বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম : মাকে আমার দেখেছে যে
মাকে আমার দেখেছে যে ভাইকে সে কি ঘৃণা
করে।
ত্রিলোক-বাসী প্রিয় তাহার পরান কাঁদে সবার তরে॥
নাই জাতি ভেদ উচ্চ-নীচের জ্ঞান
তাহার কাছে সকলে সমান,
দেখলে গুহক চণ্ডালে সে রামের মত বক্ষে ধরে॥
মা আমাদের মহামায়া পরমা প্রকৃতি
পিতা মোদের পরমাত্মা রে তাই সবার সাথে প্রীতি
মোদের সবার সাথে প্রীতি।
সন্তানে তাঁর ঘৃণা করে মাকে করে পূজা
সে পূজা তার নেয় না কভু, নেয় না দশভূজা।
(মোরা) এই ভেদ-জ্ঞান ভুলব যেদিন
মা সেই দিন আসবে ঘরে॥
- ভাবসন্ধান: সর্বজনীন মানবপ্রেম, জাতিভেদ-বর্ণভেদ ও উচ্চ-নীচের বিভাজন প্রত্যাখ্যান এবং সকল মানুষকে একই বিশ্বজননীর সন্তানরূপে গ্রহণ করা। এখানে দেবীপূজা কেবল আচার বা প্রতিমাপূজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কবির কাছে মায়ের প্রকৃত পূজা হলো তাঁর সকল সন্তানকে ভালোবাসা।
'মাকে আমার দেখেছে যে ভাইকে সে কি ঘৃণা করে' গানটির শুরুর এই পঙ্ক্তির মধ্যেই গানটির মূল দর্শন নিহিত। যিনি সত্যিকার অর্থে বিশ্বজননীকে উপলব্ধি করেছেন, তিনি তাঁর কোনো সন্তানকে ঘৃণা করতে পারেন না। কারণ সকল মানুষই একই মায়ের সন্তান।
তাই তাঁর হৃদয় কেবল নিজের পরিবার, জাতি বা সম্প্রদায়ের জন্য নয়- ত্রিলোকবাসী সকল প্রাণীর জন্য কাঁদে। তাঁর ভালোবাসা ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করে সর্বজনীন হয়ে ওঠে।
গানের পরবর্তী অংশে কবি বলেছেন- 'নাই জাতি ভেদ উচ্চ-নীচের জ্ঞান,
তাহার কাছে সকলে সমান।' এখানে একটি সুস্পষ্ট মানবতাবাদী আদর্শ প্রকাশিত হয়েছে। মায়ের দৃষ্টিতে কেউ উচ্চ নয়, কেউ নীচ নয়; জন্ম, জাতি, বর্ণ বা সামাজিক অবস্থান মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে না।
পরবর্তী পঙ্ক্তিতে- 'দেখলে গুহক চণ্ডালে সে রামের মত বক্ষে ধরে'। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, যিনি মায়ের সত্য উপলব্ধি করেছেন, তিনি সমাজে অবহেলিত বা তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষকেও পরম আপনজনের মতো বুকে টেনে নেন। গুহক ও চণ্ডাল এখানে সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষের প্রতীক। তাঁদের মধ্যেও একই পরমসত্তার সন্তানকে দেখতে পারাই প্রকৃত ভক্তির পরিচয়।
'মা আমাদের মহামায়া পরমা প্রকৃতি,
পিতা মোদের পরমাত্মা'- এই পঙ্ক্তিতে এক গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বভ্রাতৃত্বের ধারণা প্রকাশিত হয়েছে। মহামায়া বা পরমা প্রকৃতি সকলের জননী, আর পরমাত্মা সকলের পিতা। অতএব সমগ্র মানবজাতি একই পরিবারের সদস্য।
এই উপলব্ধি থেকেই কবি বলেছেন- 'তাই সবার সাথে প্রীতি।' অর্থাৎ সকলের প্রতি ভালোবাসা কোনো দয়া বা সামাজিক কর্তব্য মাত্র নয়; বরং একই উৎস থেকে জন্ম নেওয়া সকলের প্রতি স্বাভাবিক আত্মীয়তার অনুভূতি।
মানুষের প্রতি ঘৃণা রেখে মায়ের পূজা অর্থহীন। এই ভাবাদর্শে কবি বলেছেন- 'সন্তানে তাঁর ঘৃণা করে মাকে করে পূজা,
সে পূজা তার নেয় না কভু, নেয় না দশভূজা।'
যে ব্যক্তি মায়ের সন্তানদের ঘৃণা করে অথচ দেবীর পূজা করে, তার পূজা প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ মাকে ভালোবাসার অর্থ তাঁর সন্তানদেরও ভালোবাসা।
এখানে কবি ধর্মাচারের এক গভীর সমালোচনা করেছেন। শুধু ফুল, ধূপ, মন্ত্র ও আচার দিয়ে দেবীকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়, যদি মানুষের হৃদয়ে ঘৃণা, জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বোধ থেকে যায়। প্রকৃত পূজা হলো মানুষের মধ্যে মায়ের উপস্থিতি অনুভব করা।
তাই কবি ভাবেন- 'এই ভেদ-জ্ঞান ভুলব যেদিন,
মা সেই দিন আসবে ঘরে।' এখানে 'মায়ের ঘরে আসা' শুধু দুর্গাপূজার সময় প্রতিমার আগমন নয়। এর গভীর অর্থ হলো- মানুষের হৃদয়ে যখন জাতি, বর্ণ, ধর্ম, উচ্চ-নীচ ও সামাজিক বিভেদের প্রাচীর ভেঙে যাবে, তখনই সত্যিকার অর্থে মাতৃশক্তির আবির্ভাব ঘটবে।
অর্থাৎ মায়ের প্রকৃত আগমন ঘটবে মানুষের চেতনায়, ভালোবাসায় ও মানবিক আচরণে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জুলাই (৮ শ্রাবণ
১৩৪৭) কলকাতা বেতারকেন্দ্র থেকে 'এস মা' শ্যামা বিষয়ক গীতিআলেখ্য প্রচারিত
হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ২ মাস।
- রেকর্ড: মেগাফোন [সেপ্টেম্বর ১৯৪০
(ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৭)
]। জেএনজি ৫৫০৫। শিল্পী:
ভবানী দাস। সুর: কাজী নজরুল ইসলাম
- গ্রন্থ:
নজরুল-সংগীত সংগ্রহ
[রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল
ইনস্টিটিউট।
তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮।
গান ২০৬৭। পৃষ্ঠা ৬২৩]
-
বেতার: এস মা
(শ্যামা-সঙ্গীত বৈচিত্র্য)
- প্রথম প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র ক।
চতুর্থ অধিবেশন। ২৪ জুলাই ১৯৪০ (বুধবার ৮ শ্রাবণ ১৩৪৭)। সন্ধ্যা ৮-৮.৩৯টা।
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ ১৪শ সংখ্যায়। ১৬ জুলাই ১৯৪০। পৃষ্ঠা ৭৬৮]
- The Indian Listener, Vol, V No.1
page 1081]
দ্বিতীয় প্রচার: কলকাতা
বেতারকেন্দ্র-ক। তৃতীয় অধিবেশন। ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ (শনিবার ২৬ মাঘ ১৩৪৭)।
প্রচার সময়: রাত ৮.০০-৮-৩৯টা।
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১২শ বর্ষ ৩য় সংখ্যা। ১ ফেব্রুয়ারি,
১৯৪১। পৃষ্ঠা: ১৫২
- The Indian Listener, Vol, VI No 3
page 59]
তৃতীয় প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র ক।
তৃতীয় অধিবেশন। ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ (বৃহস্পতিবার ৯ আশ্বিন। ১৩৪৮)। প্রচার সময়: রাত
৭.৫৫-৮.২৯টা
[সূত্র:
The Indian Listener, Vol, V No.1
page 71]
স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
সালাউদ্দিন আহ্মেদ
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, পঁচিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ভাদ্র, ১৪১২/আগস্ট
২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ] ২২ সংখ্যক গান।
[নমুনা]
পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা।
মাতৃরূপা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান
- তাল:
দাদরা
- গ্রহস্বর: পা