বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: হে মদিনার নাইয়া! ভব-নদীর তুফান
হে মদিনার
নাইয়া!
ভব-নদীর তুফান
ভারি কর মোরে পার
তোমার দয়ায়
ত’রে গেল লাখো গুন্হাগার॥
পারের কড়ি নাই
হে আমার হয়নি নামাজ রোজা
কূলে এসে বসে
আছি নিয়ে পাপের বোঝা
(আমায়) ‘পার কর ইয়া রসুল’ বলে কাঁদি জারে জার॥
তোমার নাম
গেয়েছি শুধু কেঁদে সুব্হ শাম
তরিবার মোর
নাই ত’ পুঁজি বিনা তোমার নাম।
হাজারো বার
দরিয়াতে ডুবে যদি মরি
ছাড়ব না মোর
পারের আশা তোমার চরণ-তরী
সবার শেষে পার
যেন হয় এই খিদ্মতগার॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে সংসারকে উত্তাল নদী এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শকে মুক্তির নৌকা হিসেবে রূপায়িত করা হয়েছে। নিজের পাপ ও অক্ষমতা স্বীকার করে নবীপ্রেম, অনুতাপ এবং আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভর করেই মুক্তির তীরে পৌঁছানো সম্ভব—এই ভাবই গানের মূল প্রতিপাদ্য। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে
কবি একজন পাপী কিন্তু অনুতপ্ত মুমিনের হৃদয়ের গভীর আত্মসমর্পণ, অসহায়ত্ব এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও আশ্রয়প্রার্থনাকে কাব্যিক রূপকে প্রকাশ করেছেন।
সমগ্র গানটি একটি নৌযাত্রার রূপকের ওপর নির্মিত, যেখানে সংসারকে উত্তাল নদী এবং মুক্তিকে নিরাপদ তীর হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।
গানের শুরুতে কবি মহানবী (সা.)-কে 'মদিনার নাইয়া' বা মাঝি বলে সম্বোধন করেন। এখানে
'নাইয়া' কোনো বাস্তব মাঝি নন; বরং তিনি আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের প্রতীক। কবি বলেন, এই সংসাররূপী ভবনদী ভয়ংকর ঝড়-তুফানে পরিপূর্ণ। তাই তিনি প্রার্থনা করেন, মহানবী (সা.) যেন তাঁর দয়ার মাধ্যমে তাঁকে নিরাপদে মুক্তির তীরে পৌঁছে দেন। তিনি বিশ্বাস করেন, নবীর অনুগ্রহে অসংখ্য পাপী মানুষ হেদায়েত ও মুক্তির পথ পেয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি নিজের অক্ষমতা ও অপরাধবোধ স্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাঁর কাছে পার হওয়ার ‘কড়ি’ নেই—অর্থাৎ নেক আমল, নিয়মিত নামাজ-রোজা কিংবা পর্যাপ্ত ইবাদতের পুঁজি তাঁর নেই। তিনি পাপের ভার নিয়ে তীরে বসে আছেন এবং আকুল কণ্ঠে
'পার কর ইয়া রাসুল' বলে সাহায্য প্রার্থনা করছেন। এটি তাঁর বিনয়, অনুশোচনা এবং আল্লাহর রহমতের প্রতি আশাবাদের প্রকাশ।
এরপর কবি বলেন, তাঁর একমাত্র সম্বল হলো মহানবী (সা.)-এর নাম স্মরণ করা। সকাল-সন্ধ্যা তিনি অশ্রুসজল চোখে নবীর নাম উচ্চারণ করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, এই ভালোবাসা ও স্মরণই তাঁকে মুক্তির পথে নিয়ে যাবে। এখানে নবীপ্রেমকে আত্মিক শক্তি ও আশার উৎস হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
গানটির শেষাংশে কবি অটল আশা ও বিশ্বাসের কথা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, হাজারবার যদি এই জীবনের উত্তাল দরিয়ায় ডুবেও যান, তবু তিনি মুক্তির আশা ত্যাগ করবেন না। মহানবী (সা.)-এর
'চরণ-তরী' -অর্থাৎ তাঁর আদর্শ, শিক্ষা ও পথনির্দেশ—ধরেই তিনি মুক্তির তীরে পৌঁছাতে চান। সবশেষে তিনি প্রার্থনা করেন, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে যেন এই বিনম্র সেবকও আল্লাহর রহমতে মুক্তি লাভ করতে পারে।
-
রচনাকাল ও স্থান:  
গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল
(চৈত্র ১৩৪৩-বৈশাখ ১৩৪৪) মাসে,
এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ১০ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত
সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। সংখ্যা ৭২০]
- রেকর্ড:
এইচএমভি [এপ্রিল ১৯৩৭ (চৈত্র ১৩৪৩-বৈশাখ ১৩৪৪)। এন ৯৮৮৬। শিল্পী:
মহম্মদ কাশেম]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
আহসান মুর্শেদ।
নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (ঊনবিংশ খণ্ড)।
২৪ সংখ্যক গান]
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ:
ভাটিয়ালি