বিষয়:
নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বন্ধু আমার! থেকে থেকে কোন্ সুদূরের বিজন পুরে
বন্ধু আমার! থেকে থেকে কোন্ সুদূরের বিজন পুরে
ডাক দিয়ে যাও ব্যথার সুরে?
আমার অনেক দুখের পথের বাসা বারে বারে ঝড়ে উড়ে,
ঘর-ছাড়া তাই বেড়াই ঘুরে॥
তোমার বাঁশীর উদাস কাঁদন
শিথিল করে সকল বাঁধন
কাজ হ'ল তাই পথিক সাধন,
খুঁজে ফেরা পথ-বঁধূরে,
ঘুরে' ঘুরে' দূরে দূরে॥
হে মোর প্রিয়! তোমার বুকে একটুকুতেই হিংসা জাগে,
তাই তো পথে হয় না থামা-তোমার ব্যথা বক্ষে লাগে!
বাঁধতে বাসা পথের পাশে
তোমার চোখে কান্না আসে
উত্তরী বায় ভেজা ঘাসে
শ্বাস ওঠে আর নয়ন বুঝে,
বন্ধু, তোমার সুরে সুরে॥
- ভাবার্থ: এই গানে মানুষের অন্তরের চিরন্তন পথিকসত্তা, পরমপ্রিয়ের আহ্বান এবং জাগতিক বন্ধন অতিক্রম করে অনন্তের পথে যাত্রার আকাঙ্ক্ষা গভীর আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনায় প্রকাশিত হয়েছে। এখানে
'বন্ধু' কেবল কোনো মানববন্ধু নন; তিনি সেই চিরসঙ্গী, পরমপ্রিয় বা পরমসত্তা, যিনি মানুষের হৃদয়ের গভীর থেকে তাকে অনন্ত সত্যের পথে আহ্বান জানিয়ে চলেন। তাঁর সেই আহ্বান কখনও আনন্দের নয়, বরং এক মধুর বেদনার সুরে উচ্চারিত হয়, যা মানুষের হৃদয়ে অস্থিরতা ও অনন্তের পিপাসা জাগিয়ে তোলে।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, সেই প্রিয় বন্ধু বারবার কোনো সুদূর, নির্জন লোক থেকে তাঁকে ব্যথাভরা সুরে ডাক দেন। সেই আহ্বান এতই গভীর যে, কবির পক্ষে কোনো স্থানে স্থির হয়ে থাকা সম্ভব হয় না। জীবনের বহু দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা তাঁর সংসার, আশা ও আশ্রয় বারবার ভেঙে যায়। ফলে তিনি এক চিরপথিকের মতো ঘরহারা হয়ে অনবরত সেই অদৃশ্য প্রিয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান। এখানে ঘর ভেঙে যাওয়া বাহ্যিক জীবনের বিপর্যয়ের প্রতীক হলেও, আধ্যাত্মিক অর্থে তা জাগতিক আসক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরমসত্যের পথে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, সেই বন্ধুর বাঁশির উদাস সুর তাঁর জীবনের সমস্ত বন্ধন শিথিল করে দেয়। সংসারের মায়া, স্বার্থ ও নিরাপত্তার আকর্ষণ তখন আর তাঁকে বেঁধে রাখতে পারে না। তাই তাঁর জীবনের একমাত্র সাধনা হয়ে ওঠে পথ চলা—সেই অদেখা পথের সঙ্গী বা পরমপ্রিয়কে খুঁজে বেড়ানো। এই অনুসন্ধান কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের নয়; এটি আত্মার অন্তহীন অভিযাত্রা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ মানুষকে পরমসত্তার আরও নিকটে নিয়ে যায়।
গানের শেষাংশে কবি এক সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, যখনই তিনি পথের ধারে কোনো স্থায়ী আশ্রয় গড়ে তুলতে চান, তখনই সেই প্রিয় বন্ধুর মনে যেন এক ধরনের ঈর্ষা জেগে ওঠে। অর্থাৎ পরমসত্তা চান না যে মানুষ জাগতিক সুখ, ভোগ বা স্থায়িত্বের মোহে আবদ্ধ হয়ে পড়ুক। তাই মানুষের হৃদয়ে আবার অস্থিরতা জাগে, নতুন পথের ডাক আসে। এই
'ঈর্ষা' আসলে ঈশ্বরের একান্ত অধিকারবোধের কাব্যিক প্রকাশ—তিনি ভক্তের হৃদয় সম্পূর্ণরূপে নিজের জন্যই চান।
শেষে কবি উত্তরী বাতাস, ভেজা ঘাস, দীর্ঘশ্বাস ও অশ্রুসজল চোখের চিত্রকল্পের মাধ্যমে সেই বিরহবিধুর যাত্রার আবহ সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতিও যেন সেই চিরন্তন বিচ্ছেদ ও আহ্বানের সুরে সাড়া দিচ্ছে। কবির হৃদয়, প্রকৃতির নিস্তব্ধতা এবং পরমপ্রিয়ের বাঁশির সুর একাকার হয়ে এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির জন্ম দিয়েছে।
-
রচনাকাল: ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে দুর্গাপূজা উপলক্ষে
নবযুগ পত্রিকার অফিস ছুটি হয়ে যায়।
এই ছুটি কাটানোর জন্য অক্টোবরের ১-২ তারিখে
(রবি-সোম, ১৫-১৬ আশ্বিন) নজরুল এবং
মুজাফ্ফর আহমদ
বরিশালে শের-এ-বাংলা
আবুল কাশেম ফজলুল হকের ভাগ্নে ওয়াজির জালী ও ইউসুফ আলীর বাড়িতে
যান। এই সময় এই কবিতটি রচনা
করেছিলেন। কবিতাটিতে সুরারোপিত করে গানে পরিণত করা হয়েছিল।
ছায়ানট' কাব্যগ্রন্থে গানটির রচনার
তারিখ উল্লেখ আছে 'বরিশাল আশ্বিন ১৩২৭' (অক্টোবর-নভেম্বর
১৯২০)। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ২১ বৎসর ৪
মাস।
- পত্রিকা:
মোসলেম ভারত
[কার্তিক ১৩২৭ (অক্টোবর-নভেম্বর ১৯২০)। শিরোনাম গান। লাউনি বারোয়াঁ-তেওড়া ]
-
গ্রন্থ:
- ছায়ানট
প্রথম সংস্করণ [বর্মণ পাবলিশিং হাউস, ২২ সেপ্টেম্বর ১৯২৫ আশ্বিন ১৩৩২। শিরোনাম
'দূরের বন্ধু'।
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২৫৮১]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত সাধারণ। পরমসত্তা। অনুযোগ