বাংলা অ-এর উচ্চারণ প্রকৃতি
ইন্দো-ইরানিয়ান ভাষা পরিবার-এর ক্রমবিবর্তনের ধারায়, ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে যখন স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা'র উদ্ভব হয়ে. তখন শব্দরূপের নানা পরিবর্তন ঘটে। এই বিবর্তনের ধারায় বাংলা বর্ণের ধ্বনি রূপেরও নানা পরিবর্তন ঘটে। বাংলা বর্ণের প্রথম স্বরধ্বনিতে এই পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।

বাংলালিপি যেমন নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান রূপটি লাভ করেছে। বাংলা শব্দের উৎসের বিচারে- পাওয়া সংস্কৃত, প্রাকৃত, দেশী এবং বিদেশী শব্দের সমাহারে বাংলা শব্দের উচ্চারণে একটি স্বতন্ত্র রূপ তৈরি হয়েছে।

সংস্কৃত ভাষায় ব্যবহৃত অ ধ্বনিটি তীর্যক। এই রূপটি বর্তমানে হিন্দি ভাষাতে পাওয়া যায়। সংস্কৃত ভাষায় অ উচ্চারণটি তীর্যক এবং উচ্চারণ রীতি হিসেবে অ-এর  নাসিক্য ও সানুনাসিক ভেদ রয়েছে। এছাড়া অ-ধ্বনিকে হ্রস্ব-দীর্ঘ উচ্চারণভেদে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এই তিনটি ভাগ হলো- হ্রস্ব, দীর্ঘ, প্লুত। মাত্রাগত বিচারে হ্রস্ব ১ মাত্রা, দীর্ঘ ২ মাত্রা এবং প্লুত ৩ মাত্রা। এরপর এর প্রতিটি ভাগকে আবার উদাত্ত, অনুদাত্ত ও স্বরিত হিসাবে বিভক্ত করা হয়েছে। এই হিসাবে প্রাথমিকভাবে অ-এর উচ্চারণ সংখ্যা দাঁড়ায় মাট ৯ প্রকার। এই প্রকারগুলি হলো

 
১. হ্রস্ব উদাত্ত
২. হ্রস্ব অনুদাত্ত     
৩. হ্রস্ব স্বরিত
৪. দীর্ঘ উদাত্ত     
৫. দীর্ঘ অনুদাত্ত    
৬. দীর্ঘ স্বরিত
৭. প্লুত উদাত্ত     
৮. প্লুত অনুদাত্ত    
৯. প্লুত স্বরিত

বাংলাতে অ’-এর উচ্চারণে, হ্রস্ব-দীর্ঘ ভেদ ততটা সংস্কৃত ব্যাকরণের সূত্রের মতো অতটা প্রকট নয়, কিন্তু অল্প-বিস্তর আছে। বিশেষ করে 'অ' ধ্বনিটি যখন কোনো শব্দের আগে বসে 'না-বোধক' ভাব প্রকাশ করে, তখন 'অ'-এর উচ্চারণ একটি দীর্ঘ করলে, 'না-বোধক' ভাবটা ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়। এই বিচারে যে সকল ক্ষেত্রে অ-এর উচ্চারণকে দীর্ঘ করলে, শব্দের (
Word) অর্থগত বা ভাবগত স্বচ্ছতা আসে, সেখানে অ-কে দীর্ঘ করলে ভালো হয়। যে নিয়মে এই জাতীয় উচ্চারণগুলো, যে সকল ক্ষেত্রে মানা যেতে পারে, তা হলো
শব্দের (Word) ক্ষেত্রে
১. যে সকল শব্দের আদ্য অ, না-বোধক ভাব প্রকাশ করে, সে ক্ষেত্রে অ ধ্বনিকে একটু দীর্ঘ করলে, না-ভাবটি যথার্থ ফোটে। অবশ্য ছোট করে বললেও তার অর্থ পাল্টে যায় না। এই জাতীয় শব্দগুলো হলো
অকপট, অনিয়ম, অসত্য ইত্যাদি।
২. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘ভাষা প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ গ্রন্থে  একাক্ষর ধ্বনি বিশিষ্ট শব্দের আদ্য অ দীর্ঘ হয় বলে দাবি করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি জল, বর শব্দ দুটির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি দুই অক্ষরে ক্ষেত্রে তিনি অ-এর হ্রস্ব স্বর উচ্চারণের বিষয়টি নিয়মের ভিতরে ফেলতে চেয়েছেন। কিন্তু একনিষ্ঠতার বশবর্তী হয়ে একে মান্য করা যায় না। কারণ এই নিয়মে সবাই যে অ-এর হ্রস্ব-দীর্ঘ রীতি মেনে চলেন, তা বলা যায় না। যখন কেউ চট করে বলেন
জল দে। তখন জল-এর অ (জ্ +অ) চটজলদি থেমে যায়। আবার যখন অনেক দিন পর কারো সাথে কারো দেখা হওয়ার পর, আবেগের বশে বলেন ‘ক--ত--দিন পরে দেখা হলো, বলতো’ তখন সুনীতিকুমারের দুই অক্ষরের নিয়মের বাঁধে ফাটল ধরে। যুক্তবর্ণের পূর্ববর্তী অ-কে হ্রস্ব করার প্রবণতা সবার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তবে বিভিন্ন ব্যক্তি এর এত বেশি ব্যতিক্রম দেখানো শুরু করতে পারেন যে, ব্যতিক্রমটাই নিয়ম মনে হতে পারে।

মূলত অবিরাম কথা বলার সময়, বক্তা অর্থভেদে শব্দের কোনো কোনো ধ্বনিকে প্রলম্বিত করে, কোনটির উপর বেশি ঝোঁক দেয়। যেগুলো বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে বটে, কিন্তু বানান একই থাকে। এমন শব্দের উচ্চারণ অর্থানুসারে সুক্ষ্ম পার্থক্য সৃষ্টি করে। অভ্যাসগতভাবে এই উচ্চারণ আমাদের কাছে এতটাই স্বভাবে পরিণত হয় যে, আমরা সহজে তা বুঝে উঠতে পারি না। 
বাংলা ভাষার অ-এর ধ্বনি বৈশিষ্ট্য
বাংলা শব্দে 'অ' বর্ণটি দুই ভাবে উচ্চারিত হয়। এর একটি হলো 'ও' -এর মতো, অপরটি 'অ'-এর মতো। ধ্বনি তত্ত্বে এই দুটি রূপকে বিশেষ নামে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। এই ভাগ দুটি হলো
বিবৃত মধ্য ও সংবৃত মধ্য।
ধ্বনির বিচারে বাংলা শব্দের অ-এর রূপ
বাংলা বর্ণমালায় 'অ' ধ্বনি জন্য চিহ্ন হলো-'অ'। কিন্তু যখন ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে যুক্ত থাকে, তখন তার জন্য কোনো পৃথক চিহ্ন ব্যবহৃত হয় না। এই কারণে অ-কারের জন্য কোনো চিহ্ন নেই। ধ্বনির বিচারে 'অ' স্বাধীনভাবে বা ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে থাকতে পারে। এই বিচারে অ-ধ্বনিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন
শব্দ গঠনে অ-এর সংখ্যা
এক বা একাধিক অ-ধ্বনি নিয়ে শব্দ গঠিত হতে পারে। যেমন

একটি অ-ধ্বনি= অ ( মেয়ে কি করিস ?)
                     ক (এ বিষয় কি বলার আছে, )
দুটি অ-ধ্বনি= অত, কত, শত ইত্যাদি।
তিনটি অ ধ্বনি=অমল, কতক, শতক ইত্যাদি।
চারটি অ ধ্বনি =অবনত, শতদল ইত্যাদি।
শব্দে অ-ধ্বনির অবস্থান:
একাধিক অ-ধ্বনি যুক্ত শব্দে অ-ধ্বনি আদি, মধ্য ও অন্ত্যে থাকতে পারে। মধ্যবর্তী অ-ধ্বনি আবার হতে পারে, তৃতীয় বা চতুর্থ অবস্থানে। এসব বিবেচনা করে বাংলা শব্দে অ-এর অবস্থানকে নিচের ছকের মতো করে সাজাতে পারি।
অ-ধ্বনি এবং অ-বর্ণের দ্বন্দ্ব
লিখিত আকারে বাংলা শব্দে যেভাবে অ-বর্ণটি পাওয়া যায়, তার সবগুলোর উচ্চারণ প্রকৃতি এক রকম হয় না। মুক্ত অ-এর ক্ষেত্রে উচ্চারণগত সমস্যা দেখা না গেলেও যুক্ত-অ ধ্বনি অনেক সময়ই আমাদের বিভ্রান্ত করে। যেমন
অমল= শেষের ল ধ্বনি রুদ্ধ হয়।
কত= শেষের ত ধ্বনি ওকারান্ত হয়।
বল= আদ্য ব ধ্বনি অর্ধ-বিবৃত হয়।
কবি= আদ্য ক ধ্বনি অর্ধ-সংবৃত হয়। ফলে 'ক' হয়ে যায় 'কো'।
অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে ও-কার যুক্ত করে সমস্যা দূর করা যায়, এবং তা কেউ কেউ করেও থাকেন। যেমন 'কোন' শব্দটি 'কোন্' না 'কোনো' উচ্চারণ করা হবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি হতেই পারে। তাই অনেক সময় -লিখিত রূপে কোনো' বানান অনুসরণ করা হয়। সাধারণত বাংলা শব্দে শব্দের মাঝখানে 'মুক্ত অ' থাকে না। কিছু বিদেশী শব্দে অনেকে শব্দের মাঝখানে 'মুক্ত অ' ব্যবহৃত হয়। যেমন সফ্‌টঅয়্যার। কিন্তু কারচিহ্ন-বিহীন ব্যঞ্জনবর্ণ প্রচুর শব্দ রয়েছে। এ সকল শব্দের কারচিহ্ন-বিহীন বর্ণগুলোকে মুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। যেমন কমল, কতক ইত্যাদি। আবার একাধিক বর্ণ নিয়ে গঠিত শব্দের শেষে অবস্থিত 'মুক্ত অ' এবং 'ব্যঞ্জনবর্ণযুক্ত অ'। আধুনিক বাংলায় শব্দের শেষে মুক্ত-অ ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু মধ্যযুগীয় বাংলায় 'অ' ক্রিয়া-বিভক্তি হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। যেমন হঅ গরুর রাখোআল, বোল আকাশ পাতাল/শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। 

অ-ধ্বনির উচ্চারণ সূত্র
১. অ-ধ্বনির সংখ্যা: এক বা একাধিক অ-ধ্বনিযুক্ত শব্দ থাকতে পারে। এর ভিতরে একক অ ধ্বনি অ-ধ্বনির উচ্চারণ অর্ধ-বিবৃত অ ( ɔ) হয়। এই সূত্র অন্যান্য কোনো সূত্রের সাথে সংঘাত সৃষ্টি করে না।

২. অ-ধ্বনির অবস্থান: একাধিক অ-ধ্বনি নিয়ে গঠিত শব্দের অ-এর উচ্চারণ 'অ' না 'ও' হবে তা নির্ভর করে, শব্দে অ-এর অবস্থান (আদ্য, মধ্য ও অন্ত্য), অর্থ এবং অগ্র-পশ্চাৎ স্বরধ্বনির ধ্বনির উপর। এর ভিতর অ-এর অবস্থান-ই (আদ্য, মধ্য ও অন্ত্য) মূখ্য ভূমিকা রাখে। অর্থ এবং অন্যান্য স্বরধ্বনির প্রভাব সুনির্দিষ্ট স্থানের অ-ধ্বনির উপর বর্তায়। এই কারণে অ-ধ্বনির অবস্থানের বিচারে নিচের সূত্রাদি অনুসৃত হয়ে থাকে।
২.১.আদ্য অ ধ্বনি:
একাধিক  অ-ধ্বনিযুক্ত শব্দের শুরুতে যে অ-ধ্বনিটি থাকবে, তাকেই আদ্য অ-ধ্বনি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই অ-ধ্বনি অর্ধ-বিবৃত (অ) বা অর্ধ-সংবৃত (ও) হতে পারে। অ-ধ্বনির এই পরিবর্তন সংঘটিত হতে পারে- অ-এর নঞর্থকতার বিচারে বা পরবর্তী স্বরধ্বনির দ্বারা প্রভাবে।
২.১.১. নঞর্থক অ: এই অ-ধ্বনি সকল সময় মুক্ত 'অ' হিসেবে থাকে এবং এই অ-ধ্বনি কোনো কোনো শব্দের মূল অর্থকে ভিন্নার্থে প্রকাশ করে। এই অর্থে এই অ-ধ্বনি নঞর্থক। নয় অর্থে না-বোধক হলেও সকল অর্থে নয়। যেমন 'অকুমারী' শব্দের অ-ধ্বনি। এর না-বোধক অর্থ হলো 'কুমারী নয়'। হিন্দু শাস্ত্রমতে ১২ বৎসর (তন্ত্রমতে ১৬ বৎসর) পর্যন্ত অবিবাহিতা কন্যাকে কুমারী বলা হয়। এর চেয়ে বেশি বয়সী অবিবাহিতা কন্যা কুমারী নয়। এই অর্থে অকুমারীর অর্থ দাঁড়ায় 'খাঁটি কুমারী'। কিন্তু সাধারণভাবে কুমারী শব্দ ব্যবহার করা হয় অবিবাহিতা কন্যাকে। এর সাথে বয়সের কোনো সম্পর্ক নেই। 

নঞর্থক অ ধ্বনি সব সময় অর্ধ-বিবৃত অ
ɔ হবে।
অকুমারী (ɔkumari): অ (নয়) কুমারী
অবিরাম (
ɔbiram): অ (নাই) বিরাম
অনিমেষ (
ɔnimeʃ): অ (নয়) নিমেষ
অপূর্ব (
ɔpurbbo): অ (নয়) পূর্ব
২.১.২. সহ-অর্থ বা বিশুদ্ধভাব প্রকাশ  অ : 'সাথে আছে'  অর্থকে প্রকাশ করে, এমন স-এর সাথে যুক্ত অ অর্ধ বিবৃত হবে। যেমন
               সস্ত্রীক (
ʃɔst̪rik): স (সহিত) স্ত্রী +ক স্বার্থে। স্ত্রীর সহিত বর্তমান।
২.১.৩. নঞর্থক এবং সহ-অর্থক ভিন্ন শব্দ: শব্দের আদিতে যদি 'মুক্ত অ' বা 'ব্যঞ্জনযুক্ত অ' ধ্বনি থাকে এবং তা যদি নঞর্থক বা সহ-অর্থক না হয়, তা হলে অ-এর ধ্বনি সূত্রে কতকগুলো বিধিকে অনুসরণ করবে।
২.১.৩.১ পরবর্তী স্বরধ্বনির প্রভাব বিধি:
শব্দের আদিতে যদি মুক্ত 'অ' বা ব্যঞ্জনযুক্ত ধ্বনি থাকে এবং এর পরবর্তী ধ্বনি হিসেবে 'ই, উ, ঋ ধ্বনি থাকলে, অ 'অর্ধ-সংবৃত' হবে। যেমন
   
ই ধ্বনি: এই ধ্বনি বানানের বিচারে ই, ই-কার , ঈ, ঈ-কার হিসেব থাকতে পারে।
  • আদি বর্ণ মুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ই আছে। যেমন  অই>ওই (oi)
  • আদি বর্ণ মুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ই-কার আছে। যেমন অতি>ওতি (ot̪i )
  • আদি বর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ-যুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ই-কার আছে। যেমন কবি>কোবি (ko̪bi )
  • আদি বর্ণ মুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঈ আছে, এমন বাংলা শব্দ নাই।
  • আদি বর্ণ মুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঈ-কার অতীত>ওতিত (ot̪it̪ )
  • আদি বর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ-যুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঈ আছে, এমন শব্দ বাংলাতে নাই।
  • আদি বর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ-যুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঈ-কার আছে। যেমন রথী>রোথি (rot̪ʰi̪ )
উ ধ্বনি:  এই ধ্বনি বানানের বিচারে উ, উ-কার, ঊ, ঊ-কার হিসেব থাকতে পারে।
  • আদি বর্ণ মুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে উ আছে। যেমন  অউনিঞা>ওউনিয়াঁ (ouniã̪ )
  • আদি বর্ণ মুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে উ-কার। যেমন অকু>ওকু ( oku )
  • আদি বর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ-যুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঊ আছে এমন শব্দ বাংলাতে নাই।
  • আদি বর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ-যুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঈ-কার। যেমন গরু>গোরু (goru )
  • আদি বর্ণ মুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঊ আছে এমন শব্দ বাংলাতে নাই।
  • আদি বর্ণ মুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঊ-কার সাথে ঊ আছে এমন শব্দ বাংলাতে নাই।
  • আদি বর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ-যুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঊ আছে এমন শব্দ বাংলাতে নাই।
  • আদি বর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ-যুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঊ-কার। যেমন বধূ>বোধু (bod̪ʰu )
ঋ-ধ্বনি:
  • আদি বর্ণ মুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঋ আছে এমন শব্দ বাংলাতে নাই।
  • আদি বর্ণ মুক্ত 'অ' এবং পরবর্তী বরর্ণের সাথে ঋ-কার। যেমন যকৃত>যোকৃত ( ɟokrit̪o )
আ, এ, ঐ, ও, ঔ ধ্বনিসমূহ: এই সকল ধ্বনি বানানের বিচারে আ, এ , ঐ, ও ,ঔ বা এদের কারচিহ্ন হিসেবে থাকতে পারে। এ সকল ক্ষেত্রে আদ্য অ অর্ধ-বিবৃত হবে।   
  • আ অআকখ (ɔakʰɔ )
  • অকা (ɔka ) [আসামের সীমান্তবর্তী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিশেষ।
  • এ    অএ (ɔe ) [সম্বোধনার্থে]
           অনেক (
    ɔnek
  • ও    অওরো (ɔoro ) [সুলভ হওয়া]
পরবর্তী বর্ণের সাথে য-ফলাযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ আছে এমন শব্দ: শব্দের আদিতে যদি মুক্ত 'অ' বা ব্যঞ্জনযুক্ত শব্দ থাকে, এবং এর পরবর্তী বর্ণ হিসেবে 'য-ফলাযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ, থাকলে, ওই অ 'অর্ধ্ব-সংবৃত' হবে। যেমন অদ্য (od̪d̪o ), কল্য (koll̪o)

কিছু ব্যতিক্রমধর্মী শব্দও পাওয়া যায়। যেমন- বন্ধ্যা (বন্‌ধা)।কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানান সংস্কার সমিতির সিদ্ধান্ত অনুসারে, বর্তমানে রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হয় না। ফলে বর্তমানে রেফ্-যুক্ত য-এর সাথে য-ফলা বসে না। কিন্তু ওই সকল ক্ষেত্রে য-ফলা না বসলেও অ-এর উচ্চারণ ও-কারের মতোই হবে। যেমন চর্যাপদ ( corɟɟapɔd)।

পরবর্তী বর্ণ হিসেবে ক্ষ বা জ্ঞ আছে এমন শব্দ : শব্দের আদিতে যদি মুক্ত 'অ' বাা ব্যঞ্জনযুক্ত শব্দ থাকে, এবং এর পরবর্তী বর্ণ হিসেবে ক্ষ বা জ্ঞ থাকে, তবে ওই অ 'অর্ধ্ব-সংবৃত' হবে। যেমন


             অক্ষ (
okkʰo )
             বক্ষ (
bokkʰo )
             যজ্ঞ (
ɟogg̃o )
কিন্তু যদি ক্ষ-এর সাথে অন্য বর্ণ যুক্ত থাকে তবে অ-এর উচ্চারণ অর্ধ-বিবৃত হবে। যেমন

             লক্ষ্মণ      (
lɔkkʰ̃on )।
             যক্ষ্মা      (
ɟɔkkʰ̃a)।

আদ্য ব্যঞ্জন বর্ণটি যদি র-ফলা যুক্ত হয়: শব্দের আদিতে র-ফলা যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ থাকে, এবং এর সাথে কোনো কারচিহ্ন না থাকে, তবে ওই বর্ণটির সহগ-অ 'অর্ধ্ব-সংবৃত' হবে। যেমন

              ব্রত      (
brot̪o )।
              শ্রবণ     (
srobon )।
   কিন্তু র-ফলা যুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনিটির পরে যদি য় থাকে, তবে অর্ধ-বিবৃত হবে। যেমন

            ক্রয় (
krɔĕ )

                অর্ধ্ব-সংবৃত:    মন     (mon )।
                                      বন   (
bon )
                অর্ধ বিবৃত:      রণ (
rɔn )
                                      পণ (
pɔn )
২.২ মধ্য-অ [তিন বা ততোধিক বর্ণ নিয়ে গঠিত শব্দের আদি এব্ং অন্ত্য বর্ণের মধ্যবর্তী সকল বর্ণকে মধ্যবর্তী বর্ণ হিসেবে]
২.২.১. শব্দের মাঝখানে সাধারণত মুক্ত অ থাকে না। কিন্তু কেউ কেউ বিদেশী শব্দের মাঝে মুক্ত অ ব্যবহার করে থাকেন। উচ্চারণের স্বার্থে এই জাতীয় শব্দে শব্দের মাঝখানে মুক্ত অ বসে। এক্ষেত্রে বিদেশী শব্দের ধ্বনি রীতিই অনুসরণ করা হয়। যেমন
              সফ্‌ট্অয়্যার

২.২.২. তিন বর্ণে গঠিত শব্দের মধ্য অ- এর আগে যদি অ, আ, এ এবং ও-কার থাকে তবে এবং পরের বর্ণের সাথে অন্য কোনো কার চিহ্ন না থাকে। তবে পদমধ্য অ-এর উচ্চারণ অর্ধ্ব-সংবৃত হয়। যেমন

              অ-যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনি        কমল (kɔmol )
              আ-যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনি       কাজল (
kaɟol )
              এ-যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনি       বেতন (bet̪on )
              ও-যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনি       লোচন (
locon )

* কোনো শব্দের আদিতে যদি আ ধ্বনিটি প্রসারণ বা বিস্তৃত অর্থ প্রকাশক হয়, তা হলে মধ্যবর্তী অ ধ্বনি ওকারন্ত হবে না। যেমন

আনত       আ-নতো  (a-nɔt̪o )।
আনম্র       আ-নম্‌ম্রো  (
a-nɔmmro )।
কিন্তু শব্দের আদিতে অবস্থিত অ যদি না বোধক এবং স যদি সহিত-অর্থে ব্যবহৃত হয়, তবে মধ্য অ এর উচ্চারণ অর্ধ্ব-বিবৃত হবে। যেমন
             অমল (
ɔmɔl )
             সজল (
ʃɔɟɔl )
২.২.৩. তিন বর্ণে গঠিত শব্দের মধ্য অ- এর আগে যদি ই, ঈ বা ই-কার, ঈ-কার থাকে তবে, পদমধ্য অ-এর অর্ধ-বিবৃত হয়। যেমন

              ঈ-যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনি        জীবন (
ɟibɔn )

২.২.৪.
তিনের অধিক বর্ণে গঠিত শব্দের মধ্যবর্তী বর্ণসমূহের উচ্চারণ ২.২.২. সূত্র অনুসারে বিচার করা যাবে না। যেমন 'কঠোরতা'। এই শব্দের মধ্যবর্তী বর্ণসমূহ 'ঠোর'। যদি 'ঠোরতা'র উচ্চারণকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা যায়, তাহলে উচ্চারণ হয় ঠো.রো.তা [২.২.২ সূত্রানুসারে]। কিন্তু এখানে উচ্চারণ হবে ঠোরতা। মূলত শব্দের আদ্য বর্ণের প্রভাব দ্বিতীয় বর্ণ পর্যন্ত কার্যকরী হয়, তৃতীয় বর্ণে তার প্রভাব পড়ে না। তাই কঠোরতা শব্দটির উচ্চারণ হবে 'ক.ঠো,র.তা'। উল্লেখ্য এর আগে নঞর্থক অ ধ্বনি থাকলে, অর্ধ-বিবৃত হবে এবং অবশিষ্ট ধ্বনিগুলো ২.২.২ এবং ২.২.৩ ধ্বনিরীতি অনুসারে হবে।

২.২.৫. শব্দ মধ্যস্থিত অ (ব্যঞ্জনবর্ণে যুক্ত) আদ্য-অ এর মতোই ই-কার, ঈ-কার, উ-কার, ঊ-কার, ঋ-কার, ক্ষ, জ্ঞ, য-ফলার আগে থাকলে উক্ত অ-এর উচ্চারণ সাধারণত অর্ধ্ব-সংবৃত হয়ে থাকে।

              ই-কার যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনি           কাকলি (
kakoli )
              ঈ-কার যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনি           জননী (
ɟɔnoni )
              উ-কার যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনি           অতনু (
ɔt̪onu )
              ক্ষ  ধ্বনি                              অদক্ষ (
ɔd̪okkʰo )
              য-ফলা যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনি           অকথ্য (
ɔkot̪t̪ʰo )
              জ্ঞ-ফলা যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনি          দৈবজ্ঞ (
d̪oiboggõ )
২.২.৬. অব্, উপ উপসর্গযুক্ত শব্দের অব-র শেষের ব ওকারান্ত হবে।
            অবরোহ    =অবোরোহ (
ɔ.bo.ro.ɦo)
            উপলব্ধি    = উ.পো.লোব্.ধি (
u.po.lob.d̪ ʰi)
২.২.৬. এমন কিছু সমাসবদ্ধ তৎসম শব্দ আছে, যেগুলি পৃথকভাবে উচ্চারণের সময় হসন্তযুক্ত হয়ে উচ্চারিত হলেও সমাসবদ্ধ অবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে অর্ধ্ব-সংবৃত হয়। তবে এই জাতীয় শব্দগুলোতে ব্যতিক্রমের ছড়াছড়ি। তাই গুরুমুখী বিদ্যার মতো এগুলো শুনে বা পড়ে জানতে হয়।
            ফুল্ +শর্ = ফুলশর         (
pʰuloʃɔr )
            মেঘ +মল্লার=মেঘমল্লার    (
megʰomɔllar )

ব্যতিক্রম: রাজপুত্র [
draɟput̪t̪ro ]। এরূপ- রাজনীতি।
২.৩.শব্দান্ত অ : শব্দান্ত অ-এর উচ্চারণে নিয়ম আছে আবার ব্যতিক্রমও প্রচুর। কিছু সূত্র আছে, যাদেরকে নির্ভেজাল সূত্রে বাঁধা যায়। যেমন
২.৩.১. ১১ থকে ১৮ পর্যন্ত সংখ্যাবাচক শব্দের অন্ত্য অ, অর্ধ্ব-সংবৃত হয়। যেমন
 
          এগার (এ্যাগারো), বার (বারো) ইত্যাদি।
২.৩.২.-ত এবং -ইত প্রত্যয়যুক্ত শব্দের অন্ত্য অ অর্ধ্ব-সংবৃত হয়। যেমন যেমন
 
        চলিত (চোলিত), বিদিত (বিদিতো)।
কিন্তু এইরূপ কোনো শব্দ যদি পদবী হিসাবে ব্যবহৃত হয়, তবে শব্দান্তের অ অবিকৃত থাকে। যেমন
 পালিত [পালিত্]।
২.৩.৩. বিশেষ্যবাচক শব্দ এবং ক্রিয়াপদের শেষে হ থাকলে, এবং বিশেষণবাচক শব্দের শেষে ঢ় থাকলে, তবে উক্ত হ এবং ঢ় অর্ধ্ব-সংবৃত হয়। যেমন

        দেহ  (দেহো)
        গাঢ় (গাঢ়ো)

        দেহ, লহ, বহ ইত্যাদির শেষে হ ধ্বনি হো হয়ে যায়।

বিশেষণ রূপে ব্যবহৃত কোনো কোনো শব্দের অন্তিম অ, অর্ধ্ব-সংবৃত হয়।  যেমন

             ভাল  [
bʰalo]
             কাল [রঙ] [kalo]
ব্যতিক্রম : নীল [রঙ]  [nil]

২.৩.৪. ই বা এ-কারের পরে য় (ইয়) থাকলে, উক্ত য়-এর উচ্চারণ অর্ধ্ব-সংবৃত হয়। যেমন যেমন


        প্রিয় (প্রিয়ো), তুলনীয় (তুলোনীয়ো)

কিন্তু যদি অ বা আ-ধ্বনির পরে য় থাকে, তবে উক্ত য়-এর উচ্চারণ হসন্তযুক্ত হয়। যেমন
নয়, আয় ইত্যাদি।
২.৩.৫.শব্দের শেষের অ-এর আগে যদি ঐ, ঔ, ং, ঃ, ঋ-কার থাকে, তবে উক্ত অ লুপ্ত না হয়ে ও-কারের মতো উচ্চারিত হয়।  যেমন

                    বৃষ (বৃশো)
                    তৈল (তোইলো)
                    সৌধ (শোউধো)
                    অংশ (অঙ্‌শো)
                    দুঃখ (দুক্‌খো )
২.৩.৬. দ্বিরুক্ত বিশেষণের অন্তিম অ, অর্ধ্ব-সংবৃত হয়। যেমন

                    ছল-ছল (ছলো-ছলো)
                    ঝরঝর (ঝরোঝরো)
কিন্তু কোনো কোনো দ্বিরুক্ত শব্দের অন্ত অ হসন্তযুক্ত হয়। যেমন- মড়মড় (মড়্মড়্), তরতর (তর্‌তর্)।

২.৩.৭.  ন প্রত্যায়ান্ত শব্দের অন্তিম অ, অর্ধ্ব-সংবৃত হয়। যেমন

          শেখান (শেখানো), পাঠান (পাঠনো)।

কিন্তু অনুজ্ঞা বাচক শব্দের ক্ষেত্রে হসন্ত উচ্চারিত হয়। যেমন যেমন

         পাঠান (পাঠান্), লেখান (লেখান্)
২.৩.৮. -তর, -তম প্রত্যয়যুক্ত বিশেষণ পদের অন্ত্য-অ অর্ধ্ব-সংবৃত হয়।  যেমন  
          অধিকতর (অধিকোতরো), অধিকতম (অধিকোতমো)
 
২.৩.৯.  -ইব, -ইল, -ইতেছে, -ইতেছিল, -ইয়াছিল ইত্যাদি প্রত্যয় যোগে যে সকল ক্রিয়াপদ গঠিত হয়, তাদের অর্ধ্ব-সংবৃত হয়। যেমন

                করিব, চলিল, বলিব, যাইতেছ, গিয়াছিল ইত্যাদি।
২.৩.১০.  শব্দান্তে যদি দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনবর্ণের যুক্তবর্ণ থাকে, তবে অন্ত্য-অ অর্ধ্ব-সংবৃত মতো হয়। যেমন
 
            শক্ত<শক্‌তো, দ্বন্দ<দন্‌দো।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :
  • চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী, হিন্দি, মারাঠি প্রভৃতিতে মুক্ত অ বা সংযুক্ত অ উভয়েরই উচ্চারণ তীর্যক হয়ে থাকে।
  • প্রাচীন বাংলায় এ, ও, গ, চ, জ এবং হ-এর পরিবর্তে অ-এর ব্যবহার হতো। যেমন: এখন>অখন, হইতে>অইতে ইত্যাদি।

সূত্র :
  • ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব মুহম্মদ আবদুল হাই রচনাবলী প্রথম খণ্ড। বাংলা একাডেমী ঢাকা। আষাঢ় ১৪০১/জুন ১৯৯৪।
  • ব্যাবহারিক বাংলা উচ্চারণ অভিধান। আনিসুজ্জামান, ওয়াহিদুল হক, জামিল চৌধুরী, নরেন বিশ্বাস। জাতীয় গণমাধ্যম ইনসটিটিউট। ৮ ফাল্গুন ১৩৯৪
  • ভাষাপ্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। রূপম। মে ১৯৮৯।
  • সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা। ডঃ রামেশ্বর শ'। পুস্তক বিপণি। ৮ই ফাল্গুন, ১৩৯৪/২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮।