বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: দরিয়ায় ঘোর তুফান, পার করো নাইয়া।
দরিয়ায় ঘোর তুফান, পার করো নাইয়া।
রজনী আঁধার ঘোর, মেঘ আসে ছাইয়া॥
যাত্রী গুনাহ্গার জীর্ণ তরণী,
অসীম পাথারে কাঁদি পথ হারাইয়া॥
হে চির কাণ্ডারী, পাপে তাপে বোঝাই তরী,
তুমি না করিলে পার, পার হব কেমন করি।
সুখ-দিন ভুলে থাকি, বিপদে তোমারে স্মরি,
ডুবাবে কি তব নাম, আমারে ডুবাইয়া॥
মা-র কাছে মার খেয়ে শিশু যেমন মাকে ডাকে,
যত দাও দুখ শোক, ততই ডাকি তোমাকে।
জানি শুধু তুমি আছ, আসিবে আমার ডাকে,
তোমারই এ তরি প্রভু, তুমি চলো বাহিয়া॥
- ভাবসন্ধান: গানটি মানবজীবনের সংকটময় যাত্রাপথে আল্লাহ্র প্রতি নির্ভরতা, নিজের পাপ ও সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি, এবং পরম করুণাময়ের কৃপায় মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষাকে অত্যন্ত আবেগময় ও আধ্যাত্মিক ভাষায়
উপস্থাপিত হয়েছে।
কবি মানবজীবনকে এক জীর্ণ নৌকা এবং পৃথিবীকে এক উত্তাল সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা
করেছেন। চারদিকে ঘন অন্ধকার, ঝড়-তুফান ও অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ পথ হারিয়ে
ফেলে। পাপ ও দুর্বলতায় ভারাক্রান্ত জীবন-নৌকা নিয়ে সে অসীম সংসার-সাগরে
দিশাহীন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় কবি আল্লাহ্কে চিরন্তন কাণ্ডারী বা নৌকার মাঝি
হিসেবে সম্বোধন করে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেছেন।
কবি মনে করেন যে, তাঁর জীবন পাপ ও দুঃখের ভারে বোঝাই। তাই আল্লাহ্র কৃপা ও
পরিচালনা ছাড়া মুক্তির তীরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। মানুষের নিজের শক্তি সীমিত;
একমাত্র পরম করুণাময়ই তাকে নিরাপদে পার করে দিতে পারেন।
কবি আত্মসমালোচনার ভঙ্গীতে এ কথা স্বীকার করেছেন যে, সুখের দিনে মানুষ প্রায়ই
আল্লাহ্কে ভুলে থাকে, কিন্তু বিপদ ও সংকটের সময় তাঁরই শরণাপন্ন হয়। তবুও তিনি
আশা করেন, দয়াময় প্রভু তাঁর এই দুর্বলতার জন্য তাঁকে পরিত্যাগ করবেন না।
আল্লাহ্র নাম ও করুণা কখনো তাঁর বান্দাকে ডুবতে দেয় না—এই বিশ্বাসই তাঁকে
আশাবাদী করে তোলে।
শেষ স্তবকে কবি এক হৃদয়গ্রাহী উপমা ব্যবহার করেছেন। যেমন শিশু মায়ের কাছে
শাসন বা আঘাত পেলেও শেষ পর্যন্ত মাকেই ডাকে এবং তাঁর কাছেই আশ্রয় খোঁজে, তেমনি
জীবনের যত দুঃখ, শোক ও বিপদই আসুক না কেন, তিনি আল্লাহ্কেই ডাকবেন। তাঁর দৃঢ়
বিশ্বাস, আল্লাহ্ অবশ্যই সেই ডাকে সাড়া দেবেন। কারণ জীবনতরী যেমন তাঁরই সৃষ্টি,
তেমনি সেই তরীর প্রকৃত চালকও তিনিই। তাই কবি সম্পূর্ণভাবে নিজের জীবন ও ভাগ্য
আল্লাহ্র হাতে সমর্পণ করেছেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের
১৫ অক্টোবর (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯), '
জুলফিকার'
নামক গীতি-গ্রন্থে
গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- জুলফিকার
- প্রথম সংস্করণ। ১৫ অক্টোবর ১৯৩২ (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯)।
২১ সংখ্যক গান। জংলা-দাদরা।
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ
১৪১৪, মে ২০০৭। জুলফিকার।
২১ সংখ্যক গান। জংলা-দাদরা। পৃষ্ঠা: ৩০৫-৩০৬]
- নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয়
সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০০৩। গান সংখ্যা ১৪৮৬]
- রেকর্ড: টুইন [নভেম্বর ১৯৩২ (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৩৯)।
এফট ২২৯১। শিল্পী: তাকরিমুদ্দীন আহমেদ]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম ধর্ম। হামদ। প্রার্থনা
- সুরাঙ্গ:
রাগাশ্রয়ী