বিষয়:নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: যে দুর্দিনের নেমেছে বাদল
যে দুর্দিনের নেমেছে বাদল তাহারি বজ্র শিরে ধরি’
ঝড়ের বন্ধু আঁধার নিশীথে ভাসায়েছি মোর ভাঙা তরী॥
মোদের পথের ইঙ্গিত ঝলে বাঁকা বিদ্যুতে কালো-মেঘে,
মরু-পথে জাগে নব অঙ্কুর মোদের চলার ছোঁওয়া লেগে,
মোদের মন্ত্রে গোরস্থানের আঁধারে ওঠে গো প্রাণ জেগে,
দীপ-শালাকার মতো মোরা ফিরি ঘরে ঘরে আলো সঞ্চারি’॥
নব জীবনের ‘ফেরাত’-কূলে গো কাঁদে ‘কারবালা’ তৃষ্ণাতুর,
ঊর্ধ্বে শোষণ-সূয, নিম্নে তপ্ত বালুকা ব্যথা-মরুর।
ঘিরিয়া য়ুরোপ – ‘এজিদের’ সেনা এপার ওপার নিকট দূর,
এরি মাঝে মোরা ‘আব্বাস’ সব পানি আনি প্রাণপণ করি’॥
যখন জালিম ‘ফেরাউন’ চাহে ‘মুসা’ ও সত্যে মারিতে ভাই,
নীর দরিয়ার মোরা তরঙ্গ, বন্যা আনিয়া তারে ডুবাই,
আজো ‘নজরুদ’ ‘ইবরাহিমেরে’ মারিতে চাহিছে সর্বদাই,
আনন্দ-দূত মোরা সে আগুনে ফোটাই পুষ্প-মঞ্জুরী॥
ভরসার গান শুনাই আমরা ভয়ের ভূতের এই দেশে,
জরা-জীর্ণের যৌবন দিয়া সাজাই নবীন বর-বেশে।
মোদের আশার ঊষার রঙে গো রাতের অশ্রু যায় ভেসে,
মশাল জ্বালিয়া আলোকিত করি ঝড়ের নিশীথ-শর্বরী॥
নূতন দিনের নব যাত্রীরা চলিবে বলিয়া এই পথে
বিছাইয়া যাই আমাদের প্রাণ, সুখ, দুখ, সব আজি হতে।
ভবিষ্যতের স্বাধীন-পতাকা উড়িবে যে দিন জয়-রথে
আমরা হাসিব দূর তারা-লোকে ওগো তোমাদের সুখ স্মরি’॥
- ভাবসন্ধান: অন্যায়, শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে সংগ্রাম করে সত্য, ন্যায়, স্বাধীনতা ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা। কারবালা, মুসা, ইবরাহিম, আব্বাস প্রমুখ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে কবি দেখিয়েছেন যে, সত্যের সংগ্রাম কখনো থেমে থাকে না। আত্মত্যাগ, আশা, মানবপ্রেম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আদর্শ রেখে যাওয়াই এই গানের মূল শিক্ষা।
এই ভাবাদর্শের আলোকে- এই গানে কবি সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, মানবমুক্তি এবং ভবিষ্যতের আশাবাদের এক মহাকাব্যিক চিত্র অঙ্কন করেছেন।
ইসলামের ইতিহাসে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা ও চরিত্র—কারবালা, ফরাত, আব্বাস, ফেরাউন, মুসা, নমরুদ, ইবরাহিম প্রভৃতিকে তিনি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এগুলোর মাধ্যমে কবি কেবল ধর্মীয় ইতিহাস বর্ণনা করেননি; বরং অন্যায়, শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে চিরন্তন মানবসংগ্রামের কথা প্রকাশ করেছেন।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, দুর্দিনের কালো মেঘ ও বজ্রপাতকে ভয় না পেয়ে তাঁরা তা মাথায় তুলে নিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁরা বিপদ, দুর্যোগ ও সংগ্রামকে সাহসের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। ঝড়-বিক্ষুব্ধ রাতেও তাঁরা ভাঙা তরী নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। এখানে ভাঙা তরী সীমিত শক্তি বা প্রতিকূল অবস্থার প্রতীক, আর ঝড়ের বন্ধু বলতে বিপদের মধ্যেও অবিচল সাহসিকতাকে বোঝানো হয়েছে।
এরপর কবি বলেন, তাঁদের পথচলার দিশা কখনো সহজ নয়; বিদ্যুতের ক্ষণিক ঝলকানির মতো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই তাঁরা পথ খুঁজে নেন। তাঁদের পদচারণায় মরুভূমিতেও নতুন অঙ্কুর জন্ম নেয়, অর্থাৎ তাঁদের কর্ম মানুষের মধ্যে নতুন আশা ও জীবনের সঞ্চার করে। এমনকি তাঁদের আহ্বানে গোরস্থানের অন্ধকারেও প্রাণ জেগে ওঠে—এটি মৃতপ্রায় সমাজে নতুন চেতনার সঞ্চারের রূপক। তাঁরা প্রদীপের শিখার মতো ঘরে ঘরে আলো ছড়িয়ে দেন, অর্থাৎ অজ্ঞতা ও হতাশা দূর করে জ্ঞান, সাহস ও মুক্তির বার্তা পৌঁছে দেন।
পরবর্তী স্তবকে কবি কারবালার প্রতীক ব্যবহার করেছেন। ফরাত নদী এখানে জীবনের প্রয়োজনীয় অধিকার ও ন্যায়ের প্রতীক, আর কারবালার তৃষ্ণা নিপীড়িত মানুষের দুর্দশার প্রতীক। ইয়াজিদের সেনা দ্বারা অত্যাচারী শক্তিকে বোঝানো হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে তাঁরা হযরত আব্বাস (রা.)-এর মতো আত্মত্যাগ করে মানুষের জন্য জীবনরক্ষার পানি বয়ে আনেন। অর্থাৎ তাঁরা বিপদের মধ্যেও মানবসেবার দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর কবি ফেরাউন ও মুসা এবং নমরুদ ও ইবরাহিম-এর কাহিনিকে অন্যায় ও সত্যের চিরন্তন সংঘর্ষের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যখনই কোনো অত্যাচারী সত্যকে ধ্বংস করতে চায়, তখনই সত্যের শক্তি সাগরের ঢেউয়ের মতো জেগে ওঠে এবং অত্যাচারকে পরাজিত করে। আবার ইবরাহিমকে আগুনে নিক্ষেপের ঘটনাকে স্মরণ করে কবি বলেন, তাঁরা সেই আগুনকেও ফুলে-ফলে ভরে দেন। অর্থাৎ অত্যাচার ও নির্যাতনও তাঁদের আদর্শকে ধ্বংস করতে পারে না; বরং তা আরও মহিমান্বিত করে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি নিজেদের পরিচয় দেন আশার দূত হিসেবে। তাঁরা ভয়ভীতিতে আচ্ছন্ন সমাজে সাহসের গান শোনান, জীর্ণ ও ক্লান্ত মানুষকে নতুন যৌবন ও উদ্যমে জাগিয়ে তোলেন। তাঁদের আশার আলোয় দুঃখ ও হতাশার অন্ধকার দূর হয়ে যায়। তাঁরা ঝড়ের রাতেও মশাল জ্বালিয়ে পথ আলোকিত করেন—অর্থাৎ সংকটের সময় মানুষের পথপ্রদর্শক হন।
গানের শেষাংশে কবি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। নতুন দিনের যাত্রীরা যাতে স্বাধীনতা, ন্যায় ও মানবমর্যাদার পথে এগিয়ে যেতে পারে, সে জন্য তাঁরা নিজেদের প্রাণ, সুখ ও দুঃখ উৎসর্গ করে যাচ্ছেন। একদিন যখন স্বাধীনতার পতাকা বিজয়ের রথে উড়বে, তখন তাঁরা হয়তো পৃথিবীতে থাকবেন না; কিন্তু দূর নক্ষত্রলোক থেকে ভবিষ্যৎ মানুষের সুখ ও সাফল্য দেখে আনন্দিত হবেন। এখানে কবি আত্মত্যাগী সংগ্রামীদের অমর আদর্শের কথা স্মরণ করিয়েছেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। 'ছাত্র' পত্রিকার 'শ্রাবণ
১৩৩৬ বঙ্গাব্দ' সংখ্যায় গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩০ বৎসর
২ মাস।
- গ্রন্থ:
-
নজরুল গীতিকা
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ, ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০।
জাতীয় সঙ্গীত। ৪। ইমন-বেলাওল-তেওরা। পৃষ্ঠা ২২-২৩ ]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা
ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭] নজরুল গীতিকা। জাতীয় সংগীত। ২০। ইমন-বেলাওল-তেওরা। পৃষ্ঠা: ১৮৩-১৮৪]
- সন্ধ্যা
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০।
জাতীয় সঙ্গীত। ৪। তরুণের গান]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা মে ২০১১।
তরুণের গান।। পৃষ্ঠা: ৬৪-৬৫]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ
(নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ, ১৪১৭/ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)। গান সংখ্য ১৮২৭।
- পত্রিকা
- ছাত্র: [শ্রাবণ ১৩৩৬। জুলাই-আগষ্ট ১৯২৯। তরুণের গান]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। উদ্দীপনা