দেবপাল
পাল বংশের তৃতীয় রাজা। ইনি পাল রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল (৭৭০-৮১০ খ্রিষ্টাব্দ)-এর পুত্র। ৮১০ খ্রিষ্টাব্দে ধর্মপালের মৃত্যুর পর তিনি রাজা হন। এঁর মায়ের নাম রনড়বাদেবী।

ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসনে কিন্তু যুবরাজ ত্রিভুবনপালের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই যুবরাজ ত্রিভুবনপালই দেবপাল নামে রাজা হন, অথবা জ্যেষ্ঠভ্রাতা ত্রিভুবনপালের মৃত্যুতে কনিষ্ঠ দেবপাল পিতার সিংহাসনে আরোহণ করেন এই তাম্রশাসনে তা স্পষ্ট নয়। খালিমপুর তাম্রশাসনে রাজপুত্র দেবটেরও উল্লেখ আছে এবং অসম্ভব নয় যে, এটি দেবপাল নামের অপভ্রংশ। অবশ্য ত্রিভুবনপাল জীবিত থাকলেও কনিষ্ঠ দেবপাল সিংহাসন অধিকার করে থাকতে পারেন। দেবপালের এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবার জন্য মুঙ্গের তাম্রশাসনই একমাত্র ঐতিহাসিক দলিল। দেবপাল শুধু পিতৃসাম্রাজ্য রক্ষাই করেন নি, নতুন রাজ্য জয় করে পাল-সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটিয়েছিলেন। তিনিও পরমেশ্বর পরমভট্টারক ও মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।

৮০০-৮০১ খ্রিষ্টাব্দে প্রতীহাররাজ ৩য় গোবিন্দ কনৌজ দখল করে ৮৩৬ পর্যন্ত তাদের অধিকারে ছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীকালে কনৌজের অধিকার হয়তো পরিবর্তন হয়েছে। সে বিচারে বলা যায় কনৌজ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল দেবপালের রাজ্য বিস্তৃত ছিল। দেবপাল একটি বিশাল সৈন্যবাহিনী তৈরি করেছিল। তাঁর তাম্রশাসনে ব্যক্ত হয়েছে যে, তাঁর বিজয়বাহিনী দক্ষিণে বিন্ধ্যপর্বত ও পশ্চিমে কাম্বোজ দেশ অর্থাৎ কাশ্মীরের সীমান্ত পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল। তাঁর সেনাপতি ও মন্ত্রীগণের বংশধরদের লিপিতে বিজিত রাজ্যের তালিকা পাওয়া যায়। পিতৃব্য বাক্পালের পুত্র জয়পাল তাঁর সেনাপতি ছিলেন। জয়পালের বংশধর নারায়ণপালের তাম্রশাসনে ব্যক্ত হয়েছে যে, জয়পাল দিগ্বিজয়ে অগ্রসর হলে উৎকলের রাজা দূর হতে তাঁর নাম শ্রবণ করেই অসহায়ভাবে নিজের রাজধানী পরিত্যাগ করেছিলেন। প্রাগজ্যোতিষের (আসাম) রাজা জয়পালের নির্দেশ মেনে যুদ্ধ না করে পালরাজের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন। ধর্মপালের মন্ত্রী গর্গের পুত্র দর্ভপাণি এবং প্রপৌত্র কেদারমিশ্র উভয়েই দেবপালের রাজত্বকালে প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। কেদারমিশ্রের পুত্র গুরবমিশ্রের লিপিতে ব্যক্ত হয়েছে যে, দর্ভপাণির নীতিকৌশলে দেবপাল হিমালয় হতে বিন্ধ্যপর্বত এবং পূর্ব ও পশ্চিম সমুদ্রের মধ্যবর্তী সমগ্র ভূভাগ পদানত করে করদ রাজ্য পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই লিপিতে আরও পাওয়া যায়, মন্ত্রী কেদারমিশ্রের বুদ্ধিবলের উপাসনা করে গৌড়েশ্বর দেবপালদেব উৎকলকুল ধ্বংস, হুনগর্ব খর্ব এবং দ্রবিড় ও গুর্জরনাথের দর্পচূর্ণ করে দীর্ঘকাল পর্যন্ত আসমুদ্র পৃথিবী উপভোগ করেছিলেন। বর্ণনা অতিরঞ্জিত হলেও অনেক সত্যতা ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায়।

উল্লিখিত লিপি দু’টি মতে, দেবপালের রাজত্বের যত কিছু গৌরব ও কৃতিত্ব, তা কেবল মন্ত্রীদ্বয় ও সেনাপতিরই প্রাপ্য। গুরবমিশ্রের লিপিতে এটিও বলা হয়েছে যে, অগণিত রাজন্যবর্গের প্রভু সম্রাট দেবপাল (উপদেশ গ্রহণের জন্য স্বয়ং) দর্ভপাণির অবসরের অপেক্ষায় তাঁর দ্বারদেশে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং রাজসভায় আগে মন্ত্রীবরকে মূল্যবান আসন দিয়ে নিজে ভয়ে ভয়ে সিংহাসনে বসতেন। তখনকার হতমান দুর্বলচিত্ত পালারাজের পক্ষে এই প্রকার আচরণ সম্ভবপর হলেও ধর্মপালের পুত্র আর্যাবর্তের অধীশ্বর দেবপালদেবের সম্বন্ধে এটি বিশ্বাস করা কঠিন। এই সমুদয় অত্যুক্তির মধ্যে কি পরিমাণ সত্য নিহিত আছে, তার অনুসন্ধান নিস্প্রয়োজন। ভাগলপুর লিপির ভিত্তিতে রমেশচন্দ্র মজুমদার মনে করেন যে, দেবপাল উড়িষ্যা ও আসাম-বাংলার এই দুই সীমান্ত প্রদেশ জয় করেন। আসামের রাজা বিনাযুদ্ধে বশ্যতা স্বীকার করে সামন্ত রাজার ন্যায় রাজত্ব করতেন। কিন্তু উড়িষ্যার রাজাকে পরাজিত করে উড়িষ্যাকে সম্ভবত পালরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।  উড়িষ্যার ভঞ্জ রাজবংশের লিপি হতে জানা যায় যে, রণভঞ্জের পর এই রাজগণ প্রাচীন খিঞ্জলী রাজ্য ও রাজধানী ত্যাগ করে উড়িষ্যার দক্ষিণ সীমান্তে গঞ্জাম জেলায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। রণভঞ্জ সম্ভবত নবম শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। সুতরাং খুব সম্ভব এই বংশীয় রাজাকে বিতাড়িত করেই দেবপাল উড়িষ্যা, অন্তত তার অধিকাংশ ভাগ, অধিকার করেন।

এরপর দেবপাল তার সঙ্গে সন্ধি করে শান্তি স্থাপন করেন অথবা আসামের সৈন্যবাহিনীকে বিতাড়িত করতে সমর্থ হন। এরপর দেবপাল হিমালয় সংলগ্ন হুনদের একটি দুর্বল রাজ্য দখল করেন। তবে রাজ্য ঠিক কোথায় ছিল তা নিশ্চিত বলা যায় না। হর্ষচরিত পাঠে জানা যায় যে, উত্তরাপথে হিমালয়ের নিকটে হুণদের একটি রাজ্য ছিল। সম্ভবত দেবপাল এই রাজ্য জয় করে কম্বোজ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন। কম্বোজ পঞ্চনদের উত্তর-পশ্চিম ও গান্ধারের ঠিক উত্তরে এবং হুণরাজ্যের ন্যায় পালসাম্রাজ্যের সীমান্তে অবস্থিত ছিল।

রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন যে, দেবপাল কম্পোজ সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। কিন্তু কম্বোজের অবস্থান সম্পর্কে তাঁর ধারণা অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ গ্রহণ করেন নি। কারণ, কম্বোজ গান্ধারের উত্তর দিকে হলে বলতে হবে, সমস্ত উত্তর ভারতসহ আর্যাবর্ত তাঁর শাসনাধীনে ছিল। কিন্তু তা সঠিক নয়। আর্যাবর্তের উত্তরে দেবপাল গিয়েছিলেন এমন কোনো প্রমাণ নেই। পণ্ডিতদের ধারণা কম্বোজ সম্ভবত তিব্বতকেই বুঝানো হয়েছে।

বাদল পিলার তাম্রশাসনে উল্লেখ আছে যে, দেবপাল গুর্জর রাজার দর্পচূর্ণ করেছিলেন। সেই গুর্জররাজ সম্ভবত নাগভটের পৌত্র মিহির ভোজ। রাষ্ট্রকূটরাজ তৃতীয় গোবিন্দের কাছে পরাজয়ের পর প্রতীহাররাজ নাগভট ও তাঁর পুত্র রামভদ্রের শক্তি অতিশয় দুর্বল হয়ে পড়েছিল। রামভদ্রের রাজত্বকালে প্রতীহার রাজ্য শত্রুকর্তৃক বিধ্বস্ত হয়েছিল, এরূপ ইঙ্গিতও এই বংশের লিপিতে পাওয়া যায়। আবার রাজা ভোজের গোয়ালিয়র প্রশস্তির ১৮নং শ্লোকে এবং বালাদিত্যের কাস্ত প্রশস্তি তে পালরাজার বিরুদ্ধে ভোজের যুদ্ধজয়ের দাবি করা হয়েছে। দু’পক্ষেরই জয়লাভের বিষয়টি রমেশচন্দ্র মজুমদার এভাবে সমাধান করেছেন যে, তৎপুত্র ভোজ প্রথমে কিছু সফলতা লাভ করেছিলেন এই কারণে যে, তিনি ৮৩৬ অব্দে কনৌজ ও কালঞ্জরের আধিপত্য লাভ করেছিলেন; কিন্তু তিনি ৮৬৭ অব্দের পূর্বে রাষ্ট্রকূটরাজ কর্তৃক পরাজিত এবং ৮৬৯ অব্দের পূর্বে স্বীয় রাজ্য গুর্জর (বর্তমানে রাজপুতানা) থেকে বিতাড়িত হন।

মুঙ্গেরে প্রাপ্ত দেবপালের তাম্রশাসনে তাঁর সাম্রাজ্য হিমালয় হতে রামেশ্বর সেতুবন্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এটি অতিরঞ্জিত এবং নিছক কবিকল্পনা বলেই অনেকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এর মূলে কিছু সত্য একেবারেই ছিল না, এমন নয়। দেবপাল যে দ্রবিড়নাথের দর্প চূর্ণ করেছিলেন, ঐতিহাসিকরা তাঁকে দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটরাজ বলেই গ্রহণ করেছেন। প্রতীহার রাজার ন্যায় রাষ্ট্রকূট রাজার সাথেও পালরাজগণের বংশানুক্রমিক শত্রুতা ছিল, সুতরাং দেবপাল কোনও রাষ্ট্রকূট রাজাকে পরাভূত করে থাকবেন, এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু দ্রবিড় বলতে এখানে সাধারণত দাক্ষিণাত্য বুঝায় না, এটি দক্ষিণ ভারত অর্থাৎ কৃষ্ণা নদীর দক্ষিণস্থিত ভূভাগের নাম। এই সুদূর দেশে যে দেবপাল যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন, এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ না থাকাতেই পণ্ডিতগণ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী দ্রবিড়নাথ ও রাষ্ট্রকূটরাজকে অভিন্ন বলে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু রমেশচন্দ্র মজুমদার বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি লিপি হতে জানা যায়- মগধ, কলিঙ্গ, চোল, পল্লব ও গঙ্গ প্রভৃতি রাজ্য মিলিত হয়ে পাণ্ড্যরাজ্যের সাথে যুদ্ধ করে। কুম্বকোনম্ নামক স্থানে পাণ্ড্যরাজ শ্রীমার শ্রীবল্লভ এদের পরাস্ত করেন। শ্রীমার শ্রীবল্লভের রাজ্যকাল ৮৫১ হতে ৮৬২ অব্দ। এর অব্যবহিত পূর্বে দেবপাল যে মগধের রাজা ছিলেন, সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নেই; আর উৎকল জয় করার পর যে তিনি কলিঙ্গ প্রভৃতি দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্বন্ধে আবদ্ধ হয়ে থাকবেন এটিও খুব স্বাভাবিক। সুতরাং অসম্ভব নয় যে, উল্লিখিত মিলিত শক্তির সাথে দেবপাল পাণ্ড্যরাজ্যে কোনো যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। রামেশ্বর সেতুবন্ধ পাণ্ড্যরাজ্যে অবস্থিত। সুতরাং দেবপালের সভাকবি হয়ত এই সমরবিজয় উপলক্ষ করে দেবপালের রাজ্য রামেশ্বর সেতুবন্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত বলে বর্ণনা করেছেন।

দেবপাল অন্তত ৩৫ (মতান্তরে ৩৯) বছর রাজত্ব করেছিলেন। তিব্বতী লামা তারনাম বলেছেন, দেবপাল ৪৮ বছর রাজত্ব করেছেন। সময়টি একটু মনে হলেও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, গোরভমিশ্রের পরিবার থেকে তিন প্রজন্ম দেবপালের উপদেষ্টার কাজ করেছেন। কাজেই দেবপালের রাজত্বকালের সময়কে ৪০ বছর মনে করলে বেশি বলে গণ্য হয় না। তাঁর রাজ্যকাল ৮১০ হতে ৮৫০ অব্দ অনুমান করা যেতে পারে।

তাঁর সময়ে পালসাম্রাজ্য গৌরবের চরম শিখরে আরোহণ করেছিল। তাঁর রাজত্বকালে বাঙালি সৈন্য ব্রহ্মপুত্র হতে সিন্ধুনদের তীর এবং সম্ভবত দক্ষিণ ভারতের প্রায় শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিজয়াভিযান করেছিল। প্রায় সমগ্র আর্যাবর্ত তাঁকে অধীশ্বর বলে স্বীকার করত। ভারতবর্ষের বাইরেও তাঁর খ্যাতি ও প্রতিপত্তি বিস্তৃত হয়েছিল। নালন্দা তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, যবদ্বীপ, সুমাত্রা ও মালয় উপদ্বীপের অধিপতি শৈলেন্দ্রবংশীয় মহারাজ বালপুত্রদেব তাঁর নিকট দূত প্রেরণ করেন। শৈলেন্দ্ররাজ প্রসিদ্ধ নালন্দা বিহারে একটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি এর ব্যয় নির্বাহের জন্য পাঁচটি গ্রাম প্রার্থনা করেন এবং দেবপাল তাঁকে পাঁচটি গ্রাম দান করেন। নালন্দা তখন সমগ্র এশিয়ার মধ্যে বৌদ্ধধর্মের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এবং পালরাজগণও বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকরূপে ভারতের বাইরে সর্বত্র বৌদ্ধগণের নিকট সুপরিচিত এবং সম্মানিত ছিলেন। দেবপাল যে নালন্দা বিহারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত ছিলেন, অন্য একটি শিলালিপিতে তার কিছু আভাস আছে। এটি হতে আমরা জানতে পারি, (বর্তমান জালালাবাদ) নিবাসী ব্রাহ্মণবংশীয় ইন্দ্রগুপ্তের পুত্র বীরদেব ‘দেবপাল নামক ভুবনাধিপতির নিকট পূজাপ্রাপ্ত’ এবং ‘নালন্দার পরিপালনভার প্রাপ্ত হয়েছিলেন।’

৮৫১ অব্দে আরবী ভাষায় লিখিত একটি গ্রন্থ হতে জানা যায় যে, তৎকালে ভারতে তিনটি প্রধান রাজ্য ছিল। এদের মধ্যে দু’টি যে রাষ্ট্রকূট ও গুর্জর প্রতীহার, তা বেশ বুঝা যায়। তৃতীয়টি রুহ্মি অথবা রহ্ম। এই নামের অর্থ বা উৎপত্তি যাই হোক, এটি যে পালরাজাকে বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। উল্লিখিত গ্রন্থ অনুসারে রহ্ম দেশের রাজা প্রতিবেশী গুর্জর ও রাষ্ট্রকূট রাজার সাথে সর্বদাই যুদ্ধে লিপ্ত থাকতেন। কিন্তু তাঁর সৈন্য শত্রুসৈন্য অপেক্ষা সংখ্যায় অধিক ছিল। যুদ্ধযাত্রাকালে ৫০,০০০ রণহস্তী এবং সৈন্যগণের বস্ত্রাদি ধৌত করার জন্য দশ পনের হাজার অনুচর তাঁর সঙ্গে থাকত। এই বর্ণনা সম্ভবত দেবপাল সম্বন্ধে প্রযোজ্য।

সোডঢল প্রণীত উদয়সুন্দরীকথা নামক কাব্য হতে জানা যায় যে, অভিনন্দ পালরাজ যুবরাজের সভাকবি ছিলেন। অভিনন্দ প্রণীত রামচরিত কাব্যে যুবরাজের আরও কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ধর্মপালের বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ‘পালকুলচন্দ্র’ এবং ‘পালকুল-প্রদীপ’ প্রভৃতি আখ্যায় বিভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর উপাধি ছিল হারবর্ষ এবং পিতার নাম বিক্রমশীল। তিনি অনেক রাজ্য জয় করেছিলেন।

যুবরাজ হারবর্ষ যে পালবংশীয় রাজা ছিলেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিক্রমশীল যে ধর্মপালেরই নামান্তর, তাতেও সন্দেহ করার বিশেষ কারণ নেই; কারণ তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিহার ‘শ্রীমদ্-বিক্রমশীল-দেব-মহাবিহার’ নামে অভিহিত হয়েছে। সুতরাং যুবরাজ হারবর্ষ ধর্মপালের পুত্র ছিলেন, এরূপ অনুমান করা যেতে পারে। কিন্তু হারবর্ষ যুবরাজ দেবপালেরই নামান্তর অথবা তাঁর ভ্রাতা, এ সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।

ধর্মপাল ও দেবপালের রাজত্বকালে বাংলার শক্তি ও সমৃদ্ধি বেড়েছিল সন্দেহ নেই। তবে তিব্বতে প্রচলিত প্রবাদ থেকে জানা যায় যে, ধর্মপাল তিব্বতের রাজা খ্রী-সংল্দে-ব্ৎসনের (৭৫৫-৭৯৭ অব্দ) বশ্যতা স্বীকার করেন এবং তিব্বতীয় রাজা রল্-প-চন্ (৮১৭-৮৩৬) গঙ্গাসাগর পর্যন্ত জয় করেন। এই প্রকার দাবির মূলে কতদূর সত্য নিহিত আছে, তা জানার উপায় নেই। কারণ ভারতীয় কোনো গ্রন্থ বা লিপিতে উক্ত তিব্বতীয় অভিযানের কোনো উলেখ নেই। তবে এরূপ অভিযান অসম্ভব নয় এবং সম্ভবত মাঝে মাঝে এর ফলে পালরাজগণ বিপন্ন হতেন। নাগভট কর্তৃক ধর্মপালের পরাজয় এবং প্রথম ভোজের ৮৩৬ অব্দে কনৌজ অধিকার প্রভৃতি ঘটনার সাথে এরূপ কোনো তিব্বতীয় অভিযানের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ সম্বন্ধ থাকা বিচিত্র নয়। অর্ধশতাব্দীর অধিক কাল পর্যন্ত ধর্মপাল ও দেবপাল আর্যাবর্তে বিস্তৃত সাম্রাজ্যের অধীশ্বর ছিলেন।

দেবপাল ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর বিগ্রহপাল প্রথম সিংহাসনে বসেন।


সূত্র :
বাংলাদেশের ইতিহাস /রমেশচন্দ্র মজুমদার।
ভারতের ইতিহাস । অতুলচন্দ্র রায়, প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়।
বাংলার ইতিহাস, খণ্ড- ১। আর. ডি. ব্যানার্জী।
কালিমপুর প্লেইট: খণ্ড-৪, পৃ. ২৪৮।
তৃতীয় গোবিন্দের রাধনপুর তাম্র লিপির ৮ম শ্লোক।
গোয়ালিয় প্রশস্তির ৮ম শ্লোক।
সঞ্জন (Sanjan) তাম্রলিপ্তির শ্লোক নং- ২৩।
খালিমপুর প্রশস্তি: শ্লোক- ৬-১৩।
Indian Antiquary, vol. 15, p. 309.