বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মাগো আমি আর কি ভুলি
মাগো আমি আর কি ভুলি।
চরণ যখন ধরেছি তোর মাগো আমি আর কি ভুলি।
আমায় বহু জনম ঘুরিয়েছিস্ মা পরিয়ে চোখে মায়ার ঠুলি॥
তোর পা ছেড়ে
যে মোক্ষ যাচে,
তুই বর্ নিয়ে
যা তাহার কাছে
ওমা আমি যেন যুগে যুগে পাই মা প্রসাদ চরণ-ধূলি॥
মোরে শিশু পেয়ে খেল্না দিয়ে, রেখেছিলি মা ভুলিয়ে
এখন খেল্না ফেলে কোলে নিতে মাকে ডাকি দু’হাত তুলি।
তোর ঐশ্বর্য
যা কিছু মা
দে ভক্তগণে
বিলিয়ে উমা,
তোর ভিখারি এই সন্তানে দিস্ মাতৃনামের ভিক্ষাঝুলি॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটির মূল ভাব হলো মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে দেবীমাতার চরণে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং পার্থিব ঐশ্বর্যের পরিবর্তে কেবল মাতৃচরণ ও মাতৃনামের আশ্রয় কামনা। ভক্ত এখানে সংসারজীবনের নানা আকর্ষণকে শিশুর খেলনার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং উপলব্ধি করেছেন যে, জীবনের প্রকৃত শান্তি ও পরম প্রাপ্তি মায়ের চরণেই।
গানের শুরুতে ভক্ত বলেছেন- 'চরণ যখন ধরেছি তোর, মাগো আমি আর কি ভুলি।' অর্থাৎ, একবার যখন তিনি মায়ের চরণে আশ্রয় পেয়েছেন, তখন আর কোনো পার্থিব বিষয় তাঁকে আকর্ষণ করতে পারে না। বহু জন্ম ধরে মা তাঁকে সংসারের নানা মায়ায় আবদ্ধ রেখেছেন।
'মায়ার ঠুলি' বলতে এমন এক আবরণ বোঝানো হয়েছে, যার ফলে মানুষ প্রকৃত সত্য দেখতে পায় না। সংসারের সুখ, সম্পদ, সম্পর্ক ও আকর্ষণকে চিরস্থায়ী মনে করে মানুষ বারবার জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু এখন ভক্ত সেই মোহ কাটিয়ে মায়ের চরণে আশ্রয় নিয়েছেন।
গানের একটি গভীর ভাবপূর্ণ পঙ্ক্তি হলো- 'তোর পা ছেড়ে যে মোক্ষ যাচে,
তুই বর্ নিয়ে যা তাহার কাছে।' ভক্ত এখানে এমনকি মোক্ষ বা মুক্তিকেও প্রত্যাখ্যান করছেন, যদি তার জন্য মায়ের চরণ ত্যাগ করতে হয়। তিনি যেন মাকে বলছেন- যে ব্যক্তি তোমার চরণ ছেড়ে মোক্ষ কামনা করে, তুমি তোমার বর তাকে দাও; আমার সে মোক্ষের প্রয়োজন নেই।
ভক্তের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা- 'আমি যেন যুগে যুগে পাই মা প্রসাদ চরণ-ধূলি।' অর্থাৎ তিনি জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি চেয়েও বড় বলে মনে করেন মায়ের চরণধূলির আশীর্বাদ। এখানে ভক্তির চরম আত্মসমর্পণ প্রকাশিত হয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে ভক্ত নিজের জীবনকে একটি শিশুর জীবনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
'মোরে শিশু পেয়ে খেল্না দিয়ে, রেখেছিলি মা ভুলিয়ে' পঙ্ক্তির মাধ্যমে নুঝানো
হয়েছৈ-
মা যেমন শিশুকে খেলনা দিয়ে ব্যস্ত রাখেন, তেমনি মহামায়া মানুষকে সংসারের নানা বস্তু, সুখ ও আকর্ষণের মধ্যে ব্যস্ত রেখে ভুলিয়ে রাখেন। মানুষ সেই খেলনাগুলোকেই জীবনের চরম প্রাপ্তি মনে করে।
কিন্তু যখন ভক্তের চেতনা জাগ্রত হয়েছে, তখন তিনি বলেছেন- 'এখন খেল্না ফেলে কোলে নিতে মাকে ডাকি দু’হাত তুলি।'
অর্থাৎ এখন তাঁর আর সংসারের খেলনা চাই না; তিনি চান মায়ের কোল। অর্থাৎ পার্থিব সুখ ও ঐশ্বর্যের পরিবর্তে তিনি চান পরম আশ্রয় ও মাতৃস্নেহ।
গানের শেষাংশে ভক্ত এক অসাধারণ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন- 'তোর ঐশ্বর্য যা কিছু মা,
দে ভক্তগণে বিলিয়ে উমা।' মায়ের কাছে যে অসীম ঐশ্বর্য, শক্তি ও সম্পদ রয়েছে, তা তিনি অন্য ভক্তদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পারেন। ভক্ত নিজের জন্য কোনো সম্পদ, ক্ষমতা বা পার্থিব প্রাপ্তি চান না।
তিনি নিজেকে বলেছেন- 'তোর ভিখারি এই সন্তানে দিস্ মাতৃনামের ভিক্ষাঝুলি।' এখানে 'ভিখারি' শব্দটি আত্মনিবেদনের প্রতীক। তিনি মায়ের কাছে ভিক্ষা চান, কিন্তু সেই ভিক্ষা ধনসম্পদ নয়- মায়ের নাম। তাঁর একমাত্র সম্পদ হোক মাতৃনাম, একমাত্র সম্বল হোক মাতৃস্মরণ।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায়
না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪৬) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৮ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন
২০১৮। গান ৮৩৯]
- রেকর্ড: এইচএমভি [ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ (মাঘ-ফাল্গুন
১৩৪৬)। এন ১৭৪১৯। শিল্পী: কে মল্লিক]
-
বেতার: এস মা
(শ্যামা-সঙ্গীত বৈচিত্র্য)
- প্রথম প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র ক।
চতুর্থ অধিবেশন। ২৪ জুলাই ১৯৪০ (বুধবার ৮ শ্রাবণ ১৩৪৭)। সন্ধ্যা ৮-৮.৩৯টা।
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ ১৪শ সংখ্যায়। ১৬ জুলাই ১৯৪০। পৃষ্ঠা ৭৬৮]
- The Indian Listener, Vol, V No.1
page 1081]
দ্বিতীয় প্রচার: কলকাতা
বেতারকেন্দ্র-ক। তৃতীয় অধিবেশন। ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ (শনিবার ২৬ মাঘ ১৩৪৭)।
প্রচার সময়: রাত ৮.০০-৮-৩৯টা।
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১২শ বর্ষ ৩য় সংখ্যা। ১ ফেব্রুয়ারি,
১৯৪১। পৃষ্ঠা: ১৫২
- The Indian Listener, Vol, VI No 3
page 59]
তৃতীয় প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র ক।
তৃতীয় অধিবেশন। ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ (বৃহস্পতিবার ৯ আশ্বিন। ১৩৪৮)। প্রচার সময়: রাত
৭.৫৫-৮.২৯টা
[সূত্র:
The Indian Listener, Vol, V No.1
page 71]
স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: ইদ্রিস আলী [নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, চব্বিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা]
১৭ সংখ্যক গান।
[নমুনা]
পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা।
মতৃরূপা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল:
দাদরা
- গ্রহস্বর: গমা