বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: যেয়ো না যেয়ো না মদিনা-দুলাল হয়নি যাবার বেলা
যেয়ো না যেয়ো না মদিনা-দুলাল হয়নি যাবার বেলা।
সংসার-পাথারে, আজো দোলে পাপের ভেলা॥
মেটেনি তোমায় দেখার পিয়াসা
মেটেনি কদম জিয়ারত আশা
হযরত, এই জমেছে প্রথম দীন-ই-ইসলাম মেলা॥
ছড়ায়ে পড়েনি তোমার কালাম আজিও সকল দেশে,
ফিরিয়া আসেনি সিপাহীরা তব আজও বিজয়ীর বেশে।
দিনের বাদশা চাও ফিরে চাও
শোক-দুর্দিনে বেদনা ভোলাও
গুনাহ্গার এই উম্মতে তব হানিও না অবহেলা॥
- পাঠভেদ: রেকর্ড লেবেলে বানান আছে- 'যেও না যেও না মদিনা দুলাল-ইসলামী
- ভাবসন্ধান: গানটির মূলভাব হলো—মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর প্রেম, বিচ্ছেদ-বেদনা এবং তাঁর আদর্শের চিরন্তন প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি। কবি দেখিয়েছেন, মানবসমাজে যতদিন অন্যায়, পাপ ও বিভ্রান্তি থাকবে, ততদিন মহানবীর শিক্ষা, দয়া ও নৈতিক আদর্শ মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। তাই তিনি ভক্তির আবেগে মহানবীর করুণা ও উম্মতের প্রতি অনুগ্রহ কামনা করেছেন।
এই আদর্শে রচিত এই গানে- কবি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা, বিচ্ছেদ-বেদনা এবং উম্মতের কল্যাণের আকুল প্রার্থনা প্রকাশ করেছেন। গানের ভাষা কাব্যিক ও আবেগঘন। এখানে কবি এমনভাবে কথা বলেছেন, যেন মহানবীর বিদায়ের মুহূর্তে তিনি তাঁকে অনুরোধ করছেন—এখনই চলে যাবেন না; কারণ মানবসমাজের সামনে এখনও বহু দায়িত্ব ও অপূর্ণতা রয়ে গেছে।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, 'যেয়ো না যেয়ো না মদিনা-দুলাল, হয়নি যাবার বেলা।' এটি কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা নয়; বরং একজন প্রেমমুগ্ধ ভক্তের হৃদয়ের আর্তি। তিনি মনে করেন, পৃথিবী এখনও পাপ, অন্যায় ও বিভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ।
'সংসার-পাথারে পাপের ভেলা' রূপকের মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মানবসমাজ এখনও নৈতিক সংকটের মধ্যে ভাসছে এবং মহানবীর আদর্শের প্রয়োজন আজও সমানভাবে বিদ্যমান।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, তাঁর নবীকে দেখার তৃষ্ণা মেটেনি, তাঁর পবিত্র পদচিহ্ন জিয়ারতের আকাঙ্ক্ষাও পূর্ণ হয়নি। এখানে কদম জিয়ারত বলতে মহানবীর স্মৃতি, আদর্শ ও পবিত্রতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীকী প্রকাশ বোঝানো হয়েছে। কবির অনুভূতিতে ইসলাম তখনও বিকাশের প্রারম্ভিক পর্যায়ে; তাই তিনি কল্পনা করেন, এই দীন-ই-ইসলামের মহাসমাবেশ মাত্র শুরু হয়েছে।
এরপর কবি আক্ষেপ করে বলেন, মহানবীর বাণী এখনও পৃথিবীর সর্বত্র পৌঁছেনি এবং তাঁর সত্য ও ন্যায়ের পতাকাবাহী সৈনিকেরা এখনও সর্বত্র বিজয়ী হয়ে ফিরে আসেনি। এখানে
'সিপাহী' বলতে কেবল যুদ্ধরত সৈন্য নয়; বরং সত্য, ন্যায়, মানবতা ও ইসলামের আদর্শ প্রচারকারী মানুষদের বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কবি চান, মহানবীর শিক্ষা আরও বিস্তৃত হোক এবং মানবসমাজে শান্তি, ন্যায় ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হোক।
গানের শেষাংশে কবি মহানবীকে 'দিনের বাদশা' বলে সম্বোধন করে তাঁর করুণা প্রার্থনা করেন। তিনি অনুরোধ করেন, মহানবী যেন তাঁর গুনাহগার উম্মতের প্রতি অবহেলা না করেন এবং তাঁদের শোক, দুঃখ ও দুর্দিনে দয়া ও পথনির্দেশ দান করেন। এটি মূলত মহানবীর প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং তাঁর আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থার প্রকাশ।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৭১৯। পৃষ্ঠা:
৮৯৫]
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মে
(বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪) মাসে,
টুইন রেকর্ড কোম্পানি
এই গানের একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। নজরুলের বয়স ৩৭ বৎসর ১১
মাস অন্তে শেষ কয়েক দিনের গান।
- গ্রন্থ:
জুলফিকার।
- প্রথম সংস্করণ।
অক্টোবর ১৯৩২। আশ্বিন ১৩৩৯।
- নজরুল রচনাবলী সপ্তম খণ্ড [কার্তিক ১৪১৯, নভেম্বর ২০১২।
জুলফিকার দ্বিতীয় খণ্ড। ৭। পৃষ্ঠা ৯৪]
-
রেকর্ড: টুইন [মে ১৯৩৭ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৩)। এফটি ৪৮৮৪। শিল্পী:
আব্দুল লতিফ এন্ড পার্টি। সুর সুবল দাশগুপ্ত]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, আটাশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। আষাঢ়, ১৪১৩/জুলাই
২০০৬] ২৩ সংখ্যক গান। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট