বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
ফুলে পুছিনু, 'বল, বল ওরে ফুল!'
ফুলে পুছিনু, 'বল, বল ওরে ফুল!'
কোথা পেলি এ সুরভি, রূপ এ অতুল?
'যার রূপে উজালা দুনিয়া', কহে গুল,
'দিল সেই মোরে এই রূপ এই খোশ্বু।
আল্লাহু আল্লাহু॥
'ওরে কোকিল, কে তোরে দিল এ সুর,
কোথা পেলি পাপিয়া এ কণ্ঠ মধুর?'
কহে কোকিল পাপিয়া, আল্লাহ গফুর,
তাঁরি নাম গাহি 'পিউ পিউ, কুহু কুহু-
আল্লাহু আল্লাহু॥
'ওরে রবি-শশী, ওরে গ্রহ-তারা
কোথা পেলি এ রওশনী জ্যোতি ধারা?'
কহে, 'আমরা তাহারি রূপের ইশারা
মুসা, বেহুঁশ হলো হেরি' যে খুব্রু
আল্লাহু আল্লাহু॥'
যারে আউলিয়া আম্বিয়া ধ্যানে না পায়
কূল-মখলুক যাঁহার মহিমা গায়,
যে নাম নিয়ে এসেছি এই দুনিয়ায়,
নাম নিতে নিতে মরি এই আরজু
আল্লাহু আল্লাহু॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে কবি সমগ্র সৃষ্টিজগতের সৌন্দর্য, সুর, আলো ও অস্তিত্বের একমাত্র উৎস হিসেবে আল্লাহ্কে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ফুল, পাখি, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র- প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন আল্লাহ্র মহিমার সাক্ষ্য বহন করছে। গানটি ইসলামের তাওহিদ (আল্লাহ্র একত্ব), তাঁর সৃষ্টিশক্তি এবং তাঁর স্মরণের মাহাত্ম্যকে কাব্যিক রূপে প্রকাশ করেছে।
গানের সূচনাতে কবি ফুলকে প্রশ্ন করেন- সে কোথা থেকে এমন অতুলনীয় সৌন্দর্য ও মনোমুগ্ধকর সুগন্ধ লাভ করেছে। উত্তরে ফুল জানায়, এই রূপ ও সুগন্ধ তার নিজের নয়; যাঁর অপরূপ সৌন্দর্যে সমগ্র বিশ্ব আলোকিত, সেই আল্লাহ্ই তাকে এই সৌন্দর্য ও সুরভি দান করেছেন। অর্থাৎ প্রকৃতির সকল সৌন্দর্য স্রষ্টার সৌন্দর্যেরই ক্ষুদ্র প্রতিফলন। ফুল তাই নিজের গৌরবের কথা বলে না; বরং তার সমস্ত সৌন্দর্যের কৃতিত্ব আল্লাহ্র প্রতি নিবেদন করে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি কোকিল ও পাপিয়াকে জিজ্ঞাসা করেন, তাদের কণ্ঠে এমন মধুর সুর কে দিয়েছে। পাখিরাও উত্তর দেয়- পরম ক্ষমাশীল আল্লাহ্ই তাদের এই সুমধুর কণ্ঠ দান করেছেন। তাই তাদের প্রতিটি ডাক,
'পিউ পিউ' কিংবা 'কুহু কুহু', প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্রই প্রশংসাগান। এখানে কবি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রকৃতির প্রতিটি ধ্বনি ও সুরের মধ্যেই স্রষ্টার স্মরণ ও বন্দনা নিহিত রয়েছে।
এরপর কবি সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, তারা কোথা থেকে এই অপরিসীম জ্যোতি লাভ করেছে। তারা জানায়, তাদের আলো নিজস্ব নয়; তারা কেবল আল্লাহ্র মহিমা ও সৌন্দর্যের আভাসমাত্র।
এখানে ইসলামী আধ্যাত্মিক ভাবধারার একটি গভীর ধারণা প্রকাশিত হয়েছে—সৃষ্টিজগতের সব আলোই স্রষ্টার নূরের প্রতিফলন। এই প্রসঙ্গে কবি নবী মূসা-এর ঘটনাকে স্মরণ করেছেন। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, নবী মূসা আল্লাহ্র তাজাল্লি বা মহিমার আভাস সহ্য করতে না পেরে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। সেই ঘটনার উল্লেখ করে কবি বোঝাতে চেয়েছেন, আল্লাহ্র প্রকৃত মহিমা মানুষের উপলব্ধির সীমার অনেক ঊর্ধ্বে।
গানের শেষাংশে কবি আল্লাহ্র অসীম মহত্ত্বের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, যাঁকে মহাসাধক আউলিয়া এবং আল্লাহ্র প্রেরিত আম্বিয়া গভীর ধ্যান ও সাধনার পরও সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারেন না, সেই মহান সত্তার মহিমাই সমগ্র সৃষ্টি নিরন্তর গেয়ে চলেছে। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁরই নাম জীবনের আশ্রয়। তাই কবির আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা- তিনি যেন আল্লাহ্র নাম স্মরণ করতেই পৃথিবীতে জীবন অতিবাহিত করেন এবং সেই নাম উচ্চারণ করতেই তাঁর জীবনের সমাপ্তি ঘটে।
-
রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। ১৯৩৪
খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি (পৌষ- মাঘ ১৩৪০) মাসে এইচ.এম.ভি. রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত
হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৭ মাস।
-
গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। গান সংখ্যা
৩১৯।
- রেকর্ডসূত্র:
এইচএমভি।
জানুয়ারি ১৯৩৪ (পৌষ- মাঘ ১৩৪০)। এন ৭১৯১। শিল্পী: কে মল্লিক
[শ্রবণ
নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ ও ব্রহ্মমোহন ঠাকুর। [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, একাদশ খণ্ড (নজরুল ইনস্টিটিউট জুন ১৯৯৭)]
১৭ সংখ্যক গান
[নমুনা]
- সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম ধর্ম। হামদ
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল:
দাদরা
- গ্রহস্বর: পমা