মা এলো রে, মা এলো রে, বরষ পরে আপন ছেলে ঘরে
সাত কোটি ভাই বোন মিলিয়া আজি ডাকি আকুল স্বরে (মাগো আনন্দময়ী)
মা এসেছে! মা এসেছে! আকাশ-পাতাল 'পরে
আনন্দ তাই ধরে না যে আজকে থরে থরে
শিউলি ফুলের মত আজ আনন্দ গান করে॥
কমল-মুকুল-শাপ্লা বনে ভ্রমর শোনায় গীতি -
জাগো জাগো, আজকে মোদের আগমনীর তিথি;
জল-তরঙ্গ বেজে ওঠে নদীর বালুচরে॥
বুকের মাঝে বাঁশি বাজে অঝোর কলরোলে,
দূর-প্রবাসী কাজ ভুলে আয় আপন মায়ের কালে;
আজকে পেলাম মাকে যেন কত যুগের পরে॥
- ভাবসন্ধান: মা দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে সন্তানদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান এবং সর্বজনীন আনন্দের প্রকাশ। মা এসেছেন বলে মানুষ ও প্রকৃতি সবাই উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। এই আগমনী গানে দেবী দুর্গা কেবল পূজার দেবী নন- তিনি সকলের আপন মা, যাঁর কাছে দূরে থাকা সন্তানও সব ভেদাভেদ ভুলে ফিরে আসতে চায়। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে মা দুর্গার আগমন উপলক্ষে বাঙালির আনন্দ, আবেগ ও মাতৃমিলনের আকুলতার এক প্রাণবন্ত আগমনী-চিত্র। এক বছর পর মা তাঁর আপন সন্তানদের ঘরে ফিরে এসেছেন- এই সংবাদে চারদিকে আনন্দের জোয়ার উঠেছে। তাই সবাই মিলিত কণ্ঠে আনন্দময়ী মাকে ডেকে উঠেছে- 'মা এলো রে, মা এলো রে।'
এই গানে 'সাত কোটি ভাই-বোন' বলতে কবি তৎকালীন বাংলার অসংখ্য মানুষকে একই মায়ের সন্তানরূপে কল্পনা করেছেন। ধর্ম, জাতি বা সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে সবাই যেন এক মাতৃসন্তানের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে মায়ের আগমনকে স্বাগত জানাচ্ছে। মায়ের আগমনের আনন্দ এত গভীর যে মনে হয়, আকাশ থেকে পাতাল পর্যন্ত সমস্ত জগৎ আনন্দে ভরে উঠেছে।
এই আনন্দ শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; প্রকৃতিও যেন মায়ের আগমনী উৎসবে অংশ নিয়েছে। শিউলি ফুলের শুভ্র সৌন্দর্য ও স্নিগ্ধতা যেন আনন্দের গান হয়ে ফুটে উঠেছে। পদ্মের কুঁড়ি ও শাপলাভরা বনে ভ্রমরের গুঞ্জন যেন ঘোষণা করছে- আজ আগমনীর শুভদিন। নদীর বালুচরে জলতরঙ্গের কলধ্বনিও যেন উৎসবের বাদ্যধ্বনিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ দেবীর আগমনে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান আনন্দের ভাষায় কথা বলছে।
শেষ স্তবকে কবির আবেগ আরও গভীর হয়েছে। বুকের মধ্যে বাঁশির সুরের মতো আনন্দধ্বনি বেজে উঠেছে, যা দূরদেশে থাকা সন্তানদেরও আহ্বান জানাচ্ছে—সব কাজ ভুলে আপন মায়ের কাছে ফিরে এসো। এখানে 'দূর-প্রবাসী' শুধু ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকা মানুষ নয়; মাতৃভূমি, মাতৃস্নেহ বা আপন সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন সকল সন্তানের প্রতীক হিসেবেও ধরা যায়। 'আজকে পেলাম মাকে যেন কত যুগের পরে' -এই পঙ্ক্তিতে দীর্ঘ বিরহের বেদনা এবং পুনর্মিলনের অপরিসীম আনন্দ একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতি বছর মায়ের বিদায়ের পর সন্তানদের যে প্রতীক্ষা জমে থাকে, মায়ের পুনরাগমনে তা আনন্দাশ্রুতে পরিণত হয়।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৩) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ৩০৭০ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৯৪০।
- রেকর্ড
- এইচএমভি [অক্টোবর ১৯৩৬ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৩)]। এইচ. টি. ৭৬।শিল্পী ছিলেন বাংলার ছেলেমেয়ে (ধীরেন দাস, সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় ও সুধীরা সেনগুপ্ত)।
- বেতার : মা এল রে [গীতিনকশা]। রচয়িতা: হিমাংশু দত্ত। কলকাতা বেতারকেন্দ্র-ক। চতুর্থ অধিবেশন। ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪০ [শনিবার, ১২ আশ্বিন ১৩৪৭] সান্ধ্য অনুষ্ঠান। সময়: ৮-৮.৩৯
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ, ১৮শ সংখ্যা। ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪০। পৃষ্ঠা: ১০০২
- [The Indian-listener 1940, Vol V, No 18. page 1429]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- আহসান মুর্শেদ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, চুয়ান্নতম খণ্ড, কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, আশ্বিন ১৪২৮। সেপ্টেম্বর ২০২১] গান সংখ্যা ১৭। পৃষ্ঠা: ৯০-৯৪ [নমুনা]
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- পর্যায়: