হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)
ইসলাম ধর্মের শেষ নবী হজরত মুহম্মদ (সাঃ) -এর তৃতীয় স্ত্রী। মুসলিম উম্মাহর নিকট তিনি 'উম্মুল মুমিনীন' (মুমিনদের জননী) হিসেবে স্বীকৃত।

হযরত আয়েশা (রা.) নবুওয়াতের চতুর্থ বা পঞ্চম বছরে (৬১৩-৬১৪ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ) মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরম বন্ধু ও ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) এবং মাতা ছিলেন উম্মে রুমান (রা.)।

আল্লাহ তাআলার নির্দেশে (স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত ইশারা অনুযায়ী) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। শাওয়াল মাসে তাঁদের বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন শুরু হয়। এই বিবাহের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং আবু বকর (রা.)-এর মধ্যকার ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়।

৬২১ খ্রিষ্টাব্দে, আয়সা (রাঃ) এর সাথে হজরতের সাথে আকদ্-হয়। আর বিবাহ হয় ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে। কথিত আছে তৎকালীনকালীন আরবের প্রধান দুটি সংস্কার ভঙ্গের জন্য হজরত এই বিবাহ করেছিলেন। সংস্কার দুটি ছিল এরূপ -    

১। রীতি ছিল যে , রক্তের সম্পর্ক নেই এমন ভাই সম্বোধনকারী ব্যক্তির কন্যার সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ। উল্লেখ্য, আয়সা (রাঃ)-এর পিতা আবু বক্কর (রাঃ) , হজরতের এরূপ ভাই ছিলেন।
২। প্রাচীন আরবে কোন এক সময় প্লেগ রোগ মহামারী আকার গ্রহণ করেছিল। এই মহামারী সওয়াল মাসে হয়েছিল বলে- এই মাসে কোন বিবাহ হতো না। উল্লেখ্য এই বিবাহ সওয়াল মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ইসলামি আইন ও হাদিস শাস্ত্রে হযরত আয়েশা (রা.)-এর অবদান অতুলনীয়। হাদিস বর্ণনা: তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে ২,২১০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পর বড় বড় সাহাবীগণ জটিল কোনো সমস্যার সমাধানে তাঁর শরণাপন্ন হতেন। তিনি তাঁর সময়কার শ্রেষ্ঠ ফকিহ (আইনবিদ) ও ধর্মতত্ত্ববিদ ছিলেন। তিনি কেবল ধর্মতত্ত্বেই নয়, বরং কবিতা, বংশগতিবিদ্যা এবং চিকিৎসাশাস্ত্রেও গভীর জ্ঞান রাখতেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ভালোবেসে 'হুমায়রা' (লালচে বর্ণের অধিকারী) ডাকতেন। তাঁর অন্যতম উপাধি হলো 'সিদ্দিকা' (সত্যবাদী)। ৫ হিজরিতে মুনাফিকরা তাঁর চরিত্রের ওপর অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করলে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা নূরের মাধ্যমে তাঁর পবিত্রতা ও নির্দোষিতা ঘোষণা করেন। এটি তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্মান।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি আয়েশা (রা.)-এর ঘরেই অবস্থান করেন। ১১ হিজরিতে মহানবী (সা.) যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁর মাথা হযরত আয়েশার বুকের ওপর হেলান দেওয়া ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর কক্ষেই দাফন করা হয়।

হযরত আবু বকর, ওমর ও ওসমান (রা.)-এর খিলাফতকালে তিনি অত্যন্ত সম্মানের সাথে জীবনযাপন করেন। তবে ইসলামের ইতিহাসে একটি সংকটময় সময় ছিল 'জঙ্গে জামাল' বা উটের যুদ্ধ (৩৬ হিজরি / ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দ)। হযরত ওসমান (রা.)-এর হত্যার বিচারের দাবিতে তিনি এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে এসে নিজেকে পুরোপুরি জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত করেন।

হযরত আয়েশা (রা.) ৫৮ হিজরিতে (৬৭৮ খ্রিস্টাব্দ) ১৭ই রমজান মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তাঁকে মদিনার বিখ্যাত জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফন করা হয়।