বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: (পিয়া মোর) উচাটন মন ঘরে রয় না
(পিয়া মোর) উচাটন মন ঘরে রয় না।
(পিয়া মোর) ডাকে পথে বাঁকা তব নয়না॥
ত্যজিয়া লোক-লাজ
সুখ-সাধ গৃহ-কাজ,
(প্রিয়া মোর) নিজ গৃহে বনবাস সয়না॥
লইয়া স্মৃতির লেখা
কত আর কাঁদি একা,
(পিয়া মোর) ফুল গেলে কাঁটা কেন যায় না॥
- ভাবসন্ধান: বিরহজনিত অস্থিরতা, প্রিয়জনের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ এবং স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘস্থায়ী বেদনা। প্রিয়তমের অনুপস্থিতিতে প্রেমিকার কাছে ঘর বনবাসে পরিণত হয়েছে, আর অতীতের প্রেম ফুলের মতো ঝরে গেলেও তার কাঁটা আজও হৃদয়ে রয়ে গেছে। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে বিরহিণী প্রেমিকার গভীর আকুলতা ও প্রিয়তমের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। প্রিয়জনের বিচ্ছেদে তাঁর মন অস্থির ও উচাটন হয়ে উঠেছে; তাই সংসারের ঘর আর তাঁর কাছে শান্তি বা আশ্রয়ের স্থান বলে মনে হয় না। দেহ ঘরে থাকলেও মন ছুটে যেতে চায় সেই প্রিয়তমের কাছে।
'ডাকে পথে বাঁকা তব নয়না' -প্রিয়তমের বাঁকা বা চঞ্চল নয়নের স্মৃতি যেন তাঁকে পথের দিকে আহ্বান জানায়। সেই স্মৃতির আকর্ষণ এত প্রবল যে, তিনি আর সামাজিক নিয়ম, লোকলজ্জা কিংবা সংসারের কর্তব্যের বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে পারেন না। প্রিয়জনের আহ্বান তাঁর কাছে বাহিরের কোনো ডাকের চেয়েও গভীর—তা হৃদয়ের অন্তর্গত আকর্ষণ।
তাই তিনি বলেন- 'ত্যজিয়া লোক-লাজ / সুখ-সাধ গৃহ-কাজ'। অর্থাৎ, লোকসমাজের নিন্দা-প্রশংসা, ব্যক্তিগত সুখের আয়োজন এবং গৃহস্থজীবনের নানা দায়িত্ব- সবকিছুই তাঁর কাছে এখন অর্থহীন হয়ে উঠেছে। কারণ প্রিয়জনহীন নিজের ঘরও তাঁর কাছে বনবাসের মতো মনে হয়।
'নিজ গৃহে বনবাস সয়না' -এই কথার মধ্যে বিরহের গভীর অসহায়তা প্রকাশিত হয়েছে। আপন ঘরও যখন প্রিয়জনের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সেই পরিচিত স্থানও নির্বাসনের মতো নির্জন ও অসহনীয় হয়ে ওঠে।
গানটির পরবর্তী অংশে বিরহিণীর একাকিত্ব আরও তীব্র হয়েছে। তিনি প্রিয়তমের রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে সঙ্গী করে কতদিন আর একা কাঁদবেন?
'লইয়া স্মৃতির লেখা / কত আর কাঁদি একা' -এখানে স্মৃতি যেন অতীত প্রেমের এক স্মারক অধ্যায়। প্রিয়জন চলে গেলেও তাঁর স্মৃতি থেকে গেছে; আর সেই স্মৃতিই একদিকে প্রিয়জনের উপস্থিতির অনুভূতি দেয়, অন্যদিকে বিচ্ছেদের বেদনাকে আরও গভীর করে তোলে।
শেষ পঙ্ক্তিতে- 'ফুল গেলে কাঁটা কেন যায় না' -গানটির সবচেয়ে গভীর ও মর্মস্পর্শী রূপক। ফুল এখানে প্রিয়তম বা প্রেমের সুখময় উপস্থিতির প্রতীক, আর কাঁটা হলো তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বেদনা ও যন্ত্রণা। প্রেমের ফুল ঝরে গেছে, প্রিয়জন চলে গেছে; কিন্তু সেই প্রেমের দুঃখ, স্মৃতি ও বিরহের কাঁটা এখনও হৃদয়ে বিঁধে আছে। কবির প্রশ্ন তাই গভীর অভিমানের- যে সুখ চলে গেল, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দুঃখটুকুও কেন চলে গেল না?
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। গানটি ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৪০) মাসে,
মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে।
এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৫ মাস।
- রেকর্ড: মেগাফোন [নভেম্বর ১৯৩৩ (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৪০)]। জেএনজি ৮০। শিল্পী: শ্রীমতী
সাধনা দেবী।
- গ্রন্থ:
-
গীতি-শতদল
- প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। গারা খাম্বাজ-দাদরা]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল। গান সংখ্যা
৩৫। গারা খাম্বাজ-দাদরা। পৃষ্ঠা ৩০৩]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১১৫২
-
সুরলিপি। [১৬ আগষ্ট
১৯৩৪ (বুধবার, ৩১ শ্রাবণ ১৩৪২)]।
জগৎঘটক-কৃত স্বরলিপি। প্রকাশক:
নজরুল ইসলাম।
খাম্বাজ মিশ্র-কার্ফা।
[নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকা
- জগৎ
ঘটক। সুর-লিপি নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, আগষ্ট ২০০৩।
[নমুনা]
-
সুরকার:
কাজী নজরুল ইসলাম
-
পর্যায়:
-
বিষয়াঙ্গ: প্রেম
-
সুরাঙ্গ: রাগাশ্রয়ী
-
রাগ: খাম্বাজ মিশ্র
-
তাল:
কাহারবা
-
গ্রহস্বর: সা