বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মন দিয়ে যে দেখি তোমায় তাই দেখিনে নয়ন দিয়ে
মন দিয়ে যে দেখি তোমায় তাই দেখিনে নয়ন দিয়ে।
পরান আছে বিভোর হয়ে তোমার নামের ধেয়ান নিয়ে॥
হৃদয় জুড়ে আছ ব’লে,
এড়িয়ে চলি নানান ছলে।
আছ আমার অন্তরে, তাই অন্তরালে রই লুকিয়ে॥
আমার কথা শুনাই না গো তোমার কথা শোনার আশায়,
ভরে আছে অন্তর মোর বন্ধু তোমার ভালোবাসায়।
তোমায় ভালো বাসতে পেরে
পেয়েছি মোর আনন্দেরে
অমর হলাম হে প্রিয় মোর তোমার প্রেমের সুধা পিয়ে॥
-
ভাবসন্ধান: যাঁকে বাহ্যচক্ষে দেখা যায় না, তাঁকে প্রেমময় হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। প্রিয়ের নামের ধ্যান ও তাঁর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় হৃদয় পূর্ণ হলে জাগতিক অভাব-অভিযোগ মুছে যায়; প্রেমই তখন আনন্দের অমৃত হয়ে মানুষকে মৃত্যুর সীমা অতিক্রম করার অনুভূতি দেয়।
এই ভাবদর্শে রচিত এই গানে কবি এমন এক পরমসত্তা হিসেবে কল্পনা করেছেন, যাঁকে বাহ্যচক্ষু দিয়ে দেখা যায় না, কিন্তু হৃদয় ও প্রেমের অনুভবে সর্বক্ষণ উপলব্ধি করা যায়।
গানের শুরুতে সেই পরমসত্তার উদ্দেশ্যে বলেছেন- তোমাকে দেখার জন্য আমার বাহ্যিক চোখের প্রয়োজন নেই; মন দিয়েই আমি তোমাকে দেখি। এখানে
'দেখা' আসলে বাহ্যদর্শন নয়, অন্তরের উপলব্ধি। প্রাণ তাঁর নামের ধ্যানে এমনভাবে নিমগ্ন যে জাগতিক চেতনা যেন তার কাছে গৌণ হয়ে গেছে।
পরমসত্তার নামস্মরণই হয়ে উঠেছে কবির ধ্যানের কেন্দ্র।
প্রথম অন্তরাতে পর্মসত্তাকে কবি কিভাবে উপলব্ধি করেছেন দ্বিধান্বিত চিত্তে। প্রথমে
তিনি মনে করেছেন যে,- পরমসত্তা তাঁর সমগ্র সত্তা জুড়ে বিরাজমান, তাই তিনি তাঁকে
পৃথক কোনো সত্তা না ভেবে এড়িয়ে চলেন। কিন্তু উপলন্ধি করেন- তাঁকে পরমাত্মারূপে। তিনি
লুকিয়ে থাকেন অন্তরের গভীর অন্তরালে। এখানে পরমসত্তা হয়ৈ ওঠে প্রিয়তম। তিনি এতটাই অন্তরঙ্গ ও অন্তঃস্থ যে তাঁকে বাইরে খুঁজতে হয় না। যিনি অন্তরে আছেন, তিনিই আবার অন্তরালের রহস্যে আবৃত।
'অন্তরে' এবং 'অন্তরালে' শব্দদ্বয়ের ধ্বনিগত সাদৃশ্যও ভাবটিকে গভীর করেছে। এই কারণই
কবির উপলব্ধিকে রহস্যময় হয়ে উঠে।
সঞ্চারীতে কবি হয়ে ওঠেন বাকমুখর। তিনি নিজের কথা বলতে চান না; তিনি বরং
পরমসত্তার কথাই শুনতেই আগ্রহী। এটি আত্মকেন্দ্রিকতা ত্যাগ করে পরমসত্তার প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার প্রতীক।
'বন্ধু' সম্বোধনে সম্পর্কটি আরও অন্তরঙ্গ হয়েছে। হৃদয় যখন বন্ধুর ভালোবাসায় পূর্ণ, তখন নিজের অভাব, দুঃখ বা আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের প্রয়োজন থাকে না।
আভোগে চূড়ান্ত উপলব্ধি উপস্থাপিত হয়েছে। পরমসত্তারূপী বন্ধুর ভালোবাসাই কবির কাছে পরম আনন্দের উৎস। সেই প্রেম কোনো পার্থিব সুখ নয়; তা যেন অমৃতসুধা। সেই প্রেম পান করে প্রেমিক
'অমর' হয়েছেন।
এখানে 'অমর' হওয়া শারীরিক অমরত্ব নয়। প্রেমের এমন এক আধ্যাত্মিক অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে
বন্ধুর প্রেমে বিলীন হয়ে যাওয়া- যা সময় ও মৃত্যুর সীমাকে অতিক্রম করে
অমরত্বের সন্ধান দেয়। কবি হয়ে ওঠেন অমৃতের বন্ধু।
-
রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ১৮ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার, ১ আশ্বিন ১৩৪১ বঙ্গাব্দ), এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানির সাথে কয়েকটি গান প্রকাশের জন্য নজরুলের একটি চুক্তি হয়। এই
চুক্তিপত্রে এই গানটির উল্লেখ ছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- গুলবাগিচা (গীতিবিচিত্রা)।
নজরুল রচনাবলী
অষ্টম
খণ্ড [১২ ভাদ্র
১৪১৫,
২৭ আগষ্ট
২০০৮। পৃষ্ঠা
১৭০।]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর
৮৩৭ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড:
- এইচএমভির সাথে চুক্তিপত্র। [১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৫ (বুধবার,
১ আশ্বিন ১৩৪২)]
- এইচএমভি
[ডিসেম্বর ১৯৩৫ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪২)]। এন
৭৪৪৭। শিল্পী: কল্যাণী গুপ্তা
- বেতার:
গুল্বাগিচা
(গজল-গীতিচিত্র)।
কলকাতা বেতার কেন্দ্র। [১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের
১৪ ডিসেম্বর (শনিবার ২৮ অগ্রহায়ণ ১৩৪৭)] তৃতীয় অধিবেশন। সময়: রাত ৮টা থেকে
৮.২৯ মিনিট।
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ, ২৩ সংখ্যা। ১লা ডিসেম্বর ১৯৪০। পৃষ্ঠা: ১২৮৫
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: ইদ্রিস আলী
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, চব্বিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা]
১৫ সংখ্যক গান।
[নমুনা]
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল:
যৎ
- গ্রহস্বর: গমপা