১, প্রধানধারার শিলালিপি: এই জাতীয় শিলালিপির আদরশ রূপ হলো- ১৪টি অনুশাসন। এবং এর পাঠ্য বিষয় হলো- পশুবলি, জনহিতকর কার্য ও চিকিৎসা, রাজকর্তব্য ও মিতব্যয়িতা, ধর্মের বিজয়, রাজকার্যে ধম্ম-মহামাত্র নিয়োগ, দ্রুত বিচার ও কাজের তদারকি, সর্বধর্মের সহিষ্ণুতা, ধম্ম-যাত্রা, যশের অসারতা, ধর্মীয় উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতা, কলিঙ্গ জয় ও অনুশোচনা এবং উপসংহার। এই প্রধান ধারার ১৪টি অনুশাসনযুক্ত লিপি পাওয়া যায় মাত্র দুটি স্থানে। বাকিগুলোতে রয়েছে- ১১, ১২, ১৩ সংখ্যক অনুশাসন পাওয়া যায় নি। এই বিচারে প্রধান ধারার শিলালিপিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ভাগ দুটি হলো-
১. গিরানার অশোকলিপি: সম্রাট অশোকের প্রধান শিলালিপিগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সুসংরক্ষিত সংস্করণ। এটি ভারতের গুজরাট রাজ্যের জুনাগড় শহরের কাছে গিরনার পর্বত-এর পাদদেশে শিলালিপিগুলো পাওয়া গেছে। এই লিপিটি একটি বিরাট কালো গ্রানাইড পাথরের উপরে লেখা হয়েছে। ১৪টি প্রধান শিলালিপি দুটি স্তম্ভাকারে সরল রেখা দিয়ে বিভক্ত করে খোদাই করা। উল্লেখ্য একই পাথরে ১৫০ খ্রিষ্টাব্দে শক রাজা রুদ্রদামন প্রথম-এর সংস্কৃত শিলালিপি এবং গুপ্ত সম্রাট স্কন্দগুপ্তের শিলালিপিও রয়েছে। এই মাগধী প্রাকৃত ভাষায় রচিত পাঠটি লেখা হয়েছিল প্রাচীন ব্রাহ্মীলিপিতে।
শিলালিপির পাঠ্যবিষয়:১. প্রথম অনুশাসন: পশুবলি নিষিদ্ধ:
অনুবাদ: "দেবতাদের প্রিয় প্রিয়দর্শী রাজা এই ধর্মলিপি খোদাই করিয়েছেন। এখানে কোনো জীব হত্যা করে যজ্ঞ করা যাবে না এবং কোনো উৎসব-সমাজ (মত্ততা বা কদর্য আমোদপ্রমোদ) করা যাবে না। কারণ প্রিয়দর্শী রাজা এই ধরনের উৎসবে অনেক দোষ দেখেন। আগে রাজকীয় রন্ধনশালায় প্রতিদিন শত সহস্র প্রাণী ঝোল বা ব্যঞ্জনের জন্য মারা হতো। কিন্তু এখন থেকে মাত্র তিনটি প্রাণী মারা হবে- দুটি ময়ূর ও একটি হরিণ (হরিণটিও নিয়মিত নয়)। ভবিষ্যতে এই তিনটি প্রাণীও আর মারা হবে না।"২. দ্বিতীয় অনুশাসন: জনহিতকর ও চিকিৎসা সেবা:
অনুবাদ: "দেবতাদের প্রিয় প্রিয়দর্শী রাজার রাজ্যজুড়ে এবং সীমান্ত রাজ্যসমূহে (যেমন—চোল, পাণ্ড্য, সত্যপুত্র, কেরলপুত্র এবং তাম্রপর্ণী) এবং গ্রিক রাজা অ্যান্টিওকাস ও তাঁর প্রতিবেশী রাজাদের রাজ্যে দুই প্রকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে: মানুষের জন্য চিকিৎসা এবং পশুদের জন্য চিকিৎসা। যেখানে ভেষজ উদ্ভিদ নেই, সেখানে তা আমদানি ও রোপণ করা হয়েছে। রাস্তার ধারে কুয়া খনন করা হয়েছে এবং মানুষ ও পশুর বিশ্রামের জন্য বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।"
৩. তৃতীয় অনুশাসন: রাজকর্তব্য ও মিতব্যয়িতা:
অনুবাদ: "রাজ্যাভিষেকের বারো বছর পর আমি এই আদেশ দিচ্ছি—আমার রাজ্যের সর্বত্র যুক্ত, রজ্জুক ও প্রাদেশিক কর্মকর্তারা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ভ্রমণে বের হবেন। তাঁদের কাজ হবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জনগণকে এই শিক্ষা দেওয়া: মাতা-পিতার সেবা করা পুণ্য কর্ম, বন্ধু ও আত্মীয়দের প্রতি দানশীলতা পুণ্য কর্ম, প্রাণিবধ না করা পুণ্য কর্ম এবং অল্প ব্যয় ও অল্প সঞ্চয় করা পুণ্য কর্ম।"
৪. চতুর্থ অনুশাসন: ধর্মের বিজয়:
অনুবাদ: "বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা প্রাণিহত্যা এবং আত্মীয়-স্বজন ও ব্রাহ্মণদের প্রতি অসম্মান এখন বন্ধ হয়েছে। আজ যুদ্ধের দামামার পরিবর্তে ধর্মের ঘোষণা (ধম্মঘোষ) শোনা যাচ্ছে। সম্রাট প্রিয়দর্শী অহিংসা ও শিষ্টাচারের যে আদর্শ স্থাপন করেছেন, তা তাঁর পুত্র, পৌত্র ও প্রপৌত্ররা চিরকাল বজায় রাখবেন।"
৫. পঞ্চম অনুশাসন: ধম্ম-মহামাত্র নিয়োগ:
অনুবাদ: "মঙ্গল কাজ করা কঠিন। যে মঙ্গল কাজ শুরু করে সে কঠিন কাজ সম্পন্ন করে। আমি রাজ্যাভিষেকের তেরো বছর পর 'ধম্ম-মহামাত্র' পদটি সৃষ্টি করেছি। তাঁরা সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মের প্রচার করবেন এবং যবন, কম্বোজ ও গান্ধারদের কল্যাণে নিযুক্ত থাকবেন। তাঁরা কয়েদিদের মুক্তি বা সাজা কমানোর বিষয়েও কাজ করবেন।"
৬. ষষ্ঠ অনুশাসন: দ্রুত বিচার ও কাজের তদারকি:
অনুবাদ: "অতীতে সবসময় প্রজাদের সংবাদ পাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। তাই আমি আদেশ দিচ্ছি—আমি যেখানেই থাকি না কেন, খাচ্ছি বা বিশ্রাম নিচ্ছি, আমার প্রতিবেদকগণ যেন সবসময় প্রজাদের অভাব-অভিযোগ আমাকে জানান। আমি জনগণের কাজ করতে কখনো ক্লান্ত বোধ করি না। কারণ সর্বজনীন কল্যাণই আমার প্রধান কর্তব্য।"
৭. সপ্তম অনুশাসন: সর্বধর্মের সহিষ্ণুতা:
অনুবাদ: "দেবতাদের প্রিয় রাজা প্রিয়দর্শী ইচ্ছা করেন যে, সব জায়গায় সব ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করুক। কারণ প্রতিটি ধর্মই আত্মসংযম এবং হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জনের কথা বলে। মানুষের বিচারবুদ্ধি ও রুচি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সংযম ও দানশীলতা সবার জন্যই শ্রেষ্ঠ।"
৮. অষ্টম অনুশাসন: ধম্ম-যাত্রা: "বিগত রাজারা প্রমোদ ভ্রমণে বের হতেন এবং শিকার বা অন্যান্য আমোদ করতেন। কিন্তু সম্রাট প্রিয়দর্শী রাজ্যাভিষেকের দশ বছর পর থেকে 'ধম্ম-যাত্রা' (ধর্মের জন্য ভ্রমণ) শুরু করেছেন। এই ভ্রমণে তিনি ব্রাহ্মণ ও শ্রমণদের দর্শন করেন, তাঁদের দান করেন এবং স্থবির বা বয়োজ্যেষ্ঠদের খোঁজখবর নেন ও উপদেশ দেন।"
৯. নবম অনুশাসন: প্রকৃত মঙ্গলানুষ্ঠান:
অনুবাদ: "মানুষ অসুস্থতায়, বিবাহে বা সন্তানের জন্মের সময় নানা আচার পালন করে। মহিলারা বিশেষ করে অনেক তুচ্ছ ও নিরর্থক অনুষ্ঠান করেন। কিন্তু এসব অনুষ্ঠানের ফল সামান্যই। প্রকৃত মঙ্গলানুষ্ঠান হলো—দাসের প্রতি দয়া, গুরুজনের প্রতি ভক্তি, প্রাণীর প্রতি করুণা এবং ব্রাহ্মণ ও শ্রমণদের দান। এটিই হলো ধর্মের দান।"
১০. দশম অনুশাসন: যশের অসারতা:
অনুবাদ: "দেবতাদের প্রিয় রাজা প্রিয়দর্শী ইহলোকে খ্যাতি বা পরলোকে যশের আকাঙ্ক্ষা করেন না। তিনি কেবল চান তাঁর প্রজারা যেন ধর্মের পথে চলে। শ্রেষ্ঠ হওয়ার একমাত্র উপায় হলো সমস্ত জাগতিক মোহ ত্যাগ করে ধর্মের সেবায় আত্মনিয়োগ করা।"
১১. একাদশ অনুশাসন: ধর্মের দান শ্রেষ্ঠ:
অনুবাদ: "ধর্মের দানের মতো কোনো দান নেই। ধর্মের বন্ধুত্বের মতো কোনো বন্ধুত্ব নেই। এটি হলো—দাসের সাথে সদয় ব্যবহার, মাতা-পিতার সেবা, বন্ধুদের প্রতি উদারতা এবং অহিংসা। এর মাধ্যমে ইহলোক এবং পরলোক উভয়ই জয় করা সম্ভব।"
১২. দ্বাদশ অনুশাসন: ধর্মীয় উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতা:
অনুবাদ: "রাজা সকল সম্প্রদায়কে শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু তিনি মনে করেন যে, নিজের ধর্মের প্রশংসা করা এবং বিনা কারণে অন্য ধর্মের নিন্দা করা অনুচিত। যে নিজের ধর্মের প্রতি ভক্তির কারণে অন্য ধর্মের নিন্দা করে, সে আসলে নিজের ধর্মেরই গুরুতর ক্ষতি করে। তাই প্রত্যেকের উচিত অন্যের ধর্মের সারকথা শোনা এবং তা শ্রদ্ধা করা।"
১৩. ত্রয়োদশ অনুশাসন: কলিঙ্গ জয় ও অনুশোচনা:
অনুবাদ: "রাজ্যাভিষেকের আট বছর পর সম্রাট কলিঙ্গ জয় করেন। সেখানে এক লক্ষ লোক নিহত হয় এবং দেড় লক্ষ লোক বন্দী হয়। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা সম্রাটকে গভীর ব্যথায় মর্মাহত করে। এরপর থেকেই তিনি যুদ্ধ ত্যাগ করে ধর্মের পথে জয়ের পথ বেছে নেন। তিনি গ্রিক রাজাদের রাজ্য এবং দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতেও ধর্মের জয় প্রচার করেছেন।"
১৪. চতুর্দশ অনুশাসন: উপসংহার:
অনুবাদ: "এই ধর্মলিপিগুলো রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজন অনুসারে সংক্ষেপে বা বিস্তারিতভাবে খোদাই করা হয়েছে। একই কথা বারবার বলা হয়েছে যাতে মানুষ তা হৃদয়ে ধারণ করে। যদি কোথাও কোনো ভুল থাকে বা অপূর্ণ থাকে, তবে তা খোদাইকারীর ত্রুটির কারণে হতে পারে।"২. ধৌলি শিলালিপি: এটি ভারতের ঊড়িশ্যা রাজ্যের ভুবনেশ্বর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে ধৌলি পাহাড়ের উত্তর দিকের পাদদেশে, দয়া নদীর তীরের একটি বড় পাথরের উপরে লিখিত হয়েছিল। এই স্থানটি কলিঙ্গ যুদ্ধ-এর যুদ্ধক্ষেত্রের খুব কাছে বলে মনে করা হয়। এটি মাগধী প্রাকৃতির পূর্বাঞ্চলীয় শাখার ভাষায় লেখা হয়েছে ব্রহ্মীলিপিতে। দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকের পর ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ অফিসার মার্কহাম কিট্টো দ্বারা পুনরাবিষ্কৃত।
পাথরের উপরের অংশে একটি হাতির পূর্ব দিকে মুখ করা অর্ধেক মূর্তি খোদাই করা আছে। এটি ওড়িশার প্রাচীনতম বৌদ্ধ শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। হাতিটি প্রাকৃতিকসম্মত ও গতিশীল। অনেকে মনে করেন, এটি যুদ্ধ বন্ধের প্রতীক এবং অশোকের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের প্রতীক।
শিলালিপির পাঠ্যবিষয়:১. প্রথম পৃথক অনুশাসন: বিচারকদের প্রতি নির্দেশ এই লিপিটি মূলত তোসালি নগরের বিচারকদের উদ্দেশ্যে লেখা।৩. জাউগড়া শিলালিপি
অনুবাদ: "দেবতাদের প্রিয় রাজা প্রিয়দর্শী তোসালি নগরের মহামাত্র ও বিচারকদের এই আদেশ দিচ্ছেন—আমি যা সঠিক বলে মনে করি, তা কাজে পরিণত করতে চাই। তোমাদের ওপর অনেক মানুষ নির্ভরশীল। তোমরা যেন অন্যায্যভাবে কাউকে কারারুদ্ধ না করো বা শাস্তি না দাও। মনে রেখো, 'সকল মানুষই আমার সন্তান' (সবে মুনিসে পজা মমা)। আমি যেমন আমার নিজের সন্তানের জন্য ইহলোক ও পরলোকে সুখ কামনা করি, তেমনি সকল মানুষের জন্যও তা চাই। তোমরা সর্বদা নিরপেক্ষ থাকো। ঈর্ষা, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা বা অলসতা যেন তোমাদের বিচারকে প্রভাবিত না করে। এই লিপিটি প্রতি তিষ্য নক্ষত্রের দিনে পাঠ করতে হবে যাতে তোমরা তোমাদের কর্তব্য স্মরণ করতে পারো।"
২. দ্বিতীয় পৃথক অনুশাসন: সীমান্তবাসীর প্রতি অভয়বাণী এটি অ-বিজিত বা সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য সম্রাটের বার্তা।
অনুবাদ: "দেবতাদের প্রিয় রাজার আদেশ—সীমান্তের অধিবাসীরা হয়তো ভাবছে রাজার উদ্দেশ্য কী? তাদের জানতে হবে যে, রাজা তাদের পিতার মতো। তিনি চান তারা যেন রাজাকে বিশ্বাস করে এবং তাঁর কাছ থেকে কেবল সুখই পায়, দুঃখ নয়। আমার প্রধান কাজ হলো তাদের মনে সাহস জোগানো এবং তাদের ধর্মের পথে চালিত করা। ধম্ম-মহামাত্রগণ যেন নিয়মিত এই কথাগুলো প্রচার করেন যাতে সীমান্তে শান্তি বজায় থাকে।"
৩. তৃতীয় অনুশাসন: রাজকর্তব্য ও মিতব্যয়িতা
অনুবাদ:"দেবতাদের প্রিয় রাজা প্রিয়দর্শী এই আদেশ দিচ্ছেন—আমার রাজ্যাভিষেকের বারো বছর পর আমি নির্দেশ জারি করেছি যে, আমার রাজ্যের সর্বত্র যুক্ত, রজ্জুক এবং প্রাদেশিক কর্মকর্তারা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর রাজ্যে পরিভ্রমণ করবেন। এটি তাঁদের নিয়মিত প্রশাসনিক কাজের অতিরিক্ত একটি বিশেষ কর্তব্য হবে। তাঁরা জনগণকে এই শিক্ষা দেবেন: 'পিতামাতার সেবা করা অতি উত্তম; আত্মীয়, বন্ধু, ব্রাহ্মণ ও শ্রমণদের দান করা অতি উত্তম; প্রাণী হত্যা না করা অতি উত্তম; এবং অল্প ব্যয় ও অল্প সঞ্চয় করা অতি উত্তম'।"
৪. চতুর্থ অনুশাসন: ধর্মের নৈতিক বিজয়
অনুবাদ: "বিগত কয়েকশ বছর ধরে সমাজে প্রাণিহত্যা, আত্মীয়দের প্রতি দুর্ব্যবহার এবং ব্রাহ্মণ-শ্রমণদের প্রতি অসম্মান বেড়েই চলেছিল। কিন্তু আজ দেবতাদের প্রিয় রাজার ধর্ম পালনের ফলে যুদ্ধের দামামা (ভেড়ীঘোষ) স্তব্ধ হয়ে ধর্মের ধ্বনি (ধম্মঘোষ) গুঞ্জরিত হচ্ছে। রাজা প্রিয়দর্শী নৈতিকতার যে আদর্শ স্থাপন করেছেন, তা এখন আকাশচুম্বী। তাঁর পুত্র, পৌত্র ও বংশধরগণ এই ধর্ম প্রচার অব্যাহত রাখবেন। কারণ ধর্মের পথে চলাই শ্রেষ্ঠ কর্ম, অধার্মিকের পক্ষে ধর্ম পালন অসম্ভব।"
৫. পঞ্চম অনুশাসন: ধম্ম-মহামাত্র নিয়োগ
অনুবাদ: "পুণ্য কাজ করা কঠিন, এবং যে প্রথম এই কাজ শুরু করে সে অত্যন্ত দুরূহ কাজ সম্পন্ন করে। আমি রাজ্যাভিষেকের তেরো বছর পর 'ধম্ম-মহামাত্র' পদটি সৃষ্টি করেছি। তাঁরা সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে বিচরণ করবেন—সে যবন, কম্বোজ বা গান্ধার যে-ই হোক না কেন। এমনকি কারাগারের ভেতরেও তাঁরা কাজ করবেন, যাতে বন্দীদের প্রতি অবিচার না হয় বা যাদের পরিবার বড় তাদের সাজা কমানো যায়। তাঁরা সর্বত্র ধর্মের ভিত্তি মজবুত করতে নিয়োজিত থাকবেন।"
৬. ষষ্ঠ অনুশাসন: জনসেবা ও প্রতিবেদকদের দায়িত্ব
অনুবাদ: "অতীতে রাজকীয় কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার বা তথ্য দেওয়ার সঠিক ব্যবস্থা ছিল না। তাই আমি এই নিয়ম করেছি যে—আমি যেখানেই থাকি না কেন, খাচ্ছি, অন্তঃপুরে বিশ্রাম নিচ্ছি, বাগানে বা পালকিতে ভ্রমণ করছি—প্রতিবেদকরা (খবরদাতা) যেন যেকোনো সময় আমার কাছে প্রজাদের অভাব-অভিযোগ নিয়ে আসতে পারেন। জনগণের কাজ করতে আমি কখনো ক্লান্তি বোধ করি না। কারণ সমস্ত জগতের মঙ্গল সাধনই আমার একমাত্র লক্ষ্য। আমি যা কিছু করি, তা প্রজাদের ঋণ শোধ করার জন্য, যাতে তারা ইহলোকে সুখী হয় এবং পরলোকে স্বর্গ লাভ করে।"
৭. সপ্তম অনুশাসন: সর্বধর্মের সহাবস্থান
অনুবাদ: "দেবতাদের প্রিয় রাজা প্রিয়দর্শী আকাঙ্ক্ষা করেন যে, তাঁর রাজ্যের সর্বত্র সকল সম্প্রদায়ের মানুষ নির্বিঘ্নে বসবাস করুক। কারণ সকল ধর্মই মূলত আত্মসংযম এবং হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জনের উপদেশ দেয়। মানুষ তার স্বভাবভেদে উচ্চ বা নিম্নমানের হতে পারে, কিন্তু যে ব্যক্তি প্রভূত দান করতে পারে না, তারও উচিত অন্তত আত্মসংযম, কৃতজ্ঞতা এবং দৃঢ় ভক্তি বজায় রাখা।"
৮. অষ্টম অনুশাসন: ধর্মযাত্রার প্রবর্তন
অনুবাদ: "অতীতে রাজারা বিহার-যাত্রা বা প্রমোদ ভ্রমণে বের হতেন, যেখানে শিকার ও অন্যান্য আমোদ-প্রমোদ চলত। কিন্তু আমি রাজ্যাভিষেকের দশ বছর পর থেকে 'ধম্ম-যাত্রা' শুরু করেছি। এই যাত্রার মাহাত্ম্য হলো—ব্রাহ্মণ ও শ্রমণদের দর্শন ও তাঁদের দান করা, বয়োজ্যেষ্ঠ বা বৃদ্ধদের নিকট গিয়ে তাঁদের সেবা ও অর্থ সাহায্য করা এবং রাজ্যের সাধারণ মানুষকে ধর্মের পথে উদ্বুদ্ধ করা ও তাঁদের প্রশ্ন শোনা। এতে রাজা যে আনন্দ পান, তা অন্য যেকোনো আনন্দের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।"
৯. নবম অনুশাসন: প্রকৃত মঙ্গলানুষ্ঠান
অনুবাদ: "মানুষ বিপদ-আপদে, সন্তানদের বিয়েতে, জন্ম বা ভ্রমণের সময় অনেক আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। বিশেষ করে মহিলারা অনেক অর্থহীন ও তুচ্ছ প্রথা পালন করেন। এই ধরণের আচারের ফল অনিশ্চিত। কিন্তু 'ধর্মের মঙ্গল' (ধম্ম-মঙ্গল) চিরস্থায়ী। সেটি কী? দাস ও কর্মচারীদের প্রতি মানবিক আচরণ, গুরুজনদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ইন্দ্রিয় সংযম এবং ব্রাহ্মণ-শ্রমণদের প্রতি উদারতা। এই আচরণগুলোই প্রকৃত পুণ্য কর্ম।"
১০. দশম অনুশাসন: মহৎ আদর্শ
অনুবাদ: "দেবতাদের প্রিয় রাজা মনে করেন না যে বর্তমান বা ভবিষ্যতের কোনো যশ বা খ্যাতি বড় কিছু, যদি না তা মানুষের মনে ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি করে। রাজা যা কিছু প্রচেষ্টা করেন, তা কেবল মানুষের পারলৌকিক মঙ্গলের জন্য এবং যাতে তারা পাপ থেকে মুক্ত হতে পারে। আসক্তি ও মোহ ত্যাগ না করলে ধর্মের এই পথে চলা কঠিন, বিশেষ করে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের জন্য এটি আরও কঠিন।"
গিরনার শিলালিপির অনুরূপ ১১, ১২ ও ১৩ সংখ্যক শিলালিপি নেই।
১৪. চতুর্দশ অনুশাসন: লিপির উপসংহার
অনুবাদ: "সম্রাট প্রিয়দর্শী রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে এই ধর্মলিপিগুলো খোদাই করিয়েছেন। এগুলোর কোনোটি সংক্ষেপে, কোনোটি মাঝারি আকারে আবার কোনোটি বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে। সব জায়গায় সব কথা খোদাই করা সম্ভব হয়নি। অনেক কথা বারবার বলা হয়েছে যাতে মানুষ তা শুনে মুগ্ধ হয় এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করে। যদি কোনো জায়গায় লিপি অসম্পূর্ণ থাকে বা কোনো ভুল থাকে, তবে তা খোদাইকারীর অসতর্কতা বা স্থানের অভাবের কারণে হতে পারে।"
সম্রাট অশোকের প্রধান শিলালিপি-র একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণ, যা কলিঙ্গ অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি ভারতের উড়িশ্যা রাজ্যের গঞ্জাম জেলা-তে অবস্থিত। ব্রহ্মপুর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং পুরুষোত্তমপুর -এর কাছে। প্রাচীনকালে এই স্থানের নাম ছিল সমাপ, এবং এটি মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে কলিঙ্গ প্রদেশের একটি দুর্গ-প্রধান রাজধানী হিসেবে কাজ করত।
রিশিকুল্যা নদীর উত্তর তীরস্থ জাউগড়া দুর্গের ভিতরে এই শিলালিপিটি রয়েছে। একটি বড় গ্রানাইট পাথরের উল্লম্ব পৃষ্ঠে খোদাই করা। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ ফুট এবং উচ্চতা ১৫ ফুট। পাথরটি মাটি থেকে প্রায় ১২ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এটি মাগধী প্রাকৃতির পূর্বাঞ্চলীয় শাখার ভাষায় লেখা হয়েছে ব্রহ্মীলিপিতে। এটি দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। ১৯শ শতাব্দীতে ব্রিটিশ আমলে আবিষ্কৃত হয়। বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) দ্বারা সংরক্ষিত।
ধৌলির মতো এখানেও সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতিবিজড়িত ১৩ নম্বর লিপিটি নেই। এর পরিবর্তে এখানেও দুটি পৃথক কলিঙ্গ অনুশাসন পাওয়া যায়। নিচে জাউগড়া শিলালিপির অনুশাসনগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাংলা পাঠ দেওয়া হলো:৪.কালসই শিলালিপি১. প্রথম অনুশাসন: অহিংসা ও যজ্ঞ সংস্কার
অনুবাদ: "দেবতাদের প্রিয় প্রিয়দর্শী রাজা এই ধর্মলিপি লিখিয়েছেন। এখানে (আমার রাজ্যে) কোনো জীব হত্যা করে যজ্ঞ করা যাবে না এবং কোনো কদর্য আমোদ-প্রমোদ বা উৎসব করা যাবে না। কারণ রাজা প্রিয়দর্শী এই ধরণের উৎসবে অনেক নৈতিক ত্রুটি দেখতে পান। আগে রাজকীয় রন্ধনশালায় প্রতিদিন শত সহস্র প্রাণী ব্যঞ্জনের জন্য হত্যা করা হতো। কিন্তু এখন এই ধর্মলিপি লেখার সময় মাত্র তিনটি প্রাণী মারা হয়—দুটি ময়ূর ও একটি হরিণ (হরিণটিও সবসময় নয়)। ভবিষ্যতে এই তিনটি প্রাণীও আর হত্যা করা হবে না।"
২. দ্বিতীয় অনুশাসন: জনহিতকর কর্মকাণ্ড
অনুবাদ: "রাজা প্রিয়দর্শী তাঁর নিজ রাজ্যে এবং প্রতিবেশী রাজ্যসমূহে (চোল, পাণ্ড্য, সত্যপুত্র, কেরলপুত্র এবং তাম্রপর্ণী) এবং গ্রিক রাজা অ্যান্টিওকাস ও তাঁর পার্শ্ববর্তী রাজাদের রাজ্যে দুই প্রকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন—মানুষের জন্য এবং পশুদের জন্য। যেখানে চিকিৎসার উপযোগী ভেষজ উদ্ভিদ নেই, সেখানে তা বিদেশ থেকে আনিয়ে রোপণ করা হয়েছে। পথিক ও পশুকুলের সুবিধার জন্য রাস্তার ধারে কুয়া খনন করা হয়েছে এবং ছায়া দানকারী বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে।"
৩. তৃতীয় অনুশাসন: রাজকর্মকর্তাদের কর্তব্য
অনুবাদ: "রাজ্যাভিষেকের বারো বছর পর আমি আদেশ জারি করেছি—আমার রাজ্যের সর্বত্র যুক্ত, রজ্জুক ও প্রাদেশিক কর্মকর্তারা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর রাজ্যে পরিভ্রমণ করবেন। এটি তাঁদের প্রশাসনিক কাজের বাইরে একটি অতিরিক্ত ধর্মীয় দায়িত্ব। তাঁরা জনগণকে এই শিক্ষা দেবেন: 'পিতা-মাতার সেবা করা পুণ্য কর্ম; আত্মীয় ও শ্রমণদের দান করা পুণ্য কর্ম; প্রাণী হত্যা না করা পুণ্য কর্ম এবং জীবনে অল্প ব্যয় ও অল্প সঞ্চয় করা মঙ্গলজনক'।"
৪. চতুর্থ অনুশাসন: ধর্মের নৈতিক বিজয়
অনুবাদ: "বহু শতাব্দী ধরে সমাজে প্রাণিহত্যা এবং আত্মীয়-স্বজন ও ব্রাহ্মণদের প্রতি যে অসম্মান চলে আসছিল, তা আজ বন্ধ হয়েছে। আগে যুদ্ধের দামামা (ভেড়ীঘোষ) বেজে উঠত, কিন্তু এখন রাজার ধর্ম পালনের ফলে চারদিকে ধর্মের ঘোষণা (ধম্মঘোষ) শোনা যাচ্ছে। সম্রাট যে নৈতিক পথ দেখিয়েছেন, তা তাঁর বংশধরেরা চিরকাল বজায় রাখবেন। কারণ ধর্মের অনুশীলন ছাড়া নৈতিকতা সম্ভব নয়।"
৫. পঞ্চম অনুশাসন: ধম্ম-মহামাত্র পদ সৃষ্টি
অনুবাদ: "ভালো কাজ করা কঠিন। যে ব্যক্তি এই পথ শুরু করে সে মহৎ কাজ করে। আমি রাজ্যাভিষেকের তেরো বছর পর 'ধম্ম-মহামাত্র' নামক কর্মকর্তাদের নিয়োগ করেছি। তাঁরা সকল সম্প্রদায়ের (যবন, কম্বোজ, গান্ধার) মানুষের মধ্যে ধর্মের প্রচার করবেন। তাঁরা জেলখানায় গিয়ে বন্দীদের দুর্দশা লাঘব করবেন, কারো সাজা কমানোর প্রয়োজন হলে তা করবেন এবং জনগণের সুখ-দুঃখের দেখভাল করবেন।"
৬. ষষ্ঠ অনুশাসন: দ্রুত জনসেবা
অনুবাদ: "অতীতে যেকোনো সময় রাজার কাছে সংবাদ পাঠানোর সুব্যবস্থা ছিল না। তাই আমি নিয়ম করেছি—আমি যেখানেই থাকি, খাচ্ছি বা বিশ্রাম নিচ্ছি, আমার প্রতিবেদকগণ যেন সবসময় আমাকে প্রজাদের আবেদন বা অভাব-অভিযোগ জানান। আমি জনকল্যাণে কাজ করতে কখনো ক্লান্ত বোধ করি না। কারণ সমস্ত জগতের মঙ্গল সাধনই আমার একমাত্র কর্তব্য, আর এর মাধ্যমেই আমি প্রজাদের প্রতি আমার ঋণ শোধ করতে পারি।"
৭. সপ্তম অনুশাসন: ধর্মীয় সহিষ্ণুতা
অনুবাদ: "দেবতাদের প্রিয় রাজা প্রিয়দর্শী ইচ্ছা করেন যে, তাঁর রাজ্যের সর্বত্র সকল ধর্মের মানুষ একসাথে শান্তিতে বাস করুক। কারণ প্রতিটি ধর্মই মূলত আত্মসংযম এবং মনের পবিত্রতার কথা বলে। মানুষের রুচি ও চিন্তা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সংযম ও দানশীলতা সবার জন্যই শ্রেষ্ঠ গুণ।"
৮. অষ্টম অনুশাসন: ধম্ম-যাত্রা
অনুবাদ: "আগে রাজারা আমোদ-প্রমোদের জন্য শিকারে যেতেন। কিন্তু সম্রাট প্রিয়দর্শী রাজ্যাভিষেকের দশ বছর পর থেকে 'ধম্ম-যাত্রা' (ধর্মের জন্য ভ্রমণ) প্রবর্তন করেছেন। এই ভ্রমণে তিনি ব্রাহ্মণ ও শ্রমণদের দর্শন করেন, তাঁদের দান করেন এবং স্থবির বা বয়োজ্যেষ্ঠদের খোঁজখবর নেন। জাগতিক আমোদের চেয়ে এই ধর্মযাত্রায় রাজা অনেক বেশি আনন্দ লাভ করেন।"
৯. নবম অনুশাসন: প্রকৃত মঙ্গলানুষ্ঠান
অনুবাদ: "মানুষ অসুস্থতায়, বিবাহে বা যাত্রার সময় নানা লৌকিক আচার পালন করে। মহিলারা অনেক সময় নিরর্থক ও তুচ্ছ অনুষ্ঠান করেন। এসবের ফল অতি সামান্য। প্রকৃত মঙ্গলানুষ্ঠান হলো—দাসের প্রতি দয়া, গুরুজনের প্রতি ভক্তি, প্রাণীর প্রতি করুণা এবং শ্রমণদের দান। এটিই হলো 'ধম্ম-মঙ্গল', যা ইহলোক ও পরলোক উভয় স্থানেই সুখ প্রদান করে।"
১০. দশম অনুশাসন: যশের অসারতা
অনুবাদ: "রাজা প্রিয়দর্শী ইহলোকের খ্যাতি বা পরলোকের যশের আকাঙ্ক্ষা করেন না। তিনি কেবল চান তাঁর প্রজারা যেন ধর্মের পথে চলে। শ্রেষ্ঠ হওয়ার একমাত্র উপায় হলো সমস্ত জাগতিক মোহ ও পাপ ত্যাগ করে ধর্মের সেবায় আত্মনিয়োগ করা। এটি কঠিন কাজ, কিন্তু ত্যাগের মাধ্যমেই তা সম্ভব।"
১১ ১২ ও ১৩ অনুশাসন নেই।
১৪. চতুর্দশ অনুশাসন: উপসংহার
অনুবাদ: "এই ধর্মলিপিগুলো রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজন অনুসারে সংক্ষেপে বা বিস্তারিতভাবে খোদাই করা হয়েছে। একই কথা বারবার বলা হয়েছে যাতে মানুষ তা শুনে মুগ্ধ হয় এবং সেই অনুযায়ী ধর্ম পালন করে। যদি কোথাও কোনো লিপি অসম্পূর্ণ থাকে বা কোনো ভুল থাকে, তবে তা খোদাইকারীর ত্রুটির কারণে হতে পারে।"
এটি ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের দেরাদুন জেলার যমুনা নদী ও টনস নদীর সঙ্গমস্থলে কালসি গ্রামে পাওয়া গেছে। কালসি গ্রামটি দেরাদুন থেকে প্রায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার দূরে, চক্রতা রোডের কাছে অবস্থিত। শিলালিপিটি একটি বড় নাশপাতি আকারের পাথরে খোদাই করা। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ ফুট এবং প্রস্থ ৮ ফুট।
মাগধী প্রাকৃত ভাষায় ব্রাহ্মীলিপিতে লিখিত। পাথরের উত্তর দিকে একটি হাতির খোদাই রয়েছে, যা "গজতমে" অর্থাৎ "সর্বোত্তম হাতি" লেখা আছে। এটি অশোকের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ ও শান্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এই শিলালিপিটি দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ অফিসার জন ফরেস্ট দ্বারা পুনরাবিষ্কৃত হয়েছে। বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) দ্বারা সংরক্ষিত।
গিরনারের মতো এখানেও সম্রাট অশোকের ১৪টি প্রধান অনুশাসনই পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যায়। তাই এখানে তা পুনরাবৃ্ত্তি করা হলো না।৫. সোপারা শিলালিপি
মহারাষ্ট্র রাজ্যের পালঘর জেলা-তে অবস্থিত নালা সোপারা নামক স্থানে (মুম্বাই থেকে প্রায় ৪৫-৫০ কিলোমিটার উত্তরে) পাওয়া গেছে। প্রাচীনকালে এই স্থানের নাম ছিল শূর্পারক। এটি একটি প্রসিদ্ধ সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল (পেরিপ্লাস অফ দ্য এরিথ্রিয়ান সি এবং টলেমির মানচিত্রে উল্লেখিত)। এই শিলিপিটি দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে প্রত্নতাত্ত্বিক ভগবানলাল ইন্দ্রজী এই শিলালিপিটি আবিষ্কার করেন। এটি অষ্টকোণাকার একটি বড় পাথরের খণ্ডে পাওয়া গিয়েছিল। এটি মাগধী প্রাকৃতি পশ্চিমাঞ্চলীতে ব্রাহ্মীলিপিতে রচিত। এখানকার স্তূপ থেকে বৌদ্ধ অবশেষ ও ধাতব মূর্তিও পাওয়া গিয়েছিল।
দুর্ভাগ্যবশত, সোপারায় গিরনার বা কালসির মতো পূর্ণাঙ্গ ১৪টি অনুশাসন অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়নি; এখানে কেবল অষ্টম এবং নবম অনুশাসনের বড় অংশ এবং অন্য কিছু খণ্ডিতাংশ পাওয়া গেছে।
ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সোপারা শিলালিপির মূল অংশগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:
৮. অষ্টম অনুশাসন: ধর্মযাত্রার প্রবর্তন
অনুবাদ: "অতীতকালে রাজারা 'বিহার-যাত্রা' বা প্রমোদ ভ্রমণে বের হতেন। সেইসব ভ্রমণে মৃগয়া (শিকার) এবং অন্যান্য পার্থিব আমোদ-প্রমোদ চলত। কিন্তু দেবতাদের প্রিয় প্রিয়দর্শী রাজা রাজ্যাভিষেকের দশ বছর পূর্ণ হওয়ার পর 'সম্বোধি' (বোধগয়া) অভিমুখে যাত্রা করেন এবং সেখান থেকেই 'ধম্ম-যাত্রা' বা ধর্মভ্রমণের সূচনা হয়। এই ধর্মভ্রমণের বৈশিষ্ট্য হলো—ব্রাহ্মণ ও শ্রমণদের দর্শন করা এবং তাঁদের দান প্রদান করা, বয়োজ্যেষ্ঠ বা স্থবিরদের নিকট গিয়ে তাঁদের সেবা করা ও স্বর্ণ দান করা, এবং জনপদ বা গ্রামসমূহের মানুষের সাথে দেখা করে তাঁদের ধর্মের উপদেশ দেওয়া ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা। দেবতাদের প্রিয় প্রিয়দর্শী রাজা এই ধর্মযাত্রায় যে পরম আনন্দ লাভ করেন, তা অন্য যেকোনো পার্থিব বা ইন্দ্রিয়সুখের চেয়ে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ।"
৯. নবম অনুশাসন: প্রকৃত মঙ্গলানুষ্ঠান (ধম্ম-মঙ্গল)
অনুবাদ: "মানুষ বিপদ-আপদে, পুত্র-কন্যার বিবাহে, সন্তানের জন্মকালে কিংবা দূর ভ্রমণে বের হওয়ার সময় নানা প্রকার মঙ্গলানুষ্ঠান বা আচার পালন করে। বিশেষ করে মায়েরা ও মহিলারা এই ধরণের অনেক তুচ্ছ ও অর্থহীন আচার পালন করেন। এই আচারগুলো পালন করা যেতে পারে, কিন্তু এগুলোর ফল অতি সামান্য। অন্যদিকে, 'ধম্ম-মঙ্গল' বা ধর্মের আচার অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এই ধম্ম-মঙ্গল হলো—দাস ও ভৃত্যদের প্রতি মানবিক ও সদয় আচরণ, গুরুজনদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, সকল প্রাণীর প্রতি অহিংসা ও সংযম এবং ব্রাহ্মণ ও শ্রমণদের দান করা। এই কাজগুলোই প্রকৃত মঙ্গলানুষ্ঠান। প্রত্যেক পিতার, পুত্রের, ভাইয়ের এবং বন্ধুর উচিত তাঁর আপনজনকে এই উপদেশ দেওয়া যে—পরম লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এই ধম্ম-মঙ্গলই পালন করা শ্রেয়। কারণ পার্থিব আচার ইহলোকে সফল হতেও পারে নাও পারে, কিন্তু ধর্মের মঙ্গল ইহলোকে সফল না হলেও পরলোকে অনন্ত পুণ্য দান করে।"১. ব্রাহ্মীলিপি: অশোকলিপির অধিকাংশই পালি ভাষায় প্রাচীন ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা হয়েছিল। প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন স্থানে এই লেখনিগুলো স্থাপন করা হয়েছিল।
২. খরোষ্ঠীলিপি: উত্তর পশ্চিম ভারতে স্থাপিত লেখনিগুলো খরোষ্ঠীলিপি-তে লেখা হয়েছিল।
সূত্র :
ভারতের ইতিহাস । অতুলচন্দ্র রায়, প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়।
http://en.wikipedia.org/wiki/Ashokaa