বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বেণু বাজাই -বাজাই হৃদয় বনে
বেণু বাজাই -বাজাই
হৃদয় বনে।
(বৃন্দাবনে নয়, হৃদয়-বনে গো)
প্রেমে গোলক হতে ভূলোকে আসি নেমে
খেলি প্রেমিকের সনে (লুকোচুরি গো)।
মা যশোদা স্নেহ-ডোরে বাঁধিয়া রাখে মোরে,
প্রেমের গুণে কাঁদি রাধিয়া পায় ধরে-
রাখাল সেজে আমি গোঠে যাই গো-চারণে।
(প্রীতিতে-গলে মন বৈকুণ্ঠ ফেলে আমি গোঠেই যাই গো-চারণে)॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের নিজ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাঁর
স্বরূপ উপস্থাপন করেছেন। এখানে কৃষ্ণ নিজেই জানিয়ে দিচ্ছেন যে, তাঁর প্রকৃত আবাস কেবল দূরবর্তী গোলক বা বৃন্দাবনে নয়; বরং ভক্তের প্রেমময় হৃদয়েই। ভক্তির শক্তিতে
তিনি নিজেকে মানুষের কাছে নিবেদন করেন এবং প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে লীলায় অংশ নেন।
গানের শুরুতেই কৃষ্ণ বলেন, তিনি বৃন্দাবনে নয়, ভক্তের হৃদয়-বনে বাঁশি বাজান। অর্থাৎ
কৃষ্ণের সত্যিকার আবির্ভাব ঘটে সেই হৃদয়ে, যা প্রেম, ভক্তি ও আত্মসমর্পণে পূর্ণ। তাঁর বাঁশির সুর কোনো নির্দিষ্ট স্থানের নয়; তা ভক্তের অন্তরেই অনুরণিত হয়।
এরপর তিনি বলেন, প্রেমের আকর্ষণে গোলকধাম ত্যাগ করে ভূলোকে নেমে আসেন এবং ভক্তদের সঙ্গে
প্রেমের লুকোচুরি লীলা মেতে ওঠেচ। এখানে কৃষ্ণ অবতারের কারণ হিসেবে কেবল ধর্মরক্ষা নয়, ভক্তের ভালোবাসার আহ্বানকেও তুলে ধরা হয়েছে। ভক্তপ্রেমই তাঁকে স্বর্গীয় আবাস ছেড়ে মানুষের মধ্যে আসতে বাধ্য করে
তাঁকে।
গানের পরবর্তী অংশে কৃষ্ণ তাঁর বাল্যলীলার কথা স্মরণ করেন। মা যশোদার স্নেহের ডোরে তিনি বাঁধা পড়েন, আবার রাধার প্রেমের টানে তাঁর চোখে অশ্রু আসে। অর্থাৎ মাতৃস্নেহ ও প্রেমভক্তি- উভয় বন্ধনই
তাঁর স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেন। সর্বশক্তিমান হয়েও তিনি ভক্তের ভালোবাসার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন
সাধারণ মানুষের মতো।
অবশেষে কৃষ্ণ বলেন, তিনি রাখালের বেশে গোষ্ঠে গিয়ে গরু চরান। এমনকি প্রেমের টানে বৈকুণ্ঠের ঐশ্বর্যও ত্যাগ করে সেই সাধারণ রাখালজীবনই তাঁর প্রিয় হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে,
কৃষ্ণের কাছেও বৈভব বা মহিমার চেয়ে ভক্তের নির্মল প্রেমই অধিক মূল্যবান। তিনি ঐশ্বর্যের দেবতা হয়ে দূরে অবস্থান করতে চান না; বরং সাধারণ মানুষের আপনজন হয়ে তাদের জীবনের সঙ্গে একাত্ম হতে চান।
অতএব, এই গানে ভক্তির সর্বোচ্চ মাহাত্ম্য, ঈশ্বরের ভক্তপ্রেমে আত্মসমর্পণ, এবং মানুষের হৃদয়ই যে তাঁর প্রকৃত বৃন্দাবন- এই গভীর আধ্যাত্মিক সত্য অত্যন্ত সুমধুর ও কাব্যিক ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৭
ডিসেম্বর তারিখে (শনিবার ২১ অগ্রহায়ণ ১৩৪৭),
কলকাতার
মিনার্ভা থিয়েটারে
দেবেন্দ্রনাথ রাহা রচিত 'অর্জুন বিজয়'
নামক নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। উক্ত নাটকে এই গানটি পরিবেশিত
হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বছর ৬ মাস।
- মঞ্চ:
অর্জুন-বিজয়
(নাটক)। নাট্যকার দেবেন্দ্র রাহা। পরিচালনা শরৎচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়। প্রথম মঞ্চস্থ-
মিনার্ভা থিয়েটার [৭ ডিসেম্বর ১৯৪০ (শনিবার,
২১ অগ্রহায়ণ ১৩৪৭)]। শিল্পী:
শিল্পী: শ্রীমতী ইভা
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ
১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ২০৩২ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬১১।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। লীলা