বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: তুমি বেণুকা বাজাও কার নাম লয়ে শ্যাম
তুমি বেণুকা বাজাও কার নাম লয়ে শ্যাম
-
মোর সাধ যায় হরি আমি যদি সেই কিশোরী হইতাম॥
সেই প্রেম মোরে দাও গো শ্রী হরি,
যে প্রেমে নেমে আস রূপ ধরি,
যে প্রেমে কাঁদো যমুনার তীরে তুলি লয়ে 'রাধা রাধা' নাম॥
সেই প্রেম দাও যে প্রেমে ভোল তুমি হে শ্রী ভগবান,
রাধার দুয়ারে ভিক্ষা চাহিয়া নিতি সহ অপমান।
মোর আঁখি হয়ে উঠুক কমল,
দাও প্রিয় মোরে সেই আঁখি জল;
দাও সে বিরহ দাও যে বিরহে এই ধরা হয় ব্রজধাম॥
- ভাবসন্ধান: ভক্তকবি শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গভীর প্রেম, ভক্তি ও রাধাভাবের আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত আবেগময় ভাষায় প্রকাশ করেছেন। এখানে ভক্ত আত্মা এমন এক প্রেম কামনা করছে, যে প্রেমে ঈশ্বর নিজেও মোহিত হয়ে মানবমনে অবতীর্ণ হন। গানটির মূল সুর হলো
'রাধার মতো নিঃস্বার্থ, বিরহময় ও আত্মবিসর্জনমূলক প্রেম লাভের আকুতি।
তুমি বেণুকা বাজাও কার নাম লয়ে শ্যাম'- এই প্রশ্নে কবির বিস্ময় ও আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। কৃষ্ণের বাঁশির সুরে যে নাম ধ্বনিত হয়, তা রাধার নাম। সেই প্রেমের মাহাত্ম্য এত গভীর যে কবির সাধ জাগে- তিনি যদি সেই কিশোরী রাধার মতো হতে পারতেন! অর্থাৎ তিনি এমন প্রেমময় ভক্তিসত্তা অর্জন করতে চান, যা শ্রীকৃষ্ণের হৃদয়কেও আকর্ষণ করে।
'সেই প্রেম মোরে দাও গো শ্রী হরি, যে প্রেমে নেমে আস রূপ ধরি'- এই পংক্তিতে বোঝানো হয়েছে, সত্যিকার প্রেম এমন শক্তিশালী যে পরমাত্মাকেও মানবজগতে অবতীর্ণ হতে বাধ্য করে। ভক্ত সেই প্রেমই প্রার্থনা করছেন, যে প্রেমের টানে কৃষ্ণ যমুনাতীরে ব্যাকুল হয়ে
'রাধা রাধা' বলে কেঁদে বেড়ান। এখানে কৃষ্ণকেও প্রেমের কাছে আত্মসমর্পণকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
পরবর্তী অংশে কবি আরও গভীর প্রেমের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন'- সেই প্রেম দাও যে প্রেমে ভোল তুমি হে শ্রী ভগবান। অর্থাৎ তিনি এমন প্রেম চান, যার কাছে স্বয়ং ভগবানও নিজেকে ভুলে যান। রাধার দুয়ারে কৃষ্ণের ভিক্ষুকের মতো দাঁড়ানো এবং অপমান সহ্য করা বোঝায়, প্রেমের কাছে ঈশ্বরও বিনম্র ও অসহায় হয়ে পড়েন। এই ভাব বৈষ্ণব পদাবলীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক উপলব্ধি।
'মোর আঁখি হয়ে উঠুক কমল'- এখানে হৃদয়ের পবিত্রতা ও প্রেমসিক্ত দৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। কবি চান তাঁর চোখে সেই অশ্রু আসুক, যা প্রেম ও বিরহে হৃদয়কে কোমল ও নির্মল করে তোলে।
শেষ পংক্তিতে'- দাও সে বিরহ দাও যে বিরহে এই ধরা হয় ব্রজধাম'- কবি বিরহকেই আশীর্বাদ হিসেবে চাইছেন। কারণ বৈষ্ণব ভাবধারায় বিরহ কেবল দুঃখ নয়; তা প্রেমের সর্বোচ্চ রূপ। যে বিরহে প্রতিটি স্থান, প্রতিটি মুহূর্ত ব্রজধামের মতো পবিত্র ও প্রেমময় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ
কৃষ্ণের-বিচ্ছেদের ব্যথাই ভক্তের কাছে কৃষ্ণের স্মরণের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
সার্বিকভাবে, গানটি রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে কেন্দ্র করে ভক্তির সর্বোচ্চ স্তর—রাধাভাব, বিরহ, আত্মসমর্পণ ও
কৃষ্ণপ্রেমের গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির এক অপূর্ব প্রকাশ।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৪১
খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র
১৩৪৮)
মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির
একটি রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪২ বৎসর ২ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
৬২৪]
- রেকর্ড:
এইচএমভি [ আগষ্ট ১৯৪১ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪৮)। এন ২৭১৬২।
শিল্পী: মীনা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুর: কমল দাশগুপ্ত]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
নীলিমা দাস।
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, ঊনত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। শ্রাবণ ১৪১৩/আগষ্ট
২০০৬] ১৩ সংখ্যক গান। মীনা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর রেকর্ডে গাওয়া গান অনুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে।
[নমুনা]
- সুরকার:
কমল দাশগুপ্ত
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম, বৈষ্ণব। কৃষ্ণ।
আত্মনিবেদন। অজ্ঞাতা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য