ইব্রাহিম আঃ
আরবি: إِبْرَاهِيمُ ʾIbrāhīm,
হিব্রু:
אַבְרָהָם Abraham)।
বাংলা ভাষায় নামটি ইব্রাহিম হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ইসলাম
ধর্মাবলম্বীদের কাছে সম্মানিত নবি। তিনি ইসলাম ধর্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ নবি ( সৃষ্টিকর্তার সাথে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যোগাযোগ বা বার্তা বিনিময় হয়েছে) ও রাসূল
(আল্লাহ্'র প্রেরিত বার্তাবাহী ব্যক্তিত্ব, যিনি আল্লাহ্র কাছ থেকে পুস্তক প্রাপ্ত হয়েছেন)।
তিনি আবুল আম্বিয়া (নবীগণের পিতা) নামে পরিচিত। পবিত্র কুরআনে তাঁর নাম অনেকবার (প্রায় ৬৯ বার) উল্লেখিত হয়েছে এবং তাঁর নামে একটি সূরা (সূরা ইবরাহিম) রয়েছে। তিনি একত্ববাদের প্রচারক এবং মুসলিম উম্মাহর জাতির পিতা।
ইহুদি ধর্মের অনুসরণীয় গ্রন্থ তোরাহের (Tanakha)
-এর
Genesis,
(আদিপুস্তক)-
১১: ২৬ থেকে ২৫: ১১ পর্যন্ত আব্রাম
(Abram)
নামে এই নবির বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। খ্রিষ্টধর্মের অনুসরণীয় গ্রন্থ বাইবেলের
আদিপুস্তকে
তোরাহের কাহিনিটিই গৃহীত হয়েছে। ইসলামধর্মের অনুসরণীয় গ্রন্থ আল্ কোরআনে এই নবীর
কাহিনি বিভিন্ন সুরায় প্রসঙ্গক্রমে এসেছে। এই প্রসঙ্গ অনুসরণ করে এই নবির পূর্ণ
জীবনী পাওয়া যায় না।
- [Genesis,
11:26-25:11. Hebrew-English
Tanakha, The Jewish Bible. Varda Books. 2009, page 19-45]
- আদি পুস্তক। ১১:২৬-
২৫-১১। পবিত্র বাইবেল। পুরাতন ও নূতন নিয়ম। বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটী ঢাকা।
পৃষ্ঠা: ১৪-৩৪]
- পবিত্র কোরআনুল
করীম। অনুবাদ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। খাদেমুল- হারানাগিন বাদশা ফাহদ কোররআন
মুদ্রণ প্রকল্প।
উল্লেখিত তিনটি
ধর্মগ্রন্থ অনুসারে ইব্রাহিম (আঃ) সম্পর্কে যা জানা যায়, তা হলো-
- বংশানুক্রমিক তালিকা: আদি পিতা আদম (আঃ) -এর উত্তরপুরুষ ছিলেন নুহ (আঃ)। নুহ
(আঃ)-এর সংঘটিত হয়েছিল মহাপ্লাবন। তাঁর পুত্ররা ছিলেন শেম. হাম, ও যাফেত। এঁদের
সন্তানদের জন্ম হয়েছিল মহাপ্লাবনের পরে। এঁদের প্রত্যেকের সন্তানদের তালিকা
পাওয়া যায়
তোরাহ এবং বাইবেলের পুরাতন নিয়মে। সব মিলিয়ে এঁরা একটি জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল।
তখন এঁরা একই ভাষায় কথা
বলতেন। একদিন এঁরা শীনার দেশের সমভূমিতে এসে ইট তৈরি করে, তাই আগুনে পুড়িয়ে একটি
শহর তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করলো। ধীরে ধীরে এঁরা ধাপে ধাপে বিশাল অট্টালিকা তৈরি
করলো। সদাপ্রভু (Lord)
মানুষের এই কর্মকাণ্ড দেখে ভাবলেন- এরা যদি
একত্রিত হয়ে কোনো কিছু করতে চায়, তাহলে এদের অসাধ্য কিছুই থাকবে না। তাই তিনি
ঐক্যের বন্ধন ভাষাকে গোত্রে গোত্রে ভাগ করে দিলেন। এর ফলে বিভি্ন্ন ভাষাভিত্তিক
গোত্রগুলো ভাষাভেদের জন্য ঐক্য হারিয়ে ফেললো। এবং তাদের একতা বিনষ্ট হওয়ার পর
এই অট্টালিকা তৈরিও বন্ধ হয়ে গেলো। শেষ পর্যান্ত ভাষাভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো নানা
দেশে ছড়িয়ে পড়লো। ভাষাভেদ সৃষ্টির কারণে এই স্থানের নাম রাখা হয়েছিল
বাবেল। এই নগরীতে নুহ (আঃ)-এর পুত্র শেম থেকে গিয়েছিলেন। এই শেমের বংশে
জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইব্রাহিম (আঃ)-এর পিতা তোরাহ (আঃ)।
- ইব্রাহিম (আঃ) -এর
তিন ভাই ও তাঁদের সংসার
তোরাহ (আঃ)-এর তিন পুত্র ছিলেন আব্রাহাম, নাহোর ও হারান।
হারান তাঁর দুই কন্যার জন্ম দেওয়ার
উর
নগরীতে মৃত্যবরণ করেন। এই দুই কন্যার নাম ছিল মিল্কা এবং ইস্কা। তাঁর অপর
পুত্রের নাম ছিল লোট। নাহোর তাঁর ভাইয়ের মেয়ে মিল্কাকে বিবাহ করেছিলেন। অন্যদিকে ইব্রাহিম (আঃ) বিবাহ করলেন সারাহ নামক এক কন্যাকে।
উল্লেখ্য এই সময় ইব্রাহিম (আঃ)-এর কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করেন নি। একদিন তোরাহ (আঃ) হারান-এর
পুত্র লোট এবং ইব্রাহিম (আঃ) এবং তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে উর নগরী ত্যাগ করে- কনান
দেশে আসেন এবং সেখান থেকে
হারান নগরীতে
এসে বসবাস শুরু করেন। এখানে তোরাহ (আঃ)-এর
মৃত্যু হয়।
উল্লেখ্য
খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০-৪১০০ অব্দের দিকে
উর
ছিল
একটি ছোট্ট গ্রাম। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮০০ অব্দের দিকে এই গ্রামটি শহরে পরিণত হয়েছিল।
খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ অব্দের প্রথম দিকে এই নগরটি নগররাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। তখন
এই রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল উর নগরী। নানা ঘটনার সূত্রে এই নগরীটি পরিত্যক্ত
হয়েছিল।
- ইব্রাহিম (আঃ)-এর
দেশত্যাগ: একদিন সদাপ্রভু ইব্রাহিম (আঃ)-কে
এই দেশ ত্যাগ করার আদেশ দিলেন। এবং বললেন যে, তিনি তাঁকে এমন একটি দেশ প্রদান
করবেন, যেখানে ইব্রাহিম (আঃ)-এর থেকে মহান জাতির উদ্ভব হবে। এই আদেশের পরে লোট
ও সারাহ এবং তার সহকারীদের সাথে নিয়ে ইব্রাহিম (আঃ)
হারান ত্যাগ করে কনান
দেশে চলে আসেন। তিনি এই দেশের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে সিখেমের পূন্যস্থান হিসেবে
পরিচিত একটি ওক গাছের কাছে আসেন। এই স্থানটি কেন পবিত্র ছিল- তোরাহ বা বাইবেলে
উল্লেখ নেই।
- ইব্রাহিম আঃ-এর মিশর যাত্রা: কনানে এসে সদাপ্রভু
তাঁকে দেখা দিয়ে বললেন যে, এই দেশ তাঁকে প্রদান করা হবে। ইব্রাহিম (আঃ)
সদাপ্রভুর দেখা দেওয়ার স্থানে একটা বেদী তৈরি করলেন। এরপর তিনি বেথেলে (জেরুজালেমের
১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত স্থান, এর অর্থ হলো- ঈশ্বরের আবাস) পূর্বদিকের
পার্বত্য অঞ্চলে তাবু স্থাপন করলেন। এখানেই তিনি সদাপ্রভুর স্মরণে একটি
বেদী তৈরি করলেন। তারপর নানা স্থান ঘুরে তিনি নেগের অঞ্চলের দিকে এগিয়ে গেলেন।
এই সময় এই অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি মিশরে পথে যাত্রা করেন।
- মিশরে ইব্রাহিম (আঃ): মিশরে প্রবেশের মুখে ইব্রাহিম (আঃ), ভাবলেন তাঁর সুন্দরী স্ত্রী সারাকে
পাওয়ার জন্য মিশরবাসীরা তাঁকে হত্যা করতে পারে। তাই স্ত্রীর সাথে পরমার্শ করে- ইব্রাহিম
(আঃ) সারাকে বোন হিসেবে পরিচয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মিশরে ঢোকার পর, মিশরীয়রা সারার রূপে মুগ্ধ হয়ে রাজা ফারাও-এর কাছে তাঁকে পাঠান। আর সারার ভাই হিসেব ইব্রাহিম
(আঃ)-কে প্রচুর উপহার দেন। এই ঘটনার পর সদাপ্রভু ফারাও- এবং তার পরিবারের উপর
নানা দুর্যোগ ঘটাতে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত ফারাও বিষয়টি বুঝতে পেরে ইব্রাহিম
(আঃ)-এর কাছে সারাকে ফিরিয়ের দেন এবং মিশর থেকে বের করে দেন। ইব্রাহিম
(আঃ) মিশরে প্রাপ্ত সকল সম্প্দ নিয়ে নেগেব ফিরে আসেন।
- মিশরে ইব্রাহিম (আঃ) উত্তর কনানে আগমন: ইব্রাহিম (আঃ) মিশর থেকে প্রাপ্ত সম্পদ (গবাদি পশু, রৌপ্য, স্বর্ণ ইত্যাদি) নিয়ে স্ত্রী সারা ও ভ্রাতুষ্পুত্র লূতসহ নেগেব অঞ্চল থেকে উত্তরে কানান দেশে ফিরে আসেন। তিনি আগের সেই স্থানে ফিরে যান যেখানে প্রথমবার আল্লাহর দেখা পেয়েছিলেন- বেথেল এবং আয়-এর মাঝামাঝি স্থানে। তিনি পূর্বে যে বেদী তৈরি করেছিলেন, সেখানে আবার আল্লাহর নামে বেদী নির্মাণ করেন এবং প্রার্থনা ও ইবাদত করেন। এটি তাঁর ঈমানের পুনরুদ্ধারের চিহ্ন- মিশরে যে ভুল (সারাকে বোন বলে পরিচয় দেওয়া) করেছিলেন, তার পর তিনি আল্লাহর কাছে ফিরে আসেন।
(আদিপুস্তক ১৩:১-৪)
লূতের সাথে বিবাদ ও বিচ্ছেদ:
ইবরাহিম (আঃ) ও লূতের সম্পদ এত বেড়ে যায় যে তাদের পশুসমূহের জন্য একই জায়গায় চারণভূমি ও পানি যথেষ্ট ছিল না। ফলে তাদের রাখালদের মধ্যে বিবাদ ও ঝগড়া শুরু হয়।
ইবরাহিম (আঃ শান্তিপ্রিয় ছিলেন। তাই তিনি লূতকে বলেন যে, "আমাদের মধ্যে যতই ঝগড়া হোক।
আমরা ভাই-ভাই। সমস্ত দেশ তোমার সামনে খোলা। তুমি বাঁ দিকে যাও, আমি ডান দিকে যাব; অথবা তুমি ডান দিকে যাও, আমি বাঁ দিকে যাব।"
লূত উপত্যকার দিকে তাকিয়ে দেখেন যে ইয়ার্দেন (জর্ডান) নদীর চারপাশের অঞ্চল (বর্তমান জর্ডান ভ্যালি) খুব উর্বর, সবুজ ও জলসমৃদ্ধ। তাই লূত সেই দিকে (পূর্ব দিকে) যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সদোম নগরীর কাছে তাঁবু স্থাপন করেন।
ইবরাহিম (আঃ) কানান দেশেই থেকে যান। বিচ্ছেদের পর আল্লাহ ইবরাহিমকে আবার আশীর্বাদ করেন এবং বলেন:
"তোমার চোখ তুলে চারদিকে দেখো। আমি তোমাকে এবং তোমার বংশধরদেরকে এই সমস্ত দেশ চিরকালের জন্য দেব। তোমার বংশধরকে ধূলিকণার মতো অগণিত করব।"
ইবরাহিম (আঃ) তারপর হিব্রো-এর মমরে এর ওক গাছের কাছে গিয়ে বাস করেন এবং সেখানে আরেকটি বেদী নির্মাণ করেন।
(আদিপুস্তক ১৩:৫-১৮)
কুরআনে এই বিচ্ছেদের ঘটনা সরাসরি বিস্তারিত নেই, তবে লূত (আঃ)-কে ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (সূরা আনকাবুত: ২৬-২৭)। লূত (আঃ) সদোম ও গোমোরাহ নগরীতে বাস করেন, যেখানে তাঁর কওমের অশ্লীলতা ও অপরাধের কারণে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করেন (সূরা হুদ: ৭৪-৮৩, সূরা আনকাবুত: ২৮-৩৫ ইত্যাদি)। ইবরাহিম (আঃ)-কে এই ধ্বংসের সংবাদ দেওয়া হয় এবং তিনি লূতের জন্য দোয়া করেন।
- ইব্রাহিম আঃ-এর দ্বিতীয় বিবাহ ও সন্তান লাভ
হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর প্রথম স্ত্রী সারা দীর্ঘকাল বন্ধ্যা ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে সন্তান না হওয়ায় সারা হতাশ হন।
পরে সারা নিজের দাসী হাজেরা (মিশর থেকে প্রাপ্ত উপহার) কে ইবরাহিম (আ.)-এর সাথে বিবাহ দেন। এই বিবাহের ফলে হাজেরা গর্ভবতী হন।
আদিপুস্তক ১৬ অধ্যায়ে বর্ণিত: সারা হাজেরাকে ইবরাহিমের কাছে দেন। হাজেরা গর্ভবতী হলে সারার প্রতি অহংকারী হয়ে ওঠেন।
সারা কষ্ট পেয়ে হাজেরার সাথে কঠোর আচরণ করেন। হাজেরা পালিয়ে যান এবং মরুভূমিতে
আশ্রয় নেন। এখানে আল্লার তরফ থেকে ফেরেস্তা এসে জানান- "তুমি গর্ভবতী, একটি পুত্র জন্ম দেবে। তার নাম রাখবে ইশ্মায়েল, কারণ আল্লাহ তোমার কষ্ট শুনেছেন।"
উল্লেখ্য ইসমায়েল -এর অর্থ: "আল্লাহ শোনেন"।
"সে একটি বুনো গাধার মতো মানুষ হবে; তার হাত সবার বিরুদ্ধে, সবার হাত তার বিরুদ্ধে; সে তার ভাইদের মাঝে বাস করবে।"
হাজেরা ফিরে আসেন এবং পুত্র জন্ম দেন। ইবরাহিম (আঃ) তার নাম ইশ্মায়েল রাখেন।
ইবরাহিমের বয়স তখন ৮৬ বছর। (আদিপুস্তক ১৬:১৫-১৬)। ১৪ বছর পর (ইবরাহিম ১০০ বছর বয়সে) সারার গর্ভে ইসহাক (আ.) জন্মগ্রহণ করেন।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ (কুরআন ও হাদিস) অনুসারে
কুরআনে ইসমাইল (আঃ)-এর জন্মের বিস্তারিত বর্ণনা নেই, বরং তাঁকে ইবরাহিম (আঃ)-এর পুত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (সূরা বাকারা ১২৫-১২৯, সূরা ইবরাহিম ৩৯, সূরা মারিয়াম ৫৪-৫৫)। হাদিসে (সহিহ বুখারি, ইবনে আব্বাস (রা.)
থেকে জানা যায়- জন্মের পর শিশু ইসমাইল (আ.) ও মা হাজেরাকে আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) মক্কার নির্জন উপত্যকায় (বর্তমান মক্কা) রেখে আসেন। সেখানে পানির অভাবে হাজেরা সাফা-মারওয়া পাহাড়ে দৌড়ান, এবং আল্লাহ জমজম কূপ সৃষ্টি করেন। ইসমাইল (আ.)-কে নবী হিসেবে গণ্য করা হয়, এবং তাঁর বংশ থেকে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) আগমন ঘটে।
বাইবেলে (আদিপুস্তক ২২) বলা হয়েছে- ১৪ বছর পর (ইবরাহিম ১০০ বছর বয়সে) সারার গর্ভে ইসহাক (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন।
আল্লাহ বলেন "তোমার একমাত্র পুত্র, যাকে তুমি ভালোবাসো"।
মুসলিম আলেমরা বলেন: কুরআনে ইসমাইলই "একমাত্র পুত্র" (ইসহাকের জন্মের আগে), এবং কুরআনের বর্ণনা সঠিক। বাইবেলে পরিবর্তন হয়েছে।
- ইব্রাহিম আঃ -এর প্রণীত কোরবানীর ঘটনা
বাইবেলের বর্ণনার সারাংশ
(আদিপুস্তক ২২:১-১৯)
হলো- ঈশ্বর অাব্রাহামকে পরীক্ষা করার জন্য বলেন:
"তোমার পুত্রকে, তোমার একমাত্র পুত্রকে, যাকে তুমি ভালোবাসো—সেই ইসহাককে—নাও এবং মোরিয়া দেশে যাও। সেখানে যে পর্বতের কথা আমি তোমাকে বলব, তার উপরে তাকে হোমার্থে বলিদান কর।" (আয়াত
২)
এখানে "একমাত্র পুত্র" বলা হয়েছে, যা ইসহাককে বোঝায়—ইসমাইলকে তখন বিতাড়িত করা হয়েছে। অব্রাহাম ভোরবেলায় উঠে গাধা সাজান, দুইজন দাস ও পুত্র ইসহাককে নিয়ে যান। তিনদিনের পথ অতিক্রম করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছান। দাসদের বলেন: "আমরা ও ছেলে সেখানে গিয়ে উপাসনা করব, তারপর তোমাদের কাছে ফিরে আসব।" (আয়াত
৫)। এতে অব্রাহামের বিশ্বাস প্রকাশ পায় যে তারা দুজনেই ফিরবে। ইসহাক কাঠ বহন করেন (যা তার বয়সের ইঙ্গিত দেয় যে তিনি যুবক বা কিশোর)। তিনি জিজ্ঞাসা করেন: "আগুন ও কাঠ তো আছে, কিন্তু হোমার্থে মেষশাবক কোথায়?"
অব্রাহাম উত্তর দেন: "ঈশ্বর নিজেই হোমার্থে মেষশাবক যোগাবেন, বৎস।" (আয়াত ৭-৮)। এটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বলে খ্রিস্টানরা মনে করেন, যেখানে যীশুকে "ঈশ্বরের মেষশাবক" বলা হয়েছে। অাব্রাহাম বেদী তৈরি করেন, কাঠ সাজান, পুত্রকে বেঁধে কাঠের উপর শুইয়ে দেন। ছুরি তুলে পুত্রকে জবাই করতে যান।
ঈশ্বরের দূত আকাশ থেকে ডেকে বলেন: "অাব্রাহাম! অবা্রাহাম!""ছেলের গায়ে হাত দিও না, কোনো কিছু করো না। এখন আমি জানি যে তুমি ঈশ্বরকে ভয় করো, কারণ তুমি তোমার পুত্রকে, তোমার একমাত্র পুত্রকে আমার কাছ থেকে আটকে রাখোনি।" আয়াত ১১-১২)। অব্রাহাম চোখ তুলে দেখেন একটি মেষ শিংয়ে আটকে আছে। তিনি সেই মেষকে নিয়ে পুত্রের পরিবর্তে হোমবলি দেন। স্থানের নাম রাখেন "যিহোবা-জিরে" বা "প্রভু যোগাবেন"। (আয়াত ১৩-১৪)। ঈশ্বর আবার আশীর্বাদ করে
বলেন- অব্রাহামের বংশধর আকাশের তারা ও সমুদ্রের বালুর মতো বহু হবে, এবং তারা পৃথিবীর সকল জাতিকে আশীর্বাদ করবে। (আয়াত ১৫-১৮)
কুরআনীয় বর্ণনা (সূরা আস-সাফফাত: ১০০-১০৭) হযরত ইবরাহিম (আঃ) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন:
"হে আমার রব! আমাকে সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন।" (১০০)
আল্লাহ তাঁকে সহনশীল (হালীম) এক পুত্রের সুসংবাদ দেন (১০১)। এটি ইসমাইল (আঃ)।
যখন পুত্র (ইসমাইল) পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছান (অর্থাৎ যুবক বয়সে, হাদিসে প্রায় ১৩-১৪ বছর বলা হয়), তখন ইবরাহিম (আঃ) স্বপ্নে দেখেন যে তিনি পুত্রকে কুরবানি করছেন। (নবীদের স্বপ্ন ওহী সমতুল্য।)
তিনি পুত্রকে বলেন:
"হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে আমি তোমাকে কুরবানি করছি। তুমি কী মনে করো?" (১০২)
ইসমাইল (আঃ) উত্তর দেন:
"হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা করুন। আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।" (১০২)
এতে পিতা-পুত্র উভয়ের আনুগত্য ও ঈমানের চরম পরাকাষ্ঠা প্রকাশ পায়।
যখন তারা উভয়ে আল্লাহর প্রতি সমর্পিত হন এবং ইবরাহিম (আঃ) পুত্রকে জবাইয়ের জন্য প্রস্তুত করেন), তখন আল্লাহ ডেকে বলেন:
"হে ইবরাহিম! তুমি স্বপ্ন পূর্ণ করেছ। আমরা এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করি।" (১০৩-১০৫), এটি ছিল একটি স্পষ্ট পরীক্ষা (১০৬)।
আল্লাহ পুত্রকে একটি মহান কুরবানি (দুম্বা/মেষ) দিয়ে মুক্তি দেন এবং বলেন-
"আমরা তাকে এক মহান কুরবানির বিনিময়ে মুক্ত করে দিলাম।" (১০৭)। এরপর শান্তি বর্ষিত হয় ইবরাহিমের উপর (১০৮-১১১)।
হাদিস ও তাফসীর অনুসারে বিস্তারিত
হাদিসে (সহিহ বুখারি, মুসলিম ইত্যাদি) বর্ণিত: আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) ইসমাইল (আ.)-কে মিনার কাছে নিয়ে যান। শয়তান বাধা দেয়, কিন্তু পিতা-পুত্র পাথর নিক্ষেপ করে তাকে তাড়ান (এটি হজের জমরাত নিক্ষেপের ভিত্তি)।
ছুরি চালানোর আগেই আল্লাহ ফেরেশতা পাঠিয়ে দুম্বা পাঠান এবং পুত্রকে রক্ষা করেন। কোনো রক্তপাত হয়নি—শুধু আনুগত্যের পরীক্ষা।
এ ঘটনা মুসলিমদের শিক্ষা দেয়: আল্লাহর জন্য সবকিছু ত্যাগ করার প্রস্তুতি, ধৈর্য, আনুগত্য এবং আল্লাহর রহমত।