বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মৌন আরতি তব বাজে নিশিদিন
মৌন আরতি তব বাজে নিশিদিন
ত্রিভুবন মাঝে প্রভু বাণী-বিহীন॥
সম্ভ্রমে-শ্রদ্ধায় গ্রহ-তারা দল
স্থির হয়ে রয় অপলক অচপল,
ধ্যান-মৌনী মহাযোগী অটল
আপন মহিমায় তুমি সমাসীন॥
মৌন সে সিন্ধুতে জলবিম্বের প্রায়
বাণী ও সঙ্গীত যায় হারাইয়া যায়।
বিস্ময়ে অনিমেঘ আঁখি চেয়ে রয়
তব পানে অনন্ত সৃষ্টি-প্রলয়,
তব ধ্রুব-লোকে, হে চির অক্ষয়,
সকল ছন্দ-গতি হইয়াছে লীন॥
- ভাবসন্ধান: পরমসত্তার অনন্ত মহিমা, নীরব উপস্থিতি এবং বিশ্বজগতের ওপর তাঁর সর্বময় কর্তৃত্বের উপলব্ধি। কবি দেখিয়েছেন,
তাঁর প্রকৃত মহিমা ভাষা বা সঙ্গীতের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়; সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নীরব শৃঙ্খলা, বিস্ময় ও ধ্যানমগ্নতাই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ বন্দনা। তাঁর সান্নিধ্যে সমস্ত শব্দ, গতি ও অহংকার বিলীন হয়ে যায়, আর প্রকাশিত হয় চিরন্তন সত্যের মহিমা।
এই আদর্শে রচিত কবি পরমসত্তার অসীম মহিমা, নীরব মহত্ত্ব এবং বিশ্বজগতের ওপর তাঁর সর্বময় কর্তৃত্বের কথা গভীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এখানে
পরমসত্তার মহিমা এমন এক স্তরে উন্নীত হয়েছে, যেখানে ভাষা, সঙ্গীত ও শব্দেরও সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায়; নীরবতাই হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ উপাসনা।
এই ধ্বনি অনাহত নাদের মহিমায়।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, পরমসত্তার উদ্দেশে নিশিদিন জগতে মৌন আরতি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই আরতি মানুষের কণ্ঠে নয়, বরং সমগ্র বিশ্বজগতের অস্তিত্বের মধ্য দিয়েই অবিরাম সম্পন্ন হচ্ছে। অর্থাৎ সৃষ্টির প্রতিটি উপাদান- আকাশ, বাতাস, গ্রহ-নক্ষত্র, দিন-রাত্রি।
এরা নীরবে তাঁরই মহিমার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। তাই এখানে কোনো উচ্চারিত বাণীর প্রয়োজন নেই; নীরবতাই সর্বোচ্চ বন্দনা।
এরপর কবি বলেন, গ্রহ-নক্ষত্রসমূহ গভীর শ্রদ্ধায় স্থির হয়ে যেন স্রষ্টার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। এটি প্রকৃতির নিয়ম-শৃঙ্খলার এক কাব্যিক ব্যাখ্যা। একইভাবে, মহাযোগীর মতো সমগ্র বিশ্ব ধ্যানমগ্ন হয়ে তাঁর অসীম মহিমার সামনে নত হয়ে আছে। আর তিনি নিজ মহিমায় স্বয়ংসম্পূর্ণ, চিরস্থির ও অনন্ত সত্তা হিসেবে বিরাজমান।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, পরমসত্তার সেই অসীম নীরবতার সাগরে মানুষের ভাষা ও সঙ্গীত যেন জলের প্রতিবিম্বের মতো বিলীন হয়ে যায়। অর্থাৎ মানুষের ভাষা, জ্ঞান ও শিল্প ঈশ্বরের অসীম মহিমাকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে অক্ষম। তাঁর সামনে সব প্রকাশ ক্ষুদ্র হয়ে পড়ে।
সবশেষে কবি তাঁর আত্মোপলব্ধিতে বলেন, অনন্ত সৃষ্টি ও প্রলয়ের ধারাও বিস্ময়ে তাঁর দিকে চেয়ে থাকে। তিনি ধ্রুব, অক্ষয় ও চিরন্তন; অথচ সৃষ্টি ও প্রলয় তাঁরই ইচ্ছাধীন। তাঁর ধ্রুবলোকে পৌঁছে সব ছন্দ, গতি ও পরিবর্তন লীন হয়ে যায়। অর্থাৎ পরিবর্তনশীল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ঊর্ধ্বে এক চিরন্তন, অবিনশ্বর ও পরম সত্য হিসেবে তিনি বিরাজমান।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না।
১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪১) মাসে, এইচএমভি এই গানের একটি
রেকর্র্ড প্রথম প্রকাশ করেছিল। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৫ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ, ১৪১৭/ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)। গান সংখ্যা ৬৫২। পৃষ্ঠা: ১৯৮।
- পত্রিকা: সঙ্গীতবিজ্ঞান পত্রিকা। আশ্বিন ১৩৪১। কথা ও সুর:
কাজী নজরুল ইসলাম। [নমুনা]
- রেকর্ড: এইচএমভি [অক্টোবর ১৯৩৪ (আশ্বিন-কার্তিক
১৩৪১)। এন ৭২৯৫। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ।
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: খেয়ালাঙ্গ