রেতা ভক্ত ফজলুর রহমান তাঁর 'মায়ের রূপ' জারি গান ছাপিয়ে  বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এই সূত্রে তিনি তাঁর কিছু উপার্জনও হয়েছিল। পরে তিনি গ্রন্থাকারে ছাপানোর উপযোগী একটি পাণ্ডুলিপি রচনা করেছিলেন। সে সময়ের  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রের সহায়তায়- তৎকালীন বাংলা একাডেমীর মহা-পরিচালক ডঃ এনামুল হকের কাছে এই পাণ্ডুলিপি জমা দেন। এনামুল হক তাঁকে জানান যে- বাংলা একাডেমী প্রচলিত কিস্‌সা সংগ্রহ করে থাকে। কোনো বিশেষ ব্যক্তির রচিত কিস্‌সা গ্রহণ করে না। তাই খালেক দেওয়ানের এই পাণ্ডুলিপি ছাপাতে এনামুল হক অস্বীকার করেন। এরপর খালেক দেওয়ান নিজের গল্প ছন্দাকারে লিখে ঢাকার  কিস্‌সা নামে জমা দেন। বাংলা একাডেমী 'ঢাকার লোক কাহিনী' নামে প্রকাশ করেছিল। পরে তিনি কিস্‌সার পাণ্ডুলিপি 'দেওয়ান গীতিকা' প্রথম খণ্ডে নিজের নামেই অন্তর্ভুক্ত করে প্রকাশ করেছিলেন।

১৩৭২ বঙ্গাব্দে (১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) খালেক দেওয়ান তাঁর মেয়ে রেহানা বেগমকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবীরের সাথে বিবাহ দেন।
১৩৭৮ বঙ্গাব্দ (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কেরানীগঞ্জ ত্যাগ করে গাজীপুরে চলে যান। তাঁর বড় ছেলে খায়রুল বাশার এবং জামাতা হুমায়ূন কবীর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। উল্লেখ্য খায়রুল বাশার ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রাডার ইঞ্জিনয়ার। তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

১৩৮৭ বঙ্গাব্দ (১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দ) খালেক দেওয়ান তাঁর মেজো ছেলে খায়রুল জাহান মাখনকে তাঁর গান গাওয়ার অনুমতি দিয়ে তিনি পেশাগত গান গাওয়া থেকে অবসর নেন।
১৩৯৬ বঙ্গাব্দের ৩রা ফাল্গুন, (১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ মার্চ) তিনি ঢাকায় মৃত্যবরণ করেন।

১৩৮৯ বঙ্গাব্দের ১লা ফাল্গুন (১৫ জানুয়ার ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর মেয়ে রেহান বেগমের স্বামী হুমায়ুন কবীরের মৃত্য হয়।
১৩৯৫ বঙ্গাব্দের ২রা বৈশাখ (১৫ এপ্রিল ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর বড় ভাই মালেক দেওয়ানের মৃত্য হয়।
১৩৯৭ বঙ্গাব্দের ২৯শে ফাল্গুন (১৪ মার্চ ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর বড় ছেলে  খায়রুল বাসারের মৃত্য হয়।
১৪০২ বঙ্গাব্দে (১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর স্ত্রী বকুল বেগম পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। ১৪০৪ বঙ্গাব্দের ১৫ই ফাল্গুন (২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮) বকুল বেগমের মৃত্যু হয়।

১৪১০ বঙ্গাব্দের ১৫ চৈত্র (২৯ মার্চ ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দ) ঢাকায় মৃত্যবরণ করেন।

খালেক দেওয়ানের গান
সামগ্রিক ভাবে খালেক দেওয়ান ছিলেন সুফিবাদী বাউল এবং সঙ্গীত সাধক। তাঁর সুফিবাদী ও বাউল দর্শন রচিত সহস্রাধিক গানগুলোর বিষয়ভিত্তিক বিচারে- তাঁর গানগুলোর উপবিভাগ হলো- বন্দন, সৃষ্টিতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব,  দেহতত্ত্ব, সাধারণ তত্ত্ব,  বিচার গান, ভক্তিমূলক, নবীতত্ত্ব, ইসলামী গান, আউলিয়াদের স্মরণে রচিত। এর বাইরে তিনি রচনা করেছিলেন দেশাত্মবোধক গান। সুরাঙ্গের বিচারে তাঁর গানে রয়েছে- ভাটিয়ালি, বাউল এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের পল্লীভিত্তিক সুর।
তথ্য সূত্র: