বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: নীলবর্ণা নীলোৎপল-নয়না শাকম্ভরী।
নীলবর্ণা নীলোৎপল-নয়না শাকম্ভরী।
শত চোখে শত নীল পদ্ম ফুটিয়াছে মরি, মরি।
দয়াময়ী মার কর-পল্লবে
ফল-মূল ফুল-পল্লব শোভে,
ক্ষুধা তৃষ্ণা ও জরা নাশিনী মহাদেবী, বিষহরি॥
দারুণ দৈন্য দুর্ভিক্ষে ও অনাবৃষ্টির কালে
(এই) জননী আমার শতাক্ষীরূপে শস্যের বৃষ্টি ঢাল।
নাশি’ দুর্গম দৈত্যে জননী
হলেন দুর্গা দুষ্ট-দমনী,
ইনিই পার্বতী বিশোকা চণ্ডী, কালী পরমেশ্বরী॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে দেবী শাকম্ভরীর করুণাময়, জীবনদায়িনী ও বিশ্বজননী রূপের বন্দনা করা হয়েছে।
গানের শুরুতে দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে কবি দেবীকে নীলবর্ণা ও
নীলোৎপল-নয়না নামে অভিহিত করা হয়েছে। শত চক্ষুর অধিকারিণী দেবীর শতাক্ষী রূপের
অনুরূপ হিসেবে তাঁকেও শতাক্ষী স্থানে বাসনাও হয়েছে। এখানে কবি রূপকল্পে দেবীর অসংখ্য করুণাময় দৃষ্টিকে- শত
শত নীল পদ্মের প্রস্ফুটনের মতো
বিশ্বজগতে শান্তি ও মঙ্গল বর্ষণের উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর করপল্লবে ফল, ফুল, শস্য ও পল্লব শোভা
পাচ্ছে- এটি দেবীর শাকম্ভরী রূপের প্রতীক। এই রূপে তিনি
বিশ্ববাসীর অন্নদাত্রী, পুষ্টিদাত্রী ও জীবনরক্ষাকারিণী। তিনি ক্ষুধা, তৃষ্ণা,
জরা ও বিষের দুঃখ দূর করেন; তাই তিনি মহাদেবী ও বিষহরী।
গানের পরবর্তী অংশে দেবীর শতাক্ষী রূপের তাৎপর্য উপস্থাপন করা হয়েছে। যখন পৃথিবী দুর্ভিক্ষ, অনাবৃষ্টি ও চরম দারিদ্র্যে বিপর্যস্ত হয়, তখন জননী তাঁর শত শত করুণাময় নয়ন থেকে অশ্রুধারা বর্ষণ করে বৃষ্টি নামান এবং পৃথিবীকে পুনরায় শস্যশ্যামলা করে তোলেন। এই কাহিনির মাধ্যমে দেবীর অপরিসীম মাতৃস্নেহ, জীবরক্ষার অঙ্গীকার এবং বিশ্বপালনশক্তির পরিচয় ফুটে উঠেছে।
গানের শেষাংশে কবি এই জীবনদায়িনী জননীই আবার অশুভ শক্তির বিনাশে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেন,
তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন- নানা পৌরণিক কথন অবলম্বনে। তিনি দুর্গম নামক অসুরকে বিনাশ করে তিনি দুর্গা নামে খ্যাত হয়েছিলেন। তিনিই দুষ্টদমনী, পার্বতী, বিশোকা, চণ্ডী, কালী এবং পরমেশ্বরী। অর্থাৎ, সৃষ্টির পালন ও সংহার—উভয় শক্তিই একই আদ্যাশক্তির বিভিন্ন প্রকাশ।
অর্থাৎ- তিনি যেমন স্নেহময়ী মা, তেমনি ধর্মরক্ষার জন্য ভয়ংকর মহাশক্তিও।
টীকা:
দেবীভাগবত পুরাণ এবং
দেবী মাহাত্ম্য-এর উত্তরাংশ (পরবর্তী
শাক্ত ঐতিহ্যে) বর্ণিত আছে যে,
দুর্গম
নামে এক অসুর বেদের অধিকার লাভ করে যজ্ঞ ও ধর্মকর্ম বন্ধ করে দেয়। ফলে দেবতারা
দুর্বল হয়ে পড়েন এবং পৃথিবীতে দীর্ঘকাল অনাবৃষ্টি দেখা দেয়। নদী-নালা শুকিয়ে
যায়, শস্য উৎপাদন বন্ধ হয়, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী চরম দুর্ভিক্ষে পড়ে। তখন
দেবী অসীম করুণায়
শতাক্ষী
রূপে আবির্ভূত হন। কথিত আছে, জীবের দুঃখ দেখে তাঁর অসংখ্য নয়ন থেকে অশ্রুধারা
প্রবাহিত হয়। সেই অশ্রুই বৃষ্টিতে পরিণত হয়ে পৃথিবীকে সজীব করে তোলে। এরপর
দেবী নিজের দেহ থেকে নানারকম শাক, ফল, মূল, লতা ও শস্য উৎপন্ন করে ক্ষুধার্ত
জীবজগতের আহারের ব্যবস্থা করেন। এই কারণে তিনি
শাকম্ভরী
নামে পরিচিত হন।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের
২৭ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার
১৩ মাঘ ১৩৪৪), কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত 'দেবস্তুতি' আলেখ্যের সাথে এই গানটি
প্রচারিত হয়েছিল। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৮ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৯৮৪।
- দেবীস্তুতি। [নজরুল রচনাবলী জন্মশতবর্ষ সংকলন। অষ্টম খণ্ড (১২ ভাদ্র ১৩১৫, ২৭শে আগষ্ট ২০০৮)। বাংলা
একাডেমী ঢাকা। শতাক্ষী। পৃষ্ঠা: ২৫২-২৫৩]
- পত্রিকা: বেতার জগৎ
[১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮
খ্রিষ্টাব্দ (রবিবার, ২ মাঘ ১৩৪৪)]। 'আমাদের কথা' বিভাগে।
[সূত্র:
বেতার জগৎ। ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা। প্রচ্ছদ ও
পৃষ্ঠা:৪৫।
- বেতার:
- দেবীস্তুতি
- প্রথম প্রচার। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৭ জানুয়ারি ১৯৩৮ (বৃহস্পতিবার
১৩ মাঘ ১৩৪৪)। শিল্পী: গীতা মিত্র
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা। প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠা:৪৫।
The Indian listener. Vol III. No II, (7th January, 1938) Page 121
দ্বিতীয় প্রচার। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৫ জুলাই ১৯৩৯ (মঙ্গলবার, ৯ শ্রাবণ ১৩৪৬)।
[সূত্র: বেতার জগৎ-পত্রিকার ৯ম বর্ষ ১২শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা ৫৩৩]
স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা (শাকম্ভরী)।
বন্দনা
- সুরাঙ্গ:
রাগাশ্রয়ী