বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: পুবালি পবনে বাঁশি বাজে রহি' রহি'
পুবালি পবনে বাঁশি বাজে রহি' রহি'।
ভবনের বধূরে ডাকে বনের বিরহী॥
রতন হিন্দোলা নীপ ডালে বাঁধা',
দোলে দোলে, বলে যেন 'রাধা রাধা'
দুরু দুরু বুকে বাজে গুরু গুরু দেয়া
কেয়া ফুল আনে সোম-সুগন্ধ বহি'॥
চোখে মাখি সজল কাজলের ছলনা
অভিসারিকার সাজে সাজে গোপ-ললনা।
বৃষ্টির টিপ ফেলে ননদীর নয়নে
কদম-কুঞ্জে চলে গোপন চরণে,
মিলন বিরহ শোক তারি বুকে
কাঁদে 'রাধা-শ্যাম রাধা-শ্যাম' কহি'॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরে উদ্বেলিত বৃন্দাবনের বর্ষাকালীন প্রকৃতি, শ্রীরাধার অভিসারের আকুলতা এবং মিলন-বিরহমিশ্রিত প্রেমের অপূর্ব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এখানে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার সহচর হয়ে উঠেছে। মানবহৃদয়ের অনুভূতি এবং প্রকৃতির রূপ একাকার হয়ে এক গভীর মাধুর্যরসের সৃষ্টি করেছে।
গানের শুরুতে কবি দেখিয়েছেন, পুবালি বাতাসে বারবার ভেসে আসে শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুর। সেই সুর গৃহবন্দিনী
গোপ-বধূদেরও অভিসারিণী করে তোলে। কৃষ্ণ এখানে ‘বনের বিরহী’—যিনি নিজেও রাধার বিরহে ব্যাকুল এবং বাঁশির সুরে প্রিয়তমাকে আহ্বান জানাচ্ছেন।
বৈষ্ণব মতে- এই বাঁশি কেবল একটি বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি নয়; এটি ঈশ্বরের প্রেমের আহ্বান, যা ভক্তহৃদয়কে সংসার থেকে পরমপ্রেমের পথে আকৃষ্ট করে।
গানটির পরবর্তী অংশে রাধাকৃষ্ণের লীলার কল্পচিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। নীপগাছের ডালে বাঁধা দোলনা দুলতে দুলতে যেন ‘রাধা, রাধা’ নাম উচ্চারণ করছে।
এট এই কল্পচিত্রের অপূর্ব প্রকাশ। চারদিকে বর্ষার মেঘের গর্জন, কেয়া ফুলের সুগন্ধ এবং প্রকৃতির সজীবতা রাধার হৃদয়ে মিলনের উত্তেজনা ও শিহরণ জাগিয়ে তোলে। এখানে প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্য রাধার অন্তরের আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ।
এরপর কবি অভিসারিকারূপে সজ্জিত গোপ-ললনাদের চিত্র এঁকেছেন। তারা চোখে কাজলের ছলনা মেখে, বৃষ্টির ফোঁটাকে অশ্রুর আড়াল করে, নিঃশব্দে কদমকুঞ্জের পথে অগ্রসর হয়। তাদের এই গোপন যাত্রা কেবল প্রিয়তমের সঙ্গে মিলনের জন্য নয়; বরং সমস্ত সামাজিক সংকোচ, লজ্জা ও বাধা অতিক্রম করে প্রেমের চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের প্রতীক।
গানটির শেষাংশে রাধার হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। মিলনের আশা এবং বিরহের বেদনা একই সঙ্গে তাঁর অন্তরে আন্দোলিত হচ্ছে। তাঁর হৃদয় থেকে নিরন্তর উচ্চারিত হচ্ছে—‘রাধা-শ্যাম, রাধা-শ্যাম’। এই নামস্মরণ কেবল প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক নয়; এটি জীবাত্মা ও পরমাত্মার অবিচ্ছেদ্য মিলনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। প্রেম, বিরহ, অপেক্ষা এবং ঈশ্বরস্মরণ এখানে একাকার হয়ে গেছে।
- রচনাকাল ও স্থান:গানটির রচনাকাল সম্পর্কে জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর
(অগ্রহায়ণ-পৌষ
১৩৪৭) মাসে কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে।
এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২)-এর
৫১৭ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড:
কলাম্বিয়া [ডিসেম্বর ১৯৪০ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৭)। জিই ২৫৬১।
শিল্পী: ঝর্না দে। সুর: নজরুল ইসলাম]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
নীলিমা দাস।
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, বত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ফাল্গুন ১৪১৫। ফেব্রুয়ারি
২০০৯] নবম গান। রেকর্ডে ঝর্না দে-এর গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে।
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধকৃষ্ণ-লীলা।
- সুরাঙ্গ:
স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর