বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হরি হে তুমি তাই দূরে থাক স’রে
হরি হে তুমি তাই দূরে থাক স’রে
হরি প্রভু বলে মোরা দূরে রাখি
পাষাণ দেউলে রাখিয়াছি হায় তোমারে পাষাণ করে॥
তোমায় চেয়েছিল গোপিনীরা
সেদিনও চেয়েছি মীরা ডেকে প্রিয়তম বলে
তোমায় গোপাল বলিয়া ডাকিয়া পাইল যশোদা মা শচী কোলে
অন্তরতম হতে নিশিদিন থাক তুমি অন্তরে॥
দেবতা ভাবিয়া পূজা দিই মোরা তুমি তাহা নাহি খাও
তুমি লুকায়ে ভিখারি সাজিয়া মোদের পাতের অন্ন চাও।
রাখাল ছেলের আধ খাওয়া ফল
কেড়ে খাও তুমি হে চির সজল
মোরা ভয় করি তাই লুকাইয়া থাক তুমি অভিমান ভরে॥
- ভাবসন্ধান: হরিকে পাথরের মূর্তি বা দূরবর্তী দেবতা হিসেবে নয়, মানুষের অন্তরে, প্রেমে, মমতায় ও মানবসেবার মধ্যে অনুভব করতে হবে। গোপিনীর প্রেম, মীরার প্রেম, যশোদার মাতৃস্নেহ এবং দরিদ্রের প্রতি সহমর্মিতার মধ্যেই হরির প্রকৃত প্রকাশ। বাহ্যিক পূজার চেয়ে অন্তরের প্রেম ও মানুষের সেবাই
হরিলাভের শ্রেষ্ঠ পথ। এই আদর্শে রচিত এই গানে কবি ভক্তির প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠানের পরিবর্তে হৃদয়-নিবেদিত, মানবিক ও অন্তরঙ্গ
হরি-প্রেমের কথা বলেছেন। এখানে ‘হরি’ কেবল মন্দিরের পাষাণমূর্তিতে আবদ্ধ কোনো দূরবর্তী দেবতা নন; তিনি মানুষের হৃদয়ের অন্তরতম সত্তা, যিনি প্রেম ও মমতার মধ্যেই আপন রূপে প্রকাশিত হন।
গানের শুরুতে কবি আক্ষেপ করে বলেছেন—আমরা ‘হরি প্রভু’ বলে তাঁকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। তাঁকে পাষাণের মূর্তি ভেবে পাষাণ দেউলে প্রতিষ্ঠা করেছি; অথচ যিনি আমাদের হৃদয়ের অত্যন্ত কাছের, তাঁকেই আমরা বাহ্যিক পূজার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছি। অর্থাৎ
হরিকে জীবন্ত অনুভব না করে কেবল আনুষ্ঠানিক ধর্মাচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাই মানুষের ভুল।
এরপর কবি হরির সঙ্গে ভক্তের অন্তরঙ্গ প্রেমের সম্পর্কের নানা পৌরাণিক দৃষ্টান্ত স্মরণ করেছেন। গোপিনীরা তাঁকে প্রেমিকরূপে চেয়েছিলেন, মীরা তাঁকে ‘প্রিয়তম’ বলে ডেকেছিলেন, আর যশোদা তাঁকে ‘গোপাল’ বলে মাতৃস্নেহে আপন করে পেয়েছিলেন। এইসব সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে—হরিকে দূরের দেবতা হিসেবে নয়, প্রেমিক, সন্তান, বন্ধু ও আপনজন হিসেবে হৃদয়ে পাওয়া যায়।
কারণ তিনি মানুষের ‘অন্তরতম’ হয়ে নিশিদিন অন্তরে বিরাজ করেন।
গানের দ্বিতীয় অংশে কবি প্রচলিত দেবপূজার ধারণাটিকে আরও গভীরভাবে প্রশ্ন করেছেন। মানুষ দেবতা মনে করে হরির উদ্দেশে পূজা নিবেদন করে, কিন্তু সেই বাহ্যিক পূজা যেন তাঁর প্রয়োজন নয়। তিনি বরং সাধারণ মানুষের জীবনে, দরিদ্রের বেশে, ভিখারির রূপে এসে মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসা ও অন্ন চান। অর্থাৎ ক্ষুধার্ত মানুষের সেবাই
হরিসেবার প্রকৃত রূপ—এই মানবতাবাদী ভাবটি এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
‘রাখাল ছেলের আধ-খাওয়া ফল / কেড়ে খাও তুমি’—এই চিত্রে হরির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক একেবারে সহজ, স্বাভাবিক ও স্নেহময় হয়ে উঠেছে। তিনি রাজকীয় দেবতা নন; রাখালবালকের সঙ্গে আধ-খাওয়া ফল ভাগ করে নেওয়া আপনজন। তাঁর এই সহজ মানবিক রূপই কবির কাছে অধিক প্রিয়।
গানের শেষাংশে কবি বলেছেন, মানুষ ভয় ও সংকোচের কারণে হরিকে নিজের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে; ফলে হরি অভিমান করে অন্তরে লুকিয়ে থাকেন। এখানে ‘অভিমান’ আসলে
হরি ও মানুষের বিচ্ছেদের প্রতীক।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় নি। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭) মাসে,
মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত
হয়েছিল। গানটি
প্রকাশিত হয়েছিল নজরুল ইসলামের ৪০ বৎসর
১১ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার শেষের দিকে।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮।
ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৮০৬ গান।
- রেকর্ড:
মেগাফোন। মে ১৯৪০ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭)। জেএনজি ৫৪৭৩।
শিল্পী: ভবানীচরণ দাস। সুরকার: নজরুল ইসলাম। রেকর্ড লেবেলে গানটির শিরোনাম ছিল-
'প্রভু বলে মোরা দূরে রাখি'।
[শ্রবণ
নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: নিখিলরঞ্জন নাথ
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, তেইশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। কার্তিক ১৪০৯
নভেম্বর ২০০২ খ্রিষ্টাব্দ] ২৫ সংখ্যক গান। [নমুনা]
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। হরি।
ভক্তি
- সুরাঙ্গ: ভজন
- তাল:
দাদরা
- গ্রহস্বর: হ্মা