ভিয়েৎনাম যুদ্ধ
Vietnam War
১৯৫৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলা একটি দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত।
উত্তর ভিয়েতনাম (কমিউনিস্ট) এবং দক্ষিণ ভিয়েতনাম (পুঁজিবাদী)
বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত এই যুদ্ধে উত্তর
ভিয়েৎনামকে সমর্থন করে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও
চীন, আর দক্ষিণ ভিয়েৎনামকে সমর্থন করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। যুদ্ধে প্রায় ৩০ লক্ষের বেশি মানুষ নিহত হয়, যার মধ্যে ৫৮,০০০ মার্কিন সৈন্য।
ভিয়েৎনাম যুদ্ধের পটভূমি:
ভিয়েতনাম ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল ১৯শ শতাব্দী থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান দখল করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর (১৯৩৯-১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ), হো চি মিনের নেতৃত্বে ভিয়েত মিনহ (ভিয়েতনাম স্বাধীনতা লীগ) স্বাধীনতা ঘোষণা করে
এবং
ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ১৯৪৬–১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে সংঘটিত এই
যুদ্ধকে
প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধ বলা হয়।
ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে হো চি মিনের নেতৃত্বে ভিয়েত মিনহের লড়াই
হয়। একে বলা হয় প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধ ।
এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৪
খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত । ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে জেনেভা সম্মেলনে ভিয়েতনামকে ১৭তম সমান্তরালে বিভক্ত করা হয় ।
দেশটির উত্তর াঞ্চল কমিউনিস্ট সরকার (হো চি মিন),
এবং দক্ষিণ াঞ্চল পুঁজিবাদী সরকার (নগো দিন দিয়েম)
শাসন করার অধিকার লাভ করে ।
ডোমিনো তত্ত্বের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিজমের বিস্তার রোধ করতে দক্ষিণকে সমর্থন করে।
দক্ষিণে ভিয়েত কং (গেরিলা) বিদ্রোহ শুরু হয় উত্তরের সমর্থনে।
১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে টঙ্কিন উপসাগরীয় ঘটনা (বিতর্কিত) – উত্তরের নৌ হামলার অভিযোগে মার্কিন কংগ্রেস গাল্ফ অব টঙ্কিন রেজোলিউশন পাস করে।
১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ভিয়েতনামি সরকারের পতন রোধকল্পে
সেখানে সৈন্য পাঠায়। এর ফলে এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেয়। প্রথম দিকে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ভিয়েৎনামের উল্লেখযোগ্য অঞ্চল নিজেদের অধিকারে আনতে পারলেও,
বামপন্থীদের গেরিলা আক্রমণের মুখে পড়ে, মার্কিন সৈন্যরা ব্যাপকভাবে ক্ষতির
সম্মুখীন হতে থাকে।
১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে
নিক্সন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভিয়েৎ নামে
যুক্তরাষ্ট্রের নৃশংসতা বেড়ে যায়।
এই সময় মার্কিন সৈন্যরা গণহত্যা শুরু করে।
এই যুদ্ধে মার্কিন বিমান বাহিনী নাপাম
বোমা নিক্ষেপ করে, চরম নৃসংশতার পরিচয় দেয়।
এই বৎসরের
১৬ই
মার্চ দক্ষিণ ভিয়েতনামের মাই লাই গ্রামে মার্কিন সেনাবাহিনী
গণহত্যা
চালায় । ধারণা করা হয়,
এই সময় প্রায় পাঁচশ’ লোক এতে নিহত
হয়।
মার্কিন সৈন্যরা নির্মমভাবে গেরিলা এবং সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার করেও এই যুদ্ধ
নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়। এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি সম্মানজনক উপায় বের করার চেষ্টা করে। এই লক্ষ্যে
তারা সমাজতান্ত্রিক যোদ্ধাদের সাথে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে
প্রকাশ্যে এবং গোপনে বেশ কিছু বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি
মাস থেকে আলোচনার মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করা হয়। এই সময়ে ভিয়েৎনামের
পক্ষ থেকে জুয়ান থুই, লি ডাক থো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
হেনরি কিসিঞ্জার আলোচনা করেন। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ২৩
জানুয়ারি, প্যারিসে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে - ৮০দিনের মধ্যে ছিল
মার্কিন যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেয়া, যুদ্ধবিরতি কার্যকৱর করা এবং দক্ষিণ
ভিয়েতনামে সাধারণ নির্বাচন দেওয়া। ২৩ জানুয়ারি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও,
কিছু অঞ্চলে তখনও যুদ্ধ চলছিল। ইতিমধ্যে ২৯ মার্চের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
তাদের সেনা প্রত্যাহার করে। কিন্তু উত্তর ভিয়েতনামে বোমাবর্ষণ অব্যাহত ছিল। এরই
সূত্রে উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে মে ও জুন মাস পর্যন্ত
কিসিঞ্জার এবং থো শান্তি চুক্তির উত্তরণে প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। ১৯৭৩
খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই জুন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর ভিয়েতনাম যৌথভাবে
প্যারিস চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বাক্ষর করে। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে
সাম্যবাদী শাসনের অধীনে দুই ভিয়েৎনাম একত্রিত হয়। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে এটি
সরকারীভাবে ভিয়েৎনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নাম ধারণ করে।
এই যুদ্ধে প্রায় ৩২ লক্ষ ভিয়েতনামি মারা যান। এর সাথে আরও প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ
লাও ও ক্যাম্বোডীয় জাতির লোক মারা যান। আর মার্কিনীদের প্রায় ৫৮ হাজার সেনা নিহত
হন।
ভিয়েৎনাম যুদ্ধের সময়
সপ্তম নৌবহরকে ব্যবহার
করা হয়েছিল। বিশেষ করে এই নৌবহর থেকে পরিচালিত হতো ভিয়েৎনামের অভ্যন্তরে বিমান
আক্রমণ। ভিয়েৎনামের পাহাড়ি জঙ্গলময় অঞ্চলে সৈন্য সরবরাহ, সৈন্যদের রসদ যোগানো,
সুনির্দিষ্টভাবে কোনো জায়গায় আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা হতো নানা ধরনের প্রায়
১২০০০ হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছিল। অবশ্য প্রায় ৫০০০ হেলিকপ্টার ভিয়েৎনামী
গেরিলারা ধ্বংস করে দিয়েছিল। এর ভিতরে উল্লেখযোগ্য হেলিকপ্টার ছিল-
-
হিউ
: (বেল ইউএইচ-১ ইরোকুইস:
সৈন্য, মালামাল পরিবহনে জন্য হেলিক্প্টার। ফায়ার সাপোর্ট হিসেবেও ব্যবহার
হয়েছে। এই হেলিকপ্টারে ১৪ জন সৈন্য বহন করা যায়। আমেরিকার তৈরি করা
হেলিকপ্টারের মধ্যে এটিই সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি (বিশ্বে ২য়)। এটি ১৬০০০ এর বেশি
তৈরি হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রায় ৭০০০ হিউ ব্যবহৃত হয়। তার মধ্যে ৩৩০৫টি
ধ্বংশ হয়েছিল।
- বেল এএইচ-১ কোবরা:
তৎকালীন মার্কিন সেনাবহিনীর প্রধান আক্রমণ চালানোর উপযোগী হেলিকপ্টার। একে অনেক
সময় হিউকোবরা নামেও ডাকা হতো। এর উন্নত সংস্করণ 'সুপারকোবরা' মার্কিন নৌসৈনারা
প্রধান আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
এই
হেলিকপ্টারে ১জন চালক এবং ১ জন অস্ত্রচালক থাকে। ভিয়েতনামে এই হেলিকপ্টার দিয়ে
প্রথম ব্যাপক গুলি করে গেরিলাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হতো। পরে হিউ হেলিকপ্টার
দিয়ে আমেরিকান সৈন্যরা ভূমিতে অবতরণ করতো। বেল-এর ছত্রছায়ায় হিউ হেলিকপ্টারের
দূরবর্তী মার্কিন সৈন্যদের রসদ সরবরাহ করা হতো।
ভিয়েৎনাম যুদ্ধের সময় গেরিলাদের কাছে এই হেলিকপ্টার আতঙ্কের ছিল। প্রথম দিকে এই
হেলিকপ্টার ভিয়েৎনামের জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে সাফল্য পেলেও, পরে এই হেলিক্পটার
গেরিলার ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। ফলে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে ভিয়েৎনামী
গেরিলাদের বিরুদ্ধে মার্কিন হেলিকপ্টার প্রায় অকার্যকর হয়ে উঠে। এই যুদ্ধে
প্রায় ১১০০ এর বেশি কোবরা গানশিপ ব্যবহার করা হয়েছিল। এর ভিতর গেরিলারা প্রায়
৩০০ কোবরা ধ্বংশ করতে সক্ষম হয়েছিল।
- বোয়িং সিএইচ-৪৬ সী-নাইট:
মাঝারী সাইজের ট্যানডম রোটর ট্রান্সপোর্ট হেলিকপ্টার। মার্কিন নৌবাহিনীতে এই
হেলিকপ্টার বেশি ব্যবহৃত হয়। এতে ২৫ জন্য সৈন্য বহন করা যায়।
- বোয়িং সিএইচ-৪৭ শিনুক:
হেভি ট্যানডম রোটর ট্রান্সপোর্ট হেলিকপ্টার। মার্কিন নৌবাহিনীতে এই হেলিকপ্টার
বেশি ব্যবহৃত হয়। এতে ৩৫-৫৫ জন্য সৈন্য বহন করা যায়।
- সিকোরস্কি এইচ-৩৪ চকটাও:
এটি সাবমেরিন বিধ্বংসী হেলিকপ্টার। তবে সৈন্য ও মালামাল পরিবহনে এই হেলিক্প্টার
ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে মার্কিন নৌ বহিনীতে এই হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়
না।
- সিকোরস্কি এইচএইচ-৩ জলি গ্রিন
জায়ান্ট:
এটি মাঝারী ধরনের পরিবহন হেলিকপ্টার এই হেলিকপ্টার দিয়ে সৈন্য সরবরাহ এবং কোনো
স্থান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার বা উদ্ধারের জন্য ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে মার্কিন
নৌ বহিনীতে এই হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয় না।
- সিকোরস্কি সিএইচ-৫৩
সী-স্ট্যালিয়ন:
অত্যন্ত শক্তিশালী, অধিক ভারবহনযোগ্য সরবরাহ হেলিকপ্টার। তবে এর আক্রমণ করার
ক্ষমতাও ছিল। এর উন্নত সংস্করণ সুপার স্ট্যালিয়ন বর্তমানে মার্কিন নৌ বহিনীর
সবচেয়ে বড় হেলিকপ্টার।