উজ্জয়িনী
প্রাচীন
ভারতের
একটি প্রখ্যাত নগরী এবং অবন্তী
মহাজনপথের উত্তরাংশের রাজধানী।বর্তমান
ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের শিপ্রা নদীর তীরে অবস্থিত
ছিল। এই শহরটি প্রাচীন ভারতের
ইতিহাস, ধর্ম এবং বিজ্ঞানের এক মিলনস্থল। অবন্তী মহাজনপদের রাজধানী হিসেবে এটি একসময় সমগ্র ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্রও ছিল। মহাকবি কালিদাসের 'মেঘদূতম' ও 'অভিজ্ঞানশকুন্তলম'-এ উজ্জয়িনীর ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং বরাহ মিহিরের মতানুসারে, উজ্জয়িনী হলো পৃথিবীর কেন্দ্রীয় দ্রাঘিমাংশ। বিশ্বাস করা হয়, মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গটি ঠিক সেই কেন্দ্রবিন্দুতে বা পৃথিবীর নাভিদেশে অবস্থিত।
উল্লেখ্য অবন্তী জনপদটি বিন্ধ্য পর্বতমালা দ্বারা দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত ছিল।
এর উত্তরাংশের রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী।
দক্ষিণাংশের এর রাজধানী ছিল মহিষ্মতী।
রাজনৈতিক ইতিহাস
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, সমুদ্র মন্থনের সময় অমৃতের কয়েক ফোঁটা যে চারটি স্থানে পড়েছিল, উজ্জয়িনী তার মধ্যে একটি। এ কারণেই এখানে কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাচীনকালে এটি 'অবন্তিকা', 'প্রতীকল্প', 'কনকশৃঙ্গ' ও 'কুশস্থলী' নামেও পরিচিত ছিল।
অবন্তীর রাজা রাজা চণ্ড প্রদ্যোত। তাঁর শাসনামলে উজ্জয়িনী একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
মৌর্য শাসনামলে সম্রাট অশোক তাঁর পিতা বিন্দুসারের রাজত্বকালে উজ্জয়িনীর রাজ্যপাল ছিলেন। মৌর্য যুগে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল।
গুপ্ত শাসনামলে চতুর্থ শতাব্দীতে সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (যিনি বিক্রমাদিত্য উপাধি ধারণ করেছিলেন) উজ্জয়িনীকে তাঁর দ্বিতীয় রাজধানী করেন। এই সময়কালকে উজ্জয়িনীর ইতিহাসের 'স্বর্ণযুগ' বলা হয়। মহাকবি কালিদাস এবং জ্যোতির্বিদ বরাহমিহির তাঁর রাজসভার 'নবরত্ন'-এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
১২৩৫ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিস উজ্জয়িনী আক্রমণ করেন এবং বিখ্যাত মহাকালেশ্বর মন্দির ধ্বংস করেন। পরবর্তীতে প্রায় ৫০০ বছর এটি মুসলিম শাসকদের অধীনে ছিল (দিল্লি সুলতানি, মালব সুলতানি ও মুঘল)।
১৮শ শতাব্দীতে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর উজ্জয়িনী মারাঠাদের দখলে আসে।
১৭১৯ খ্রিষ্টাব্দে পেশোয়ারা এখানে মারাঠা শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
১৭৫০-এর দশকে সিন্ধিয়া পরিবার উজ্জয়িনীকে তাঁদের প্রধান কার্যালয় বানান।
বর্তমান মহাকালেশ্বর মন্দিরটি মারাঠা সেনাপতি রাণোজী রাও সিন্ধিয়া পুনরায় নির্মাণ করিয়েছিলেন।
১৮১০ খ্রিষ্টাব্দে সিন্ধিয়ারা তাঁদের রাজধানী উজ্জয়িনী থেকে গোয়ালিয়রে স্থানান্তরিত করেন।
জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা
জ্যোতির্বিজ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে উজ্জয়িনী
উজ্জয়িনীর ইতিহাসের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে বিজ্ঞান। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, উজ্জয়িনী ছিল পৃথিবীর কেন্দ্রীয় দ্রাঘিমাংশ। ১৮শ শতাব্দীতে জয়পুরের রাজা দ্বিতীয় জয় সিং এখানে বিখ্যাত যন্তর মন্তর বা মানমন্দির নির্মাণ করেন, যা আজও টিকে আছে।
বাণিজ্য ও সমৃদ্ধি অবন্তী ছিল তৎকালীন ভারতের বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের সংযোগস্থলে ছিল উজ্জয়িনী। তাই এটি একটি বিশাল বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
অবন্তীতে প্রচুর পরিমাণে লোহার খনি ছিল, যা তাদের উন্নত মানের অস্ত্রশস্ত্র তৈরিতে এবং সামরিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সহায়তা করেছিল।
বৌদ্ধ ধর্ম: বুদ্ধ স্বয়ং না আসতে পারলেও তাঁর প্রধান শিষ্য মহাকাত্যায়ন সেখানে ধর্ম প্রচার করেন এবং অবন্তী বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির: এটি একই সাথে উপাসনালয় এবং সংস্কৃতিক
চর্চা কেন্দ্র ছিলল শিপ্রা নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দিরটি ভগবান শিবের প্রতি উৎসর্গিত এবং শিবভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।
ভারতের ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে মহাকালেশ্বরই একমাত্র জ্যোতির্লিঙ্গ যা দক্ষিণমুখী। হিন্দু শাস্ত্রে দক্ষিণ দিককে মৃত্যুর অধিপতি যমের দিক বলা হয়। শিব এখানে 'কাল' বা সময়ের অধিপতি হিসেবে দক্ষিণমুখী হয়ে বিরাজমান, যা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি মৃত্যুভয় থেকে ভক্তদের রক্ষা করেন। এজন্যই তাঁকে বলা হয় 'মহাকাল'—যিনি সময়েরও ঊর্ধ্বে।
এই মন্দিরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও রহস্যময় আচার হলো প্রতিদিন ভোরে অনুষ্ঠিত হওয়া ভস্ম আরতি।
প্রাচীনকালে শ্মশানের চিতাভস্ম দিয়ে এই আরতি করা হতো, যা জীবনের নশ্বরতা এবং মহাকালের অবিনশ্বরতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
বর্তমানে পবিত্র ভস্ম (বিভূতি) ব্যবহার করে এই আচার সম্পন্ন করা হয়। এই আরতি দেখার জন্য সারা বিশ্ব থেকে ভক্তরা ভিড় করেন।
তিনতলা বিশিষ্ট এই
মন্দিরটির নিচতলায় এখানে মূল মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ অবস্থিত।
দ্বিতীয় তলায় ওমকারেশ্বর শিবের মূর্তি রয়েছে।
তৃতীয় তলায় রয়েছে নাগচন্দ্রেশ্বর মন্দির। এখানে মাত্র একবার (নাগপঞ্চমীর দিন) ভক্তদের জন্য খোলা হয়।
পুরাণ মতে, ব্রহ্মা স্বয়ং এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজা চণ্ড প্রদ্যোত এবং বিক্রমাদিত্যের সময় এটি ছিল অলৌকিক সৌন্দর্যের অধিকারী।
১২৩৫ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিস এই মন্দিরটি আক্রমণ করে ধ্বংস করেন এবং লিঙ্গটি পার্শ্ববর্তী 'কোটি তীর্থ' কুণ্ডে ফেলে দেন।
১৮শ শতাব্দীতে মারাঠা সেনাপতি রাণোজী রাও সিন্ধিয়া মন্দিরটি বর্তমান রূপে পুনরায় নির্মাণ করেন।