বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: নিশি কাজল শ্যামা আয় মা নিশীথ রাতে
নিশি কাজল শ্যামা আয় মা নিশীথ রাতে।
যেমন কালো বাদল নামে নীল আকাশের নয়ন পাতে॥
কুল-কুণ্ডলিনী রূপে ওঠ মা জেগে চুপে চুপে,
মা ছেলেতে যাব মা চল্ ভোলানাথের ঘুম ভাঙাতে॥
তোর বরাভয় রূপ দেখায়ে দূর কর্ মা আঁধার ভীতি,
কৃষ্ণা চতুর্দশীতে মা দেখা পূর্ণ চাঁদের জ্যোতি।
পাতার কোলে কুঁড়ি সম মাগো হৃদয় কমল মম
তোর চরণ অরুণ দেখার আশায় রাত্রি জাগে রাতের সাথে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে ভক্তের অন্তরের গভীর আকুলতা, মাতৃস্নেহের প্রতি নির্ভরতা এবং দেবী কালীর শুভ, করুণাময় ও জাগ্রত রূপ দর্শনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। এখানে দেবী শ্যামাকে কেবল সংহারকারিণী রূপে নয়, বরং স্নেহময়ী জননী, অভয়দায়িনী এবং আত্মজাগরণের শক্তিরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে।
গানের শুরুতে ভক্ত নিশীথ রাতে দেবী শ্যামাকে আহ্বান জানান। তিনি চান, যেমন কৃষ্ণবর্ণ মেঘ নিঃশব্দে নীল আকাশকে আচ্ছন্ন করে, তেমনি দেবীও তাঁর শ্যামবর্ণ রূপে নীরবে ভক্তের হৃদয়ে আবির্ভূত হোন। এখানে রাত্রির অন্ধকার কোনো ভয়ের প্রতীক নয়; বরং গভীর সাধনা, ধ্যান এবং ঈশ্বরোপলব্ধির অনুকূল পরিবেশের প্রতীক।
এই গানের পরবর্তী অংশে কবি দেবীকে কুলকুণ্ডলিনী শক্তিরূপে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যোগদর্শনে কুলকুণ্ডলিনী মানুষের অন্তর্নিহিত সুপ্ত আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক। ভক্ত মায়ের হাত ধরে ভোলানাথের (শিবের) ঘুম ভাঙাতে যেতে চান। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, দেবীশক্তির জাগরণে শিবশক্তিরও প্রকাশ ঘটে এবং সমগ্র বিশ্বে চেতনা ও কল্যাণের সঞ্চার হয়। এটি ভক্তের ঈশ্বরের আরও নিকটবর্তী হওয়ার এক কাব্যিক আকাঙ্ক্ষা।
এরপর ভক্ত প্রার্থনা করেন, দেবী যেন তাঁর
বরাভয়ময় রূপ প্রকাশ করে
অন্তরের অজ্ঞতা, ভয় ও অন্ধকার দূর করেন। কবি বলেন, কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর গভীর
অন্ধকারেও তিনি পূর্ণিমার চাঁদের মতো জ্যোতির্ময়। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে তিনি কালো
রূপে প্রকাশিত হলেও তাঁর প্রকৃত স্বরূপ অনন্ত আলো, জ্ঞান, করুণা ও মঙ্গলময়তায়
উদ্ভাসিত। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি দেবী কালীর আপাত ভয়ংকর রূপের
অন্তর্নিহিত শুভ ও মঙ্গলময় সত্তাকে তুলে ধরেছেন।
শেষ স্তবকে ভক্ত নিজের হৃদয়কে পাতার কোলে আশ্রয় নেওয়া কোমল কুঁড়ির সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেই হৃদয়পদ্ম সারারাত জেগে থাকে দেবীর রক্তিম চরণদর্শনের আশায়। এখানে হৃদয়-কমল ভক্তের নির্মল অন্তরের প্রতীক এবং চরণ-অরুণ দেবীর করুণা, আশ্রয় ও মুক্তিদায়িনী কৃপাশক্তির প্রতীক। ভক্তের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হলো মাতৃচরণে আত্মসমর্পণ করে তাঁর কৃপা লাভ করা।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২৪
জুলাই (৮ শ্রাবণ ১৩৪৭) কলকাতা বেতারকেন্দ্র থেকে 'এস মা' শ্যামা বিষয়ক
গীতিআলেখ্য প্রচারিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ২ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ৬৩০ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড:
এইচএমভি। [মে
১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ
১৩৫০ বঙ্গাব্দ)। এন ২৭৩৭৩। শিল্পী
মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর চিত্ত রায় ]
- বেতার:
এস মা (শ্যামা-সঙ্গীত বৈচিত্র্য)
- প্রথম প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র ক।
চতুর্থ অধিবেশন। ২৪ জুলাই ১৯৪০ (বুধবার ৮ শ্রাবণ ১৩৪৭)। সন্ধ্যা ৮-৮.৩৯টা।
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ ১৪শ সংখ্যায়। ১৬ জুলাই ১৯৪০। পৃষ্ঠা ৭৬৮]
- The Indian Listener, Vol, V No.1
page 1081]
দ্বিতীয় প্রচার: কলকাতা
বেতারকেন্দ্র-ক। তৃতীয় অধিবেশন। ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ (শনিবার ২৬ মাঘ ১৩৪৭)।
প্রচার সময়: রাত ৮.০০-৮-৩৯টা।
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১২শ বর্ষ ৩য় সংখ্যা। ১ ফেব্রুয়ারি,
১৯৪১। পৃষ্ঠা: ১৫২
- The Indian Listener, Vol, VI No 3
page 59]
তৃতীয় প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র ক।
তৃতীয় অধিবেশন। ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ (বৃহস্পতিবার ৯ আশ্বিন। ১৩৪৮)। প্রচার সময়: রাত
৭.৫৫-৮.২৯টা
[সূত্র:
The Indian Listener, Vol, V No.1
page 71]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- নীলিমা দাস। [নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, একত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ফাল্গুন,
১৩৯৭ বঙ্গাব্দ/ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দ] ১৫ সংখ্যক গান। মৃণালকান্তি ঘোষ-এর
গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। শ্যামা।
প্রার্থনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য