বিষয়: নজরুলসঙ্গীত
শিরোনাম: আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন
আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন
খুঁজি তারে আমি আপনায়॥
আমি
শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি
আমারি তিয়াসী বাসনায়॥
আমারি মনের তৃষিত আকাশে
কাঁদে সে চাতক আকুল পিয়াসে,
কভু সে চকোর সুধা-চোর আসে
নিশীথে স্বপনে জোছনায়॥
আমার মনের পিয়াল তমালে হেরি তারে স্নেহ-মেঘ-শ্যাম,
অশনি-আলোকে হেরি তারে থির-বিজুলী-উজল অভিরাম।
আমারি রচিত কাননে বসিয়া
পরানু পিয়ারে মালিকা রচিয়া
সে-মালা সহসা দেখিনু জাগিয়া
আপনারি গলে দোলে হায়॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে কবি মানুষের অন্তর্লোকে বিরাজমান এক পরম আপন সত্তার সন্ধান প্রকাশ করেছেন। এই ‘আপন যে জন’ বাহিরের কোনো সাধারণ প্রিয় ব্যক্তি নন; তিনি এমন এক প্রিয়তম, যিনি মানুষের নিজের থেকেও আপন। কবি তাঁকে বাইরে খুঁজে বেড়ালেও ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেন যে, যাঁর সন্ধানে তিনি ব্যাকুল, তিনি আসলে তাঁর নিজের অন্তরের মধ্যেই বিরাজমান।
কবির হৃদয়ে এক অদৃশ্য প্রিয়জনের জন্য গভীর আকাঙ্ক্ষা জেগে আছে। তিনি যেন শুনতে পান সেই প্রিয়জনের চরণের ধ্বনি, কিন্তু সেই ধ্বনি বাহ্যজগতের নয়—তা তাঁর নিজেরই তিয়াসী বাসনা, অর্থাৎ তৃষ্ণার্ত আকাঙ্ক্ষার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়। যাঁকে তিনি খুঁজছেন, তাঁর উপস্থিতির অনুভব আসলে তাঁর নিজের অন্তরের আকুলতার মধ্যেই প্রকাশিত হচ্ছে।
‘আমারি মনের তৃষিত আকাশে / কাঁদে সে চাতক আকুল পিয়াসে’—এখানে চাতক পাখি কবির অতৃপ্ত আত্মার প্রতীক। চাতক যেমন আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বাতী-জলের জন্য ব্যাকুল থাকে, তেমনি কবির মনও সেই পরম প্রিয়ের সান্নিধ্যের জন্য তৃষ্ণার্ত। আবার কখনো তিনি চকোরের প্রতীক ব্যবহার করেছেন। চকোর যেমন জোছনার সুধা পান করার আকাঙ্ক্ষায় চন্দ্রালোকের দিকে চেয়ে থাকে, তেমনি কবির স্বপ্নলোকেও সেই প্রিয়জন নিশীথের জোছনায় এক অপার্থিব রূপ নিয়ে আবির্ভূত হন। চাতকের পিপাসা ও চকোরের সুধালিপ্সা—এই দুই প্রতীকের মাধ্যমে প্রিয়জনকে পাওয়ার জন্য আত্মার আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি প্রকৃতির নানা রূপের মধ্যে তাঁর সেই প্রিয়তমকে প্রত্যক্ষ করেন। ‘মনের পিয়াল তমালে’ তিনি তাঁকে দেখেন ‘স্নেহ-মেঘ-শ্যাম’ রূপে—অর্থাৎ স্নেহ ও মমতায় সজল, শ্যামল মেঘের মতো গভীর ও স্নিগ্ধ। আবার অশনি-আলোকের ঝলকে তিনি তাঁকে দেখেন ‘থির-বিজুলী-উজল অভিরাম’ রূপে। এখানে মেঘ ও বিদ্যুৎ, অন্ধকার ও আলো—দুই বিপরীত প্রকৃতির রূপের মধ্যেও সেই একই প্রিয় সত্তার প্রকাশ ঘটেছে। অর্থাৎ তিনি সর্বত্র আছেন এবং নানা রূপে নিজেকে অনুভব করান।
গানের শেষ স্তবকটি এর ভাবের সবচেয়ে গভীর উপলব্ধি বহন করে। ধ্যানমগ্ন কবি
আধ্যাত্মিক ভুবনে পরমসত্তার জন্য যে ভক্তি ও প্রেমের মালা গাঁথেন, ধ্যান শেষে দেখেন সে মালা পুরমপুরুষ তাঁর গলাতে পরিয়ে দিয়েছেন। কবির অনুভবে জেগে উঠে নিজের চেয়ে আপন যে জন, সেই পরম পুরুষ এবং তাঁর জীবাত্মার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
এই প্রতীকী উপলব্ধির মধ্য দিয়ে তাঁর সন্ধানের পরিসমাপ্তি ঘটে।
এর অর্থ, কবি যাঁকে বাইরে খুঁজছিলেন, তিনি আসলে তাঁর নিজের মধ্যেই ছিলেন। যে প্রিয়তমকে তিনি ‘আপনার চেয়েও আপন’ বলে অনুভব করেছেন, তাঁর সঙ্গে কবির আত্মার কোনো বিচ্ছেদ নেই। নিজের অন্তরাত্মা, চিরসঙ্গী পরমসত্তা কিংবা আত্মার গভীরতম প্রিয় রূপ—যেভাবেই তাঁকে ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত কবি উপলব্ধি করেন যে অন্বেষক এবং অন্বিষ্ট—উভয়েই একই অস্তিত্বের মধ্যে মিলিত।
-
রচনাকাল ও স্থান:
আষাঢ় মাসে কলকাতায় থাকাকালে এই গানটি রচনা করেছিলেন। গানটি ১৩৩২ বঙ্গাব্দের প্রকাশিত 'ছায়ানট' কাব্যগ্রন্থে 'আপন-পিয়াসী' শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। গানটির নিচে রচনার স্থান ও তারিখ উল্লেখ আছে- 'কলিকাতা/আষাঢ় ১৩৩১'। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ২৫ বৎসর ১ মাস।
-
গ্রন্থ:
- ছায়ানট
- প্রথম সংস্করণ [বর্মণ পাবলিশিং হাউস, ২২
সেপ্টেম্বর ১৯২৫ আশ্বিন ১৩৩২] শিরোনাম:
আপন পিয়াসী।
পৃষ্ঠা: ৬১।
- নজরুল রচনাবলী জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, দ্বিতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, মে ২০১১।
ছায়ানট। শিরোনাম:
আপন পিয়াসী।
পৃষ্ঠা৩৭]
-
নজরুল গীতিকা
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০।
টপ্পা।৪।
শাওন-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা ৮৬]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড
[বাংলা একাডেমী, ঢাকা ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭] ৭৫।
নজরুল গীতিকা। টপ্পা।
শাওন-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা:
২২১]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৮৫২
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ, পরমাত্মা। অন্বেষণ