বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মহাকালের কোলে এসে গৌরী হ'ল মহাকালী
মহাকালের কোলে এসে গৌরী হ'ল মহাকালী,
শ্মশান-চিতার ভস্ম মেঘে ম্লান হ'ল মার
রূপের ডালি॥
তবু মায়ের রূপ কি হারায়
সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্র তারায়,
মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য
সূর্য-প্রদীপ জ্বালি' ॥
উমা হ'ল ভৈরবী হায় বরণ ক'রে ভৈরবেরে,
হেরি' শিবের শিরে জাহ্নবী রে শ্মশানে মশানে ফেরে।
অন্ন দিয়ে ত্রি-জগতে
অন্নদা মোর বেড়ায় পথে,
ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে
রাজদুলালী॥
- ভাবসন্ধান: দেবী দুর্গা'র গৌরী থেকে কালী, উমা থেকে ভৈরবী এবং অন্নদা থেকে ভিক্ষারিণী—এই বহুরূপী সত্তার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, রূপ পরিবর্তিত হলেও মাতৃসত্তার মূল মহিমা অপরিবর্তনীয়। তিনি সৌন্দর্যময়ী, ভয়ংকরী, বিশ্বজননী, অন্নদাত্রী এবং প্রেমময়ী পত্নী—সব রূপেই তিনি এক ও অভিন্ন মহাশক্তি।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে গৌরী বা উমার মহাকালীতে রূপান্তর এবং তাঁর বহুরূপী, সর্বব্যাপী মাতৃসত্তার গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করা হয়েছে। কবি দেখিয়েছেন—স্নিগ্ধ, সৌন্দর্যময়ী গৌরী যখন মহাকালের কোলে এসে মহাকালীরূপ ধারণ করেন, তখন তাঁর কোমল সৌন্দর্যের পরিচিত রূপটি যেন শ্মশানের চিতা-ভস্ম ও মৃত্যুর গম্ভীর পরিবেশে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। কিন্তু বাহ্যরূপের এই পরিবর্তনেও মায়ের প্রকৃত সৌন্দর্য কখনো বিলীন হয় না।
দেবীর রূপ সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতিতে ছড়িয়ে আছে—চন্দ্র ও তারার মধ্যে তাঁর সৌন্দর্যের দীপ্তি, আর প্রতিদিন সূর্যের আলো জ্বেলে যেন বিশ্বজগৎ তাঁর রূপের আরতি করে। অর্থাৎ দেবী কেবল মন্দিরের প্রতিমায় সীমাবদ্ধ নন; সমগ্র সৃষ্টি ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডেই তাঁর মহিমা ও সৌন্দর্য প্রকাশিত।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেছেন, কোমল উমাই ভৈরবী রূপ ধারণ করেছেন তাঁর প্রিয় ভৈরব বা শিবকে বরণ করে। শিবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ফলে রাজপ্রাসাদের আদরের কন্যা উমা শ্মশানে শ্মশানে বিচরণ করেন। শিবের মাথায় প্রবাহিত জাহ্নবী বা গঙ্গাকে দেখে তিনি সেই বৈরাগ্যময়, ভয়ংকর অথচ গভীর প্রেমের জগতে নিজেকে যুক্ত করেছেন।
সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী বৈপরীত্যটি এসেছে শেষ স্তবকে। যিনি অন্নদা, যিনি তিন জগৎকে অন্ন দান করেন এবং সকল জীবের জীবনধারণের ব্যবস্থা করেন, সেই দেবীই তাঁর ভিক্ষুক স্বামী শিবের প্রতি প্রেমের টানে পথে পথে ভিক্ষা করেন। এখানে দেবীর ত্যাগ, প্রেম ও পতিভক্তির মহিমা প্রকাশিত হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৪১ বঙ্গাব্দের আশ্বিন (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) মাসে গানটি গানের মালা গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৫ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- গানের মালা।
প্রথম সংস্করণ।
২৩ অক্টোবর ১৯৩৪, মঙ্গলবার ৬ কার্তিক ১৩৪১। গানের মাল- ৪৯। দুর্গা-গীতাঙ্গী।
-
নজরুল রচনাবলী। জন্মশতবর্ষ সংকলন ষষ্ঠ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯, জুন
২০১২।
গানের মালা।
৪৯। দুর্গা-গীতাঙ্গী। পৃষ্ঠা ২২১-২২২।]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর
৬৩৯ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড:
এইচএমভি [অক্টোবর ১৯৩৫ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪২)। এন ৭৪২১। শিল্পী:
মৃণালকান্তি ঘোষ]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
আহসান মুর্শেদ
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, সাতাশ খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। কার্তিক, ১৪১২/অক্টোবর
২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ] ২৩ সংখ্যক গান।
[নমুনা]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল:
তেওরা
- গ্রহস্বর: ধা