বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: বাহির দুয়ার মোর বন্ধ হে
বাহির দুয়ার মোর বন্ধ হে প্রিয় মনের দুয়ার আছে খোলা,
সেই পথে এসো হে মোর চিত-চোর
— হে দেবতা পথ ভোলা॥
সেথা নাহি কুল লাজ কলঙ্ক ভয়,
নাহি গুরুজন গঞ্জনা নিরদয়;
তাই গোপন মানস তমাল কুঞ্জে (আমি) বাঁধিয়াছি ঝুলন দোলা॥
মোর অন্তরে বহে সদা অন্তঃসলিলা অশ্রু-নদী —
সেই যমুনার তীরে কর তুমি লীলা নিরবধি।
সে মিলন-মন্দিরে জাগাবে না কেহ,
তব দেহে বিলীন হবে মোর দেহ;
অনন্ত বাসর-শয্যা রচিয়া অনন্ত মিলনে রহিব উতলা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি মানবাত্মার অন্তর্লীন কৃষ্ণপ্রেম, আত্মসমর্পণ এবং চিরন্তন মিলনের আকাঙ্ক্ষাকে বৈষ্ণব প্রেমসাধনার প্রতীকের মাধ্যমে গভীরভাবে প্রকাশ করেছেন। বাহ্যজগতের সমস্ত বাধা অতিক্রম করে অন্তরের নিভৃত মন্দিরে প্রিয়তমের আবির্ভাবই এখানে মূল বিষয়।
কবি বলেন, জগতের বাহ্যিক দ্বার তাঁর কাছে রুদ্ধ; অর্থাৎ সামাজিক নিয়ম, পার্থিব ব্যস্ততা ও জীবনের নানা প্রতিবন্ধকতা তাঁকে ঘিরে রয়েছে। কিন্তু তাঁর মনের দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত। সেই অন্তরলোকেই তিনি তাঁর ‘চিত-চোর’—হৃদয়হরণকারী শ্রীকৃষ্ণকে আহ্বান করেন। ‘পথভোলা দেবতা’ সম্বোধনের মধ্যে রয়েছে সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, যেন কৃষ্ণ ভুল করেও তাঁর হৃদয়ের পথ খুঁজে নেন এবং সেখানে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
অন্তরের সেই গোপন জগতে কোনো কুলমর্যাদার সংকোচ, লোকলজ্জা, কলঙ্কের ভয় কিংবা গুরুজনের ভর্ত্সনা নেই। সেখানে প্রেম সম্পূর্ণ নির্মল, মুক্ত এবং আত্মিক। তাই কবি তাঁর হৃদয়কে তমাল-কুঞ্জের সঙ্গে তুলনা করে সেখানে প্রেমের ঝুলনদোলা সাজিয়ে রেখেছেন। এটি রাধা-কৃষ্ণের ঝুলনলীলার প্রতীক হলেও প্রকৃত অর্থে ভক্তের হৃদয়ে
কৃষ্ণের প্রেমের চিরন্তন আসনের রূপক।
কবির অন্তরে নিরন্তর অশ্রুর একটি গুপ্ত স্রোতধারা প্রবাহিত হচ্ছে, যা যমুনা নদীর প্রতীকরূপে কল্পিত হয়েছে। এই অশ্রু বিরহ, প্রেম, আত্মনিবেদন ও ভক্তির গভীরতার বহিঃপ্রকাশ। সেই অন্তরযমুনার তীরেই তিনি প্রিয়তমকে অনন্তকাল লীলা করার আহ্বান জানান। অর্থাৎ তাঁর সমগ্র হৃদয়ক্ষেত্র যেন
কৃষ্ণের নিত্য আবাস ও লীলাক্ষেত্রে পরিণত হয়।
গানের শেষাংশে কবি এমন এক আধ্যাত্মিক মিলনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন, যেখানে কোনো বাহ্যিক ব্যাঘাত বা বিচ্ছেদের আশঙ্কা নেই। সেই মিলনমন্দিরে কেউ জাগিয়ে দেবে না, কেউ বিচ্ছিন্ন করবে না। ভক্তের সত্তা
কৃষ্ণের সত্তায় বিলীন হবে—এটি ভক্তি-দর্শনের পরম আত্মসমর্পণ ও ঐক্যের প্রতীক। অনন্ত বাসর-শয্যা এবং অনন্ত মিলনের চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি জন্ম-মৃত্যু, বিরহ ও সময়ের সীমা অতিক্রম করে ঈশ্বরের সঙ্গে চিরস্থায়ী প্রেমময় মিলনের আকুল আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।
সমগ্র গানে বাহ্যজগতের বন্ধন ও অন্তর্জগতের মুক্তির মধ্যে এক গভীর বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে। বাহিরের দ্বার বন্ধ হলেও অন্তরের দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত; আর সেই অন্তরলোকেই ভক্ত ও ভগবানের চিরন্তন, নির্মল ও অবিচ্ছেদ্য মিলন সম্ভব—এই আধ্যাত্মিক সত্যই গানের মূল প্রতিপাদ্য।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের
জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ
১৩৪৭) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির
প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ১ মাস।
-
গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৫২০]
- রেকর্ড: এইচএমভি [জুলাই ১৯৪০ (আষাঢ়-শ্রাবণ
১৩৪৭)। এন ১৭৪৮৫। শিল্পী: পদ্মরাণী চট্টোপাধ্যায়। সুর: কমল গুপ্ত]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: নীলিমা দাস।
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, ঊনত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। শ্রাবণ ১৪১৩/আগষ্ট
২০০৬] ২২ সংখ্যক গান। পদ্মরাণী চট্টোপাধ্যায়-এর রেকর্ডে গাওয়া গান অনুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। [নমুনা]
- সুরকার:
কমল
দাশগুপ্ত
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধাকৃষ্ণ
লীলা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য