অতীন্দ্রমোহন রায়
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সক্রিয় কর্মী। অতীন রায় নামে সর্বাধিক পরিচিত।

১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার ভোলাচঙ্গ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আনন্দমোহন রায়।

কুমিল্লা ইউসুফ স্কুলের ছাত্র অবস্থায় তিনি অতীন রায় বিপ্লবী গঠনে আগ্রহী হয়ে উঠেন। এই সময় সন্দেহজনক কার্যকলাপের পুলিশ গ্রফতার করে এবং পরে তাঁর জেল হয়। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি সক্রিয় বিপ্লবী হয়ে ওঠেন। বিদ্রোহী কবি কাজী  নজরুল ইসলাম কুমিল্লায় এলে আসলে অতীন্দ্র রায়ের সাথে সখ্য হয়েছিল। বিপ্লবীদের মুখপত্র ধূমকেতু প্রকাশের পর তিনি কবিকে অভিনন্দন জানান। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে জড়িয়ে পড়েন।

তিনি ব্রিটিশ ভারতের অনুশীলন সমিতি-র সদস্য ছিলেন। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে কুমিল্লার তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে হত্যা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অতীন রায়ের উপর। ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্স স্থানীয় ফয়জুন্নেছা স্কুলে সাঁতারে প্রতিযোগিতায় মেয়েদের বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিলেন। এ বিষয়টি কাজে লাগিয়ে অতীন রায় স্টিভেন্স হত্যার পরিকল্পনা করেন। তিনি এই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী-কে বিপ্লবী কর্মী হিসাবে তৈরি করেন। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে ১৪ই ডিসেম্বর স্টিভেন্সকে হত্যার জন্য এই দুই বালিকাকে এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পোশাকে রিভলবারসহ পাঠানো হয়। এঁরা স্টিভেন্সের বাংলোতে সাঁতারের অনুমতি নেওয়ার জন্য যান। এঁরা স্টিভেন্সের উপর গুলি বর্ষণ করেন এবং স্টেভেন্স ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর এঁরা প্রহরীর হাতে ধরা পড়েন। এই সময় প্রহরীরা এঁদের মারধর শুরু করলে, স্টিভেন্সের স্ত্রী এঁদেরকে প্রহরীদের কাছ থেকে রক্ষা করেন এবং পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। কুমিল্লা জজকোর্টে স্টিভেন্স হত্যা মামলা শুরু হলে, ব্রিটিশ সরকার আসামিদের নিজ শহরে মামলাটির বিচারকার্য পরিচালনা করা নিরাপদ না মনে করে, শান্তি ও সুনীতিকে ভারতের আলীপুর জেলে স্থানান্তর করে। এরপর আলীপুর জেল জজ আদালতের বিচারে এই দুই কিশোরীর বয়স বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। শান্তি ও সুনীতির এই কারাদণ্ড কার্যকর করা হয় আন্দামান জেলে।

অতীন রায়ের এই কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর কিছুদিন গা ঢাকা দেন। পরে তিনি আস্তে আস্তে আবার সক্রীয় কার্যক্রম শুরু করেন। দৈহিক গড়নে তিনি কিছুটা খর্বকায় ছিলেন। তিনি সশস্ত্র সংগ্রামে নিজেকে প্রস্তুত করার লক্ষ্যে নিয়মিত শরীর চর্চা করতেন। আগরতলা মহারাজার গোপন অর্থানুকুল্যে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে কুমিল্লায় বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল গঠিত হয়েছিল। এই গোপন বিপ্লবী দল গড়ে উঠার সময় তিনি বিশেষভাবে সাহায্য করেন। এই সময় এই দল সমগ্র ভারতবর্ষে একটি সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি নিয়েছিল। এই সময় ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বাড়িতে ডাকাতি করে প্রাপ্ত সংগ্রহ করা হতো। এই দল জার্মানি থেকে বিপ্লবীদের জন্য কয়েক জাহাজ উন্নত মানের যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ করেছিল। পরে এ তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে, বহু বিপ্লবীদের সাথে তিনিও ধরা পড়েছিলেন। এই তাঁকে ২৪ বছর কারাভোগ করতে হয়।

ভারত বিভাগের পর ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। এই সময় তিনি কুমিল্লা অভয় আশ্রম, বসন্ত স্মৃতি পাঠাগার, অমূল্য স্মৃতি পাঠাগার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী, তাঁর পুত্র কুমিল্লা কলেজের রসায়ন বিভাগের ডেমোনস্ট্রেটর অসীম রায়কে কুমিল্লা সেনানিবাসে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এরপর থেকে অতীন্দ্র রায় বই-পুস্তক পড়ে নিঃসঙ্গ জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কুমিল্লার বাগিচা গাঁয়ে একটি টিনের ঘরে বাস করতেন এবং অত্যন্ত সাদাসিধা জীবন যাপন করতেন। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে কুমিল্লায় মৃত্যুবরণ করেন।


সূত্র :
http://www.banglapedia.org/
বাংলাদেশ প্রতিদিন। শনিবার ২২ মে ২০১০, ০৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৭, ০৭ জমাদিউস সানী ১৪৩১।