বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: (তুই) মা হ'বি না মেয়ে হ'বি দে মা উমা ব'লে
(তুই) মা হ'বি না মেয়ে
হ'বি দে মা উমা ব'লে
তুই আমারে কোল্ দিবি, না আমিই নেব কোলে॥
মা হয়ে তুই মা গো আমার,
নিবি কি মোর
সংসার-ভার।
দিন ফুরালে আসব ছুটে, মা তোর চরণ-তলে।
(তুই) মুছিয়ে দিবি দুঃখ-জ্বালা
তোর স্নেহ-অঞ্চলে॥
এক হাতে মোর পূজার থালা ভক্তি-শতদল।
(ও মা) আর এক হাতে ক্ষীর নবনী,
কি নিবি তুই বল্।
ওমা কি নিবি তুই বল্।
মেয়ে হ'য়ে মুক্ত-কেশে,
খেলবি ঘরে হেসে হেসে,
ডাকলে মা তুই ছুটে এসে, জড়াবি মোর গলে।
(তোরে) বক্ষে ধ'রে শিব-লোকে যাব আমি চলে॥
- ভাবসন্ধান: ভক্তি, বাৎসল্য ও অন্তরঙ্গতার এক অপূর্ব সমন্বয়ে
উমাকে (দুর্গা) উপস্থাপন লরা হয়েছে। এখানে ঈশ্বর ও ভক্তের সম্পর্ক কোনো
মহিমান্বিত দৈবশক্তির আরাধনার নয়; বরং তা রূপ নিয়েছে ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধনে।
এ বন্ধন কখনো মা ও সন্তানের, আবার কখনো পিতা ও কন্যার স্নেহময় সম্পর্কে।
গানের সূচনায় ভক্ত এক মধুর দ্বৈত প্রশ্ন উত্থাপন করেন- মা হ'বি না মেয়ে হ'বি'। এই পংক্তিতে দেবীকে একইসঙ্গে
'মা' ও 'কন্যা' রূপে কল্পনা করা হয়েছে। এই দ্বৈততা কেবল আবেগের নয়, বরং এক গভীর ভক্তিভাবের প্রকাশ, যেখানে ভক্ত ও
দেবীর সম্পর্কের রূপান্তর ঘটে। কখনো ভক্ত আশ্রয়প্রার্থী সন্তান, আবার কখনো স্নেহময় অভিভাবক হয়ে দেবীকে নিজের কোলে ধারণ করতে চান।
'নিবি কি মোর সংসার-ভার'- এই আবেদনে দৈবশক্তির কাছে ভক্তের আত্মসমর্পণের। ভক্ত
তার সকল দুঃখ-কষ্ট, দায়-দায়িত্ব মায়ের হাতে সমর্পণ করে মুক্তি পেতে চান। দিনান্তে ক্লান্ত ভক্ত যেন মায়ের চরণে আশ্রয়
প্রার্থনা করে বলেন- 'দিন ফুরালে আসব ছুটে, মা তোর চরণ-তলে'। ভক্ত বিশ্বাস করেন, মায়ের স্নেহ-অঞ্চলই তার সকল জ্বালা-যন্ত্রণার পরম প্রশান্তির স্থান।
উপচার ও মমতার দ্বৈততায় ভক্ত বলেন- এক হাতে মোর পূজার থালা ভক্তি-শতদল / আর এক হাতে ক্ষীর নবনী'। এখানে একদিকে শাস্ত্রীয় পূজার উপকরণ, অন্যদিকে কন্যার প্রতি
অপত্য স্নেহের আহার। এর ভিতর দিয়ে উপস্থাপিত হয়, নিছক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে আন্তরিক ভালোবাসা ও বাৎসল্যই
দেবীর কাছে অধিক প্রিয়।
পরবর্তী অংশে- 'মেয়ে হয়ে মুক্ত-কেশে খেলবি ঘরে হেসে হেসে'। এই কল্পনায় দেবীর লীলাময়, সহজ ও মানবিক রূপ উন্মোচিত হয়েছে। তিনি এখানে বিশ্বজননী নন, বরং ঘরের আদুরে মেয়ে, যার উপস্থিতিতে ভক্তের সংসার আনন্দ ও শান্তিতে ভরে ওঠে। ভক্তের আহ্বানে দেবী ছুটে এসে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরেন'। এই চিত্র ভক্তি ও ভালোবাসার এক গভীর অন্তরঙ্গতার প্রকাশ।
গানের শেষাংশে- 'বক্ষে ধ'রে শিব-লোকে যাব আমি চলে'- এই পংক্তিতে ভক্তের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে মুক্তি বা পরমপ্রাপ্তি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; বরং এই স্নেহময় দেবী-রূপকে হৃদয়ে ধারণ করেই ভক্ত সেই চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে চান। ভালোবাসাই এখানে মুক্তির পথ।
মূলত এই গানটি ভক্তির এমন এক রূপচিত্র, যেখানে ঈশ্বরকে দূরের মহাশক্তি হিসেবে নয়, বরং ঘরের আপনজন-
'মা কিংবা কন্যা' হিসেবে অনুভব করা হয়েছে। ভক্তি, বাৎসল্য ও লীলাময়তার এই মেলবন্ধনই গানটির মূল সুর ও সৌন্দর্য।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মে
(বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪) মাসে,
এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি
এই গানের একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। নজরুলের ইসলাম ৩৭ বৎসর ১১ মাস বয়স অন্তের
শেষে গানটি রেকর্ড করা হয়েছিল।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮।
ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৪৯৮ গান।
- রেকর্ড:
এইচএমভি [মে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪)। এন. ৯৮৯৬। শিল্পী:
মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর: নজরুল ইসলাম]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সালাউদ্দিন আহ্মেদ
[নজরুল-সঙ্গীত
স্বরলিপি, অষ্টাদশ খণ্ড। প্রথম সংস্করণ। নজরুল ইন্সটিটিউট আশ্বিন ১৪০৪/অক্টোবর
১৯৯৩। ১৪ সংখ্যক গান] [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। মাতা-কন্যা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয়