বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হায় হায় উঠিল মাতম আকাশ পবন ভুবন ভরি’
হায় হায় উঠিল মাতম আকাশ পবন ভুবন ভরি’।
আখেরি নবী দ্বীনের রবি বিদায় নিল বিশ্ব-নিখিল আঁধার করি’ ॥
অসীম তিমিরে পুণ্যের
আলো
আনিল যে চাঁদ, সে
কোথায় লুকালো
আকাশে ললাট হানি’
কাঁদিছে মরুভূমি
শোকে গ্রহ-তারকা
পড়িছে ঝরি’॥
তৃণ নাহি খায় উট,
মেষ নাহি মাঠে যায়;
বিহগ-শাবক কাঁদে
জননীরে ভুলি হায়!
বন্ধুর বিরহ কি সহিল
না আল্লার,
তাই তারে ডাকিয়া নিল
কাছে আপনার';
হায় কাণ্ডারি গেল
চ’লে রাখিয়া পারের তরী॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতকে কেন্দ্র করে সমগ্র বিশ্বজগতের গভীর শোক, তাঁর প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা এবং মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে তাঁর অনন্য মর্যাদা কাব্যিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ছিলেন অন্ধকারে আলোর দিশারী; তাই তাঁর বিদায়ে সৃষ্টিজগতে যে শূন্যতা ও বেদনার সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিই এই গানের মূল প্রতিপাদ্য।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে কবি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের (ইন্তেকালের) ফলে সমগ্র সৃষ্টিজগতে নেমে আসা গভীর শোক ও শূন্যতার অনুভূতিকে অত্যন্ত আবেগময় ও কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ করেছেন। নবীপ্রেম, বিশ্বজনীন বেদনা এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে মানবজাতির অসহায়তার চিত্রই এই গানের মূল বিষয়।
গানের শুরুতে কবি বলেন, মহানবী (সা.)-এর বিদায়ে আকাশ, বাতাস ও সমগ্র পৃথিবী যেন শোকের মাতমে ভরে উঠেছে।
তিনি ছিলেন ইসলামের শেষ নবী এবং দ্বীনের সূর্য। তাঁর বিদায়ের ফলে যেন সমগ্র বিশ্ব অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। এখানে ‘দ্বীনের রবি’ উপমার মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মহানবী (সা.) মানবজাতির জন্য সত্য, ন্যায় ও হেদায়েতের আলোকবর্তিকা ছিলেন।
পরবর্তী অংশে কবি বলেন, অসীম অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীতে যিনি পুণ্য, সত্য ও কল্যাণের আলো নিয়ে এসেছিলেন, সেই চাঁদের মতো উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব আজ আড়ালে চলে গেছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে মরুভূমিও যেন মাথা ঠুকে কাঁদছে, আর আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রও শোকে অশ্রু ঝরাচ্ছে। এগুলো বাস্তব ঘটনার বর্ণনা নয়; বরং মহানবী (সা.)-এর প্রতি সমগ্র সৃষ্টির ভালোবাসা ও শোককে প্রকাশ করার জন্য ব্যবহৃত কাব্যিক মানবায়ন ও অতিশয়োক্তি।
এরপর কবি প্রকৃতির নীরব শোকের ছবি তুলে ধরেছেন। উট ঘাস খাচ্ছে না, মেষ মাঠে যাচ্ছে না, পাখির ছানারা পর্যন্ত মাকে ভুলে বিলাপ করছে। অর্থাৎ মানুষের পাশাপাশি প্রাণিজগতও যেন এই বিচ্ছেদে শোকাহত। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, মহানবী (সা.) ছিলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত; তাই তাঁর বিদায়ে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
গানের শেষাংশে কবি এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ যেন তাঁর প্রিয় বন্ধুর বিচ্ছেদ আর সহ্য করতে না পেরে তাঁকে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নিয়েছেন। এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিশেষ সম্পর্ককে কাব্যিকভাবে প্রকাশ করার একটি রূপক। সবশেষে কবি মহানবী (সা.)-কে ‘কাণ্ডারি’ বা নৌকার মাঝির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি মানবজাতিকে মুক্তির তীরে পৌঁছে দেওয়ার পথপ্রদর্শক। তাঁর বিদায়ে মনে হয় যেন মাঝি চলে গেছেন, অথচ মুক্তির নৌকাটি এখনো তীরে পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছে। এই রূপকের মাধ্যমে নবীজীর অনুপস্থিতিতে উম্মাহর শূন্যতা ও দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান:গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৩) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি গানটি প্রথম রেকর্ড করে। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ১ মাস।
-
গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত
সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। সংখ্যা ৯০৩। বৈতালিক। পৃষ্ঠা:
২৭৮]
- রেকর্ড: টুইন [জুন ১৯৩৬ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৩)। এফটি ৪৪০০। শিল্পী: আব্দুল লতিফ। সুর: নজরুল ইসলাম] শিরোনাম: ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম (তিরোভাব)
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। মর্সিয়া
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর
- তাল: বৈতালিক
- গ্রহস্বর: ধপা