বরিশাল বিভাগ
বাংলাদেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশাসনিক বিভাগ। বর্তমানে এ বিভাগে ৬টি জেলা ও ৪২টি উপজেলা রয়েছে। জেলাগুলো হলো- বরিশাল,
পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা,
ঝালকাঠি ও পিরোজপুর। বিভাগের মোট আয়তন প্রায় ১৩,২২৫.২০ বর্গকিলোমিটার।
ভৌগোলিকভাবে বরিশাল বিভাগের উত্তরে ঢাকা বিভাগ, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে চট্টগ্রাম বিভাগ এবং পশ্চিমে খুলনা বিভাগ। নদী, খাল, চর, দ্বীপ ও নিম্নভূমি এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী-ব্যবস্থার পলল সঞ্চয়ের ফলে দীর্ঘকাল ধরে এ অঞ্চলের ভূভাগ গঠিত ও সম্প্রসারিত হয়েছে।
বর্তমান বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্রাচীনকালে বঙ্গ বা বাঙ্গাল অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের সঙ্গে চন্দ্রদ্বীপ ও বাকলা নাম দুটি বিশেষভাবে যুক্ত হয়। প্রাচীন তাম্রশাসন ও অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্রে চন্দ্রদ্বীপের উল্লেখ পাওয়া যায়। দশম শতকের গোড়ার দিকে চন্দ্রদ্বীপের সঙ্গে চন্দ্র রাজবংশের সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়; পরবর্তী সময়ে চন্দ্রদ্বীপ নামটি দক্ষিণ বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পরিচয়ে পরিণত হয়।
গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর দক্ষিণ বাংলার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির হাতে পরিবর্তিত হয়। পরবর্তী কয়েক শতকে এ অঞ্চলের সঙ্গে খড়্গ, পাল, চন্দ্র, বর্মণ ও সেন প্রভৃতি রাজবংশের রাজনৈতিক ইতিহাসের যোগসূত্র পাওয়া যায়। তবে এসব রাজবংশের প্রত্যেকটির সরাসরি ও নিরবচ্ছিন্ন শাসন বর্তমান বরিশাল বিভাগের সমগ্র ভূখণ্ডে ছিল-এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ত্রয়োদশ শতকে দক্ষিণ বাংলার রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী সময়ে দনুজমর্দনদেব-এর সঙ্গে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের প্রতিষ্ঠার ঐতিহ্য যুক্ত হয়। চন্দ্রদ্বীপের রাজধানী বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়ে শেষ পর্যন্ত মাধবপাশা গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারি বরিশাল বিভাগের ইতিহাসেও বাকলা-চন্দ্রদ্বীপকে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাকলা নামটির সঙ্গে চন্দ্রদ্বীপ নামটি মধ্যযুগে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। মোগল আমলের আইন-ই-আকবরী-তেও সরকার বাকলা-র উল্লেখ পাওয়া যায় এবং ঐতিহাসিক গবেষণায় সরকার বাকলা ও চন্দ্রদ্বীপকে মূলত একই আঞ্চলিক ভূখণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মোগল শাসন ও বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ
বাংলায় মোগল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পরও দক্ষিণ বাংলার স্থানীয় জমিদার ও রাজন্যবর্গের প্রভাব কিছু সময় অব্যাহত ছিল। চন্দ্রদ্বীপের রাজারা মোগল কর্তৃত্বের সঙ্গে কখনো সমঝোতা, কখনো বিরোধের সম্পর্ক বজায় রাখেন। ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দে মোগল বাহিনীর অভিযানের পর চন্দ্রদ্বীপের স্বাধীন রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অবসান ঘটে এবং বাকলা মোগল প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হয়।
মোগল আমলে বর্তমান বরিশাল বিভাগের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশ ছিল নদী, খাল, চর, জলাভূমি ও বনাঞ্চলপূর্ণ। ফলে এ অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ ও স্থায়ী বসতি স্থাপন উত্তর ও পশ্চিম বাংলার তুলনায় অপেক্ষাকৃত ধীরগতিতে এগোয়।
মুসলিম বসতি ও কৃষি সম্প্রসারণ
সপ্তদশ শতকের শেষভাগ ও অষ্টাদশ শতকের শুরুতে বরিশাল অঞ্চলে নতুন করে জনবসতি বিস্তার লাভ করে। এ সময় মুসলিম বসতি স্থাপনকারী, কৃষি সম্প্রসারণকারী, পীর ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।
সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে ঢাকা মোগল সুবাহ বাংলার রাজধানী হওয়ায় দক্ষিণ বাংলার সঙ্গে মোগল প্রশাসনের যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আরাকানীয় ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের তৎপরতার কারণে উপকূলীয় ও নদীবহুল দক্ষিণাঞ্চলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও স্থায়ী বসতি বিস্তার দীর্ঘদিন বাধাগ্রস্ত হয়।
১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে মোগল নৌবাহিনী চট্টগ্রাম ও মেঘনা মোহনা অঞ্চলে জলদস্যুদের শক্তি দমন করার পর দক্ষিণ বাংলার অভ্যন্তরভাগে বসতি ও কৃষি সম্প্রসারণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
মোগল প্রশাসনের কাছ থেকে ভূমির বন্দোবস্ত নিয়ে বহু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বন পরিষ্কার করে কৃষিজমি সৃষ্টি করে। এসব ভূমি-বন্দোবস্তের একটি রূপ ছিল তালুক এবং এর অধিকারীরা তালুকদার নামে পরিচিত হন। অন্যদিকে বিভিন্ন পীর ও ধর্মীয় নেতার নেতৃত্বেও নতুন বসতি গড়ে ওঠে। তাঁরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে বন পরিষ্কার ও কৃষি সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন এবং ধীরে ধীরে মোগল প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন।
আগা বাকের ও বাকেরগঞ্জ
অষ্টাদশ শতকে এ অঞ্চলের ইতিহাসে আগা বাকের খান গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি মোগল প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং
বাকলা অঞ্চলে প্রভাবশালী জমিদার হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাকেরগঞ্জ নামটির প্রচলন ঘটে। সরকারি সূত্রে ১৭৪১ খ্রিষ্টাব্দে
আগা বাকের খান তাঁর নামে একটি গঞ্জ প্রতিষ্ঠা করেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ১৭৯৭ খ্রিষ্টাব্দে বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ অঞ্চল নিয়ে বাকেরগঞ্জ জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়।
সরকারি বরিশাল জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭৯৭ সালে ঢাকা জেলার দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে এ জেলা গঠিত হয়েছিল।
প্রথমদিকে জেলার সদর দপ্তর ছিল বাকেরগঞ্জে। পরে ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দে জেলা সদর বাকেরগঞ্জ থেকে বরিশালে স্থানান্তরিত হয়। এর ফলে বরিশাল শহর ক্রমে বৃহত্তর জেলার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়।
বাকেরগঞ্জ জেলার বিস্তার ও পুনর্গঠন
ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকে বাকেরগঞ্জ জেলার সীমানা বর্তমান বরিশাল বিভাগের
চেয়েও অনেক বিস্তৃত ছিল। ১৮১৭ সালে পৃথক কালেক্টর নিয়োগের মাধ্যমে বাকেরগঞ্জ
ব্রিটিশ শাসনের অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ জেলায় পরিণত হয়। সে সময় জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল
বর্তমান খুলনা জেলার কিছু অংশ এবং ফরিদপুরের মাদারীপুর অঞ্চলের প্রায় সমগ্র অংশ।
পরবর্তী প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসে জেলার সীমানা বারবার পরিবর্তিত হয়। যেমন, ভোলা
দ্বীপ ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে বাকেরগঞ্জ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নোয়াখালী জেলার সঙ্গে যুক্ত হলেও ১৮৬৯
খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় বাকেরগঞ্জের অন্তর্ভুক্ত হয়।
উনিশ ও বিশ শতকে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে বৃহত্তর বাকেরগঞ্জ জেলা ধীরে ধীরে বিভক্ত হয়। পরবর্তীকালে বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলা পৃথক জেলা হিসেবে গড়ে ওঠে।
বরিশাল বিভাগ প্রতিষ্ঠা
বৃহত্তর বাকেরগঞ্জ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠার দাবি ব্রিটিশ আমলেও উঠেছিল। ১৯১৩-১৪ খ্রিষ্টাব্দের
Bengal District Administration Report-এ বরিশালকে কেন্দ্র করে একটি পৃথক বিভাগ গঠনের সুপারিশের উল্লেখ পাওয়া যায়; তবে সে সময় তা বাস্তবায়িত হয়নি।
অবশেষে ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি বৃহত্তর বাকেরগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে বরিশাল বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন বিভাগের নামকরণ করা হয় জেলা সদর বরিশাল-এর নামে। একই সময়ে পূর্বতন বাকেরগঞ্জ নামটি জেলা-পর্যায়ের প্রশাসনিক নাম হিসেবে বিলুপ্ত হয়; বর্তমানে বাকেরগঞ্জ উপজেলা নামটির মাধ্যমে ঐতিহাসিক নামটি টিকে আছে।