‌এ্যানিয়াথিয়ান সভ্যতা
Anyathian civilization

এ্যানিয়াথিয়ান সভ্যতা হলো হোমো ইরেক্টাস মানবগোষ্ঠীর দ্বারা মিয়ানমারে  গড়ে ওঠা পুরা প্রস্তর যুগের একটি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতি। ১৯৩৭-৩৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রত্নতাত্ত্বিক হেলমুট ডি টেরা (Helmut de Terra) ও হলাম এল. মুভিয়াস (Hallam L. Movius) ইরাবতী নদী  অববাহিকায় পরিচালিত গবেষণার সময় এই সংস্কৃতির নিদর্শন আবিষ্কার করেন।

ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমারে মধ্য ও ঊর্ধ্বাঞ্চল এ্যানিয়াথা
(Anyatha) নামে পরিচিত ছিল। এই ভৌগোলিক অঞ্চলের নাম অনুসারেই ইরাবতী নদী অববাহিকায় আবিষ্কৃত পুরা প্রস্তর যুগের এই স্বতন্ত্র প্রস্তর-হাতিয়ারভিত্তিক সংস্কৃতির নামকরণ করা হয় এ্যানিয়াথিয়ান।  

কাল নির্ধারণ
এ্যানিয়াথিয়ান সংস্কৃতির সুনির্দিষ্ট কাল নির্ধারণ এখনো সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত নয়, কারণ অধিকাংশ নিদর্শন নদী-টেরেস বা ভূপৃষ্ঠ থেকে সংগৃহীত এবং নির্ভরযোগ্য স্তরগত প্রেক্ষাপটের অভাব রয়েছে। তবু ভূতাত্ত্বিক ও তুলনামূলক প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই সংস্কৃতিকে সাধারণভাবে নিম্ন থেকে মধ্য প্লাইস্টোসিন যুগ (প্রায় ৭-৮ লক্ষ বছর থেকে ২ লক্ষ বছর পূর্বে) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সময়কাল দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় হোমো ইরেক্টাসের বিস্তার ও অভিযোজনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে বিবেচিত।

ভৌগোলিক বিস্তার
এ্যানিয়াথিয়ান সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছিল মূলত তিনটি ভৌগোলিক অঞ্চলে। এ্গুলো হলো- ইরাবতী নদীর মধ্য ও ঊর্ধ্ব অববাহিকা ম্যাগওয়ে, মিনবু, ইয়েনাংইয়াউং অঞ্চল মাউন্ট পোপা সংলগ্ন এলাকা এই অঞ্চলগুলি শুষ্ক ও মৌসুমি জলবায়ুর অধীন ছিল এবং নদী-টেরেস, নুড়িপাথরের স্তর ও ক্ষয়প্রাপ্ত ঢাল প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।

কাঁচামাল ও প্রযুক্তিএ্যানিয়াথিয়ান সভ্যতার সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো তাদের অস্বাভাবিক কাঁচামাল নির্বাচন। এই সংস্কৃতির মানুষ তাদের হাতিয়ার তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতো - জীবাশ্ম কাঠ, স্থানীয় কোয়ার্টজাইট ও নুড়িপাথর। বিশেষত জীবাশ্ম কাঠের ব্যবহার এ্যানিয়াথিয়ান সংস্কৃতিকে বিশ্ব প্রাগৈতিহাসিক পরিমণ্ডলে অনন্য করে তোলে। এই কাঁচামালগুলি স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক পরিবেশের সঙ্গে গভীর অভিযোজনের পরিচয় বহন করে।

জীবনযাপন ও অর্থনীতি: এ্যানিয়াথিয়ান জনগোষ্ঠী ছিল মূল শিকারি-সংগ্রাহক। তাদের তৈরি হাতিয়ারগুলির অধিকাংশই ছিল একমুখী- অর্থাৎ কেবল এক পাশে ধার দেওয়া। অ্যাশুলিয়ান ধাঁচের দ্বিমুখী হ্যান্ডঅ্যাক্স বা ক্লিভার প্রায় অনুপস্থিত। এদের হাতিয়ারগুলো ব্যবহৃত হতো- পশু শিকার ও দেহচ্ছেদন, গাছের ছাল ছাড়ানো এবং কাঠ ও উদ্ভিদ প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য। এ থেকে ধারণা করা যায়, বনজ সম্পদ তাদের জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। তারা সম্ভবত মৌসুমি গতিশীল জীবনযাপন করত এবং নদীঘেঁষা অঞ্চলে অস্থায়ী আবাস স্থাপন করত।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এ্যানিয়াথিয়ান সভ্যতার বিকাশকে  দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হোমো ইরেক্টাসের অভিযোজনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি ইউরোপ-কেন্দ্রিক প্রাগৈতিহাসিক 'উন্নয়ন মডেল'-কে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি দেখায় যে প্রযুক্তিগত বৈচিত্র্য মানব বুদ্ধিমত্তার সীমা নয়, বরং পরিবেশগত কৌশলের প্রতিফলন এ্যানিয়াথিয়ান সভ্যতা ছিল পুরা প্রস্তর যুগের একটি স্বতন্ত্র, পরিবেশ-সংবেদী ও বাস্তববাদী মানব সংস্কৃতি, যা স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও সম্পদের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে নিজের প্রযুক্তি ও জীবনযাপন গড়ে তুলেছিল। আধুনিক প্রত্নতত্ত্বে এই সভ্যতা মানব অভিযোজন ও বৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
Hallam Movius, H elmut de Terra and the L ine that N ever W as: Burma, 1938- Chapter 2
Hallam Movius, Helmut de Terra
and the Line that Never Was: Burma, 1938
-এর অনুবাদ অবলম্বনে লিখিত

ভূমিকা: এশীয় প্রাগৈতিহাসিক গবেষণার ক্ষেত্রে হ্যালাম মুভিয়াস -এর ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের প্রবন্ধের মতো বহুল আলোচিত ও উদ্ধৃত আর কোনো রচনা নেই। এই রচনায় তিনি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক যুগ-এর একটি সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি আফ্রিকা, ইউরোপ, পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়ার তথাকথিত 'প্রগতিশীল' মানবসমাজের সঙ্গে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার 'আদিম' ও 'পশ্চাৎপদ' সমাজের একটি মৌলিক বিভাজন প্রস্তাব করেন। মুভিয়াসের মতে, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমাজগুলি ছিল স্থবির এবং মানবসভ্যতার বিকাশে তারা কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেনি। এই কঠোর মূল্যায়নের মূল ভিত্তি ছিল অ্যাশুলিয়ান দ্বিমুখী হাতিয়ার- বিশেষত হ্যান্ডঅ্যাক্স-এর উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি। মুভিয়াসের দৃষ্টিতে, এই ধরনের দ্বিমুখী পাথর-উপকরণ থাকা মানেই 'অগ্রগতি' ও 'গতিশীলতা'-র প্রমাণ। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে কুন
(Coon) এই ধারণাকে আরও দৃঢ় করে 'মুভিয়াস লাইন' নামে অভিহিত করেন। এরপর থেকে, কেন মুভিয়াস লাইনের পূর্বদিকে অ্যাশুলিয়ান হাতিয়ার তুলনামূলকভাবে বিরল—এই প্রশ্নে বিপুল গবেষণা-সাহিত্য গড়ে উঠেছে। কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছেন পরিবেশগত কারণ, কেউ কাঁচামালের সীমাবদ্ধতা, আবার কেউ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে এর কারণ হিসেবে দেখেছেন। একই সঙ্গে, চীন ও কোরীয় উপদ্বীপের কিছু অঞ্চলে দ্বিমুখী হাতিয়ারের উপস্থিতি মুভিয়াস লাইনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো—মুভিয়াস আদৌ কি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন যে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরল ফ্লেক ও কোর-ভিত্তিক হাতিয়ারসমূহ  পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ও মধ্য প্লাইস্টোসিন যুগের অ্যাশুলিয়ান হাতিয়ারসমূহের সমসাময়িক ছিল? কিংবা কেন তিনি দ্বিমুখী হাতিয়ারকে “অগ্রগতি”-র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন—এই বিষয়গুলো প্রায় উপেক্ষিতই থেকে গেছে। এই সাধারণ অবহেলার আংশিক ব্যতিক্রম হল হুটেরার (Hutterer, ১৯৭৭)-এর একটি প্রবন্ধ, যেখানে মাঠপর্যায়ের তথ্যের ওপর আলোকপাত করা হয়েছিল, এবং সাম্প্রতিক সময়ে লেখকের নিজের গবেষণা, যেখানে মুভিয়াসের পূর্ব এশিয়া-বিরোধী বৌদ্ধিক কাঠামোর সমালোচনা করা হয়েছে (Dennell 2014a)

এই গ্রন্থ
Living in the Landscape-এ অন্তর্ভুক্ত বর্তমান প্রবন্ধে, লেখক ১৯৩৮ সালে মধ্য বার্মা (আধুনিক মায়ানমার)-এ পরিচালিত মুভিয়াসের মাঠকাজকে নতুন করে বিশ্লেষণ করেছেন। এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন জার্মান–আমেরিকান ভূতত্ত্ববিদ হেলমুট দে টেরা। মধ্য বার্মায়

১৯৩৭-৩৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্য বার্মার অভিযান
(The 1937–38 expedition to Central Burma)
গণবিমান চলাচলের যুগের আগের সময়ে, আমেরিকা থেকে বার্মা পর্যন্ত একটি বৈজ্ঞানিক অভিযান পরিচালনা করা ছিল এক বিরাট উদ্যোগ। বার্মা ছিল একটি বিশাল দেশ। এর আয়তন প্রায় ২,৬১,০০০ বর্গমাইল (অথবা ৬৭৭,০০০ বর্গকিলোমিটার, যা ব্রিটেনের আয়তনের প্রায় আড়াই গুণ। এখানকার জলবায়ু প্রধানত মৌসুমি বায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; জুন মাসে বর্ষা শুরু হয়। সে কারণে দে টেরা বিচক্ষণতার সঙ্গে শীতল ও শুষ্ক শীতকালেই তাঁর মাঠকাজ সম্পন্ন করেন।

দে টেরা, তেইয়ার দ্য শার্দাঁ
(Teilhard de Chardin) এবং মুভিয়াস- তিনজনেরই এটি ছিল বার্মায় প্রথম এবং একমাত্র আগমন। মুভিয়াস ও তাঁর স্ত্রী আমেরিকা থেকে ব্রিটেন হয়ে ভূমধ্যসাগর ও সুয়েজ খাল অতিক্রম করে ভারতে পৌঁছান। ১৯৩৭ সালের ১৪ নভেম্বর তাঁরা কলকাতায় দে টেরার সঙ্গে মিলিত হন এবং সেখান থেকে একসঙ্গে জাহাজে রেঙ্গুন-এ যান। রেঙ্গুন থেকে তাঁরা ট্রেনে প্রায় ১৬০ মাইল দূরের প্রোম-এ পৌঁছান। এরপর ইরাবতী  নদীপথে স্টিমারে করে ঊর্ধ্বমুখে যাত্রা করে ২৩ নভেম্বর ইয়েনাংইয়াউং-এ উপস্থিত হন। সেখান থেকে তাঁরা প্রায় আট দিন মাঠকাজ করেন (সম্ভবত গাড়ি ব্যবহার করে) এবং মৃত আগ্নেয়গিরি মাউন্ট পোপা-তে দুটি অভিযান পরিচালনা করেন, যেখানে একটি বিখ্যাত বৌদ্ধ মঠ অবস্থিত। ২ ডিসেম্বর তাঁরা পুনরায় স্টিমারে করে আরও প্রায় ১৬০ মাইল নদীপথ অতিক্রম করে মান্দালয়-এ পৌঁছান এবং সন্নিকটবর্তী মিংগুন -এ একটি শিবির স্থাপন করেন। সম্ভবত এটি বার্মা অয়েল কোম্পানি বা জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া -র বার্মা শাখার কোনো বাংলো ছিল, কারণ দে টেরা উভয় সংস্থাকেই সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। মিংগুনে অবস্থানকালে তাঁরা একটি ভূতাত্ত্বিক প্রাথমিক সমীক্ষা  পরিচালনা করেন এবং নদীর পশ্চিমদিকে অবস্থিত বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জীবাশ্ম সংগ্রহ করেন (Terra 1943a, পৃ. ২৬৮)। মাত্র দুই সপ্তাহ পর, ১৬ ডিসেম্বর, ড. ও মিসেস মুভিয়াস দক্ষিণ শান রাজ্য -এর দিকে রওনা দেন, যেখানে তাঁরা নব্যপ্রস্তর যুগের নিদর্শন অনুসন্ধান করছিলেন। দে টেরা মান্দালয় হয়ে উত্তর শান রাজ্যে যান—ইরাবতী নদী ধরে থাবেইতকিন পর্যন্ত নৌপথে, তারপর গাড়িতে করে মোগক-এ পৌঁছান। প্রায় এক সপ্তাহ পর, অর্থাৎ বড়দিনের কাছাকাছি সময়ে, তেইয়ার দ্য শার্দাঁ চীন থেকে—সম্ভবত রেঙ্গুন হয়ে বা কুনমিং হয়ে স্থলপথে—মোগকে এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। তাঁরা একসঙ্গে মোগকের আশপাশের গুহা ও ফাটলে জীবাশ্ম সংগ্রহ করেন, এরপর মিনবু-র পশ্চিমে অবস্থিত আরাকান ইয়োমা পর্বতমালার ঢালু অঞ্চলে যান এবং শেষে ইয়েনাংইয়াউং-এর দক্ষিণে ম্যাগওয়-এ পৌঁছান। ১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি মুভিয়াস দম্পতি তাঁদের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হন। ম্যাগওয়ে অঞ্চলেই প্রথম প্লাইস্টোসিন যুগের স্তর ও সম্ভাব্য নদী-টেরেস ক্রমের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফলে এই অঞ্চলটি তাঁদের মাঠকাজের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।


১৯৩৮ সালে মধ্য বার্মা
(Central Burma in 1938)
১৯৩৮ সালে মধ্য বার্মা ছিল এক অর্থে 'প্রাকৃতিক গবেষণাগার'। ইরাবতী নদী ও তার উপনদীগুলি বিস্তীর্ণ সমভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বহু স্তরবিশিষ্ট নদী-টেরেস গঠন করেছিল। এই টেরেসসমূহের মধ্যে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক যুগের অবক্ষেপ সংরক্ষিত ছিল, যেগুলি থেকে প্লাইস্টোসিন যুগের পরিবেশ ও জীবজগত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব। ইরাবতী উপত্যকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এখানকার শুষ্ক জলবায়ু ও অপেক্ষাকৃত কম উদ্ভিদ আচ্ছাদন। ফলে নদীতীর, টেরেস এবং ক্ষয়প্রাপ্ত পাহাড়ি ঢালে প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন সহজেই দৃশ্যমান হত। এই পরিবেশ আফ্রিকা বা ইউরোপের বহু অঞ্চলের তুলনায় পাথর-হাতিয়ার ও জীবাশ্ম অনুসন্ধানের জন্য অধিক সহায়ক ছিল। মুভিয়াস ও দে টেরা বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন এই অঞ্চলের প্লাইস্টোসিন স্তরবিন্যাস নির্ণয়ে। তাঁদের লক্ষ্য ছিল- নদী-টেরেসগুলির আপেক্ষিক কালানুক্রম স্থির করা, সেই টেরেসগুলির সঙ্গে পাথর-হাতিয়ার ও জীবাশ্মের সম্পর্ক নির্ধারণ করা, এবং মধ্য বার্মার প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতিকে এশিয়ার বৃহত্তর প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা। এই গবেষণার একটি মৌলিক অনুমান ছিল-ইরাবতী উপত্যকার টেরেসগুলিকে ইউরোপ ও ভারতের সুপরিচিত নদী-টেরেস ক্রমের সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব। সেই সময় ভূতত্ত্ববিদদের মধ্যে নদী-টেরেসকে জলবায়ুগত চক্র (বিশেষত হিমযুগ ও অন্তঃহিমযুগ)-এর প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা প্রবল ছিল। দে টেরা এই ধারণার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন। মধ্য বার্মায় পরিচালিত সমীক্ষায় দে টেরা একাধিক উচ্চ ও নিম্ন টেরেস চিহ্নিত করেন এবং সেগুলিকে প্রাচীন, মধ্য ও অপেক্ষাকৃত নবীন প্লাইস্টোসিন পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। এই টেরেসগুলির ওপর ও মধ্যে পাওয়া পাথর-হাতিয়ারকে তিনি কালানুক্রমিক সূচক হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তবে বাস্তবে সমস্যাটি ছিল অনেক জটিল। ইরাবতী নদীর প্রবল ক্ষয় ও পুনঃঅবক্ষেপণের ফলে বহু স্থানে প্রাচীন স্তর নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বা নতুন অবক্ষেপে ঢেকে পড়েছিল। ফলে একটি নির্দিষ্ট হাতিয়ার ঠিক কোন স্তরের সঙ্গে যুক্ত—তা নির্ণয় করা সবসময় সম্ভব হয়নি। তবু মুভিয়াস এই সীমাবদ্ধতাগুলি সত্ত্বেও সংগৃহীত হাতিয়ারসমূহের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক শ্রেণিবিন্যাস  নির্মাণে এগিয়ে যান। মুভিয়াসের দৃষ্টিতে, মধ্য বার্মার অধিকাংশ পাথর-হাতিয়ার ছিল সরল ফ্লেক ও কোর-ভিত্তিক। তিনি এগুলিকে ইউরোপ ও ভারতের অ্যাশুলিয়ান ঐতিহ্যের তুলনায় “প্রাথমিক” বা “অপরিণত” বলে ব্যাখ্যা করেন। বিশেষত দ্বিমুখী হাতিয়ার—হ্যান্ডঅ্যাক্স বা ক্লিভার—এর প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিকে তিনি একটি মৌলিক সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার নিদর্শন হিসেবে দেখেন। এই পর্যবেক্ষণই পরবর্তীকালে মুভিয়াস লাইন ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু এখানে লক্ষণীয় যে, মুভিয়াস খুব কম ক্ষেত্রেই এই হাতিয়ারগুলির যথাযথ ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। অনেক সময়ই নদীর তলদেশ বা টেরেসের পৃষ্ঠ থেকে সংগৃহীত বিচ্ছিন্ন নিদর্শনের ওপর ভিত্তি করেই তিনি সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

মধ্য বার্মার পাথর-হাতিয়ার: মধ্য বার্মা থেকে সংগৃহীত পাথর-হাতিয়ারসমূহ ছিল মূলত সরল প্রকৃতির। মুভিয়াসের সংগ্রহে যে উপকরণগুলি পাওয়া যায়, তার অধিকাংশই ছিল কোর, ফ্লেক এবং অল্পমাত্রায় পুনঃঘষিত ফ্লেক। এগুলির মধ্যে পরিকল্পিত দ্বিমুখী আকৃতি বা সূক্ষ্ম সমমিতি খুব কমই দেখা যায়। এই বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতেই মুভিয়াস মধ্য বার্মার প্রাগৈতিহাসিক শিল্পকে ইউরোপ ও ভারতের অ্যাশুলিয়ান ঐতিহ্যের তুলনায় কম “উন্নত” বলে বিবেচনা করেন। এই হাতিয়ারসমূহ প্রধানত নদীর টেরেসের পৃষ্ঠদেশ, নুড়িপাথরের স্তর এবং ক্ষয়প্রাপ্ত ঢাল থেকে সংগৃহীত হয়েছিল। খুব কম ক্ষেত্রেই এগুলি সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট কোনো অবক্ষেপ স্তরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে এগুলির সুনির্দিষ্ট কাল নির্ধারণ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তবু মুভিয়াস এই হাতিয়ারগুলিকে সামগ্রিকভাবে প্রাচীন প্লাইস্টোসিন যুগের সঙ্গে যুক্ত করেন। হাতিয়ারগুলির কাঁচামাল ছিল প্রধানত স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত কঙ্কর ও নুড়ি—বিশেষত কোয়ার্টজাইট ও চ্যালসেডনি জাতীয় পাথর। এই কাঁচামাল অপেক্ষাকৃত কঠিন ও ভঙ্গুর হওয়ায় সূক্ষ্ম দ্বিমুখী হাতিয়ার নির্মাণ কঠিন ছিল—এই যুক্তি পরবর্তীকালে অনেক গবেষক উত্থাপন করেছেন। কিন্তু মুভিয়াস নিজে এই বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি; বরং তিনি এটিকে সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। মধ্য বার্মার হাতিয়ারসমূহের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল এদের কার্যকরী সরলতা। অনেক ফ্লেকেই তীক্ষ্ণ ধার দেখা যায়, যা কাটা বা চেরা কাজে ব্যবহারের উপযোগী। তবে পরিকল্পিত আকৃতি, ধারাবাহিক পুনঃঘষণ  বা বিশেষায়িত যন্ত্র—যেমন হ্যান্ডঅ্যাক্স, ক্লিভার বা পিক—প্রায় অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতিই মুভিয়াসের দৃষ্টিতে ছিল সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। মুভিয়াস এই সরল হাতিয়ারসমূহকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অপরিবর্তিত প্রযুক্তিগত ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, মধ্য বার্মা তথা পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানবগোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসেছে এবং সেখানে ইউরোপ ও আফ্রিকার মতো প্রযুক্তিগত “অগ্রগতি” ঘটেনি। তবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায় উপেক্ষিত থেকে যায়—এই সরল হাতিয়ারসমূহ কি সত্যিই অ্যাশুলিয়ান ঐতিহ্যের সমসাময়িক ছিল, নাকি এগুলি কোনো ভিন্ন সময়পর্বের প্রতিনিধিত্ব করে? যেহেতু অধিকাংশ নিদর্শনের নির্ভরযোগ্য স্তরগত প্রেক্ষাপট অনুপস্থিত ছিল, তাই এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া কঠিন। পরবর্তীকালে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, সরল ফ্লেক ও কোর-ভিত্তিক প্রযুক্তি বহু অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে, এমনকি যখন একই সময়ে অন্যত্র উন্নত দ্বিমুখী হাতিয়ার ব্যবহৃত হচ্ছে। অতএব প্রযুক্তিগত সরলতা নিজেই কোনো সমাজের “পশ্চাৎপদতা”-র প্রমাণ হতে পারে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, মধ্য বার্মার পাথর-হাতিয়ারসমূহকে একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক অভিযোজন হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত—যেখানে কাঁচামাল, পরিবেশ ও কার্যকরী প্রয়োজন প্রযুক্তির রূপ নির্ধারণ করেছে।  

মুভিয়াসের ব্যাখ্যার সমালোচনা
মুভিয়াস মধ্য বার্মার পাথর-হাতিয়ারসমূহের ভিত্তিতে যে সামগ্রিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে বহু গবেষকের দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাঁর বিশ্লেষণের প্রধান দুর্বলতা ছিল—প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য ভূতাত্ত্বিক ও স্তরগত প্রেক্ষাপটের অভাব।

মুভিয়াস যেসব হাতিয়ার সংগ্রহ করেছিলেন, তার অধিকাংশই ছিল ভূপৃষ্ঠে প্রাপ্ত বা নদী-টেরেসের উপরিভাগ থেকে সংগৃহীত। এগুলিকে তিনি প্রায় স্বতঃসিদ্ধভাবে প্রাচীন প্লাইস্টোসিন যুগের বলে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে এই নিদর্শনগুলির অনেকই বিভিন্ন সময়পর্বের হতে পারে এবং নদীর ক্ষয় ও পুনঃঅবক্ষেপণের ফলে সেগুলি একত্রে জমা হয়েছিল—এ সম্ভাবনা তিনি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেননি।

আরও একটি গুরুতর সমস্যা ছিল তাঁর তুলনামূলক পদ্ধতি। মুভিয়াস ইউরোপ ও আফ্রিকার অ্যাশুলিয়ান ঐতিহ্যকে একটি সার্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং সেই মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে মধ্য বার্মা ও পূর্ব এশিয়ার শিল্পকে “অপরিণত” বা “অসম্পূর্ণ” বলে চিহ্নিত করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি ইউরোপকেন্দ্রিক বিবর্তনবাদী ধারণার প্রতিফলন, যেখানে প্রযুক্তিগত বৈচিত্র্যকে সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতার নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়।

পরবর্তীকালের গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে যে, দ্বিমুখী হ্যান্ডঅ্যাক্সের অনুপস্থিতি মানেই কোনো অঞ্চলে প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব—এ ধারণা টেকসই নয়। বহু অঞ্চলে, বিশেষত যেখানে কাঁচামাল ছোট নুড়ি বা ভঙ্গুর প্রকৃতির, সেখানে ফ্লেক-ভিত্তিক প্রযুক্তিই অধিক কার্যকর ও যুক্তিসঙ্গত হতে পারে।

এছাড়া, মুভিয়াস তাঁর বিশ্লেষণে পরিবেশগত অভিযোজনের ভূমিকা প্রায় উপেক্ষা করেছিলেন। মধ্য বার্মার শুষ্ক পরিবেশ, নদী-নির্ভর জীবনযাপন ও নির্দিষ্ট ধরনের কাঁচামাল মানুষের প্রযুক্তিগত পছন্দ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে—এই সম্ভাবনা তিনি যথাযথভাবে বিবেচনায় আনেননি।

মুভিয়াস লাইন ধারণার সমস্যা
মুভিয়াস লাইন ধারণা অনুযায়ী, ভারত উপমহাদেশের পূর্বদিকে—বিশেষত পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়—অ্যাশুলিয়ান দ্বিমুখী হাতিয়ার অনুপস্থিত বা অত্যন্ত বিরল। এই রেখার পশ্চিমে ' উন্নত' অ্যাশুলিয়ান ঐতিহ্য এবং পূর্বে “প্রাথমিক” কোর-ফ্লেক ঐতিহ্য—এই দ্বিভাজন বহু দশক ধরে প্রত্নতত্ত্বের পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু করে নতুন নতুন আবিষ্কার এই সরল বিভাজনকে ক্রমশ দুর্বল করে দেয়। চীন, কোরিয়া, এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে দ্বিমুখী হাতিয়ারের নিদর্শন পাওয়া যেতে থাকে, যেগুলি মুভিয়াস লাইনের পূর্বে অবস্থান করে। এই আবিষ্কারগুলি স্পষ্ট করে দেয় যে, দ্বিমুখী প্রযুক্তি এশিয়ায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল—এই ধারণা সঠিক নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—মুভিয়াস লাইনের ধারণা প্রযুক্তিগত বৈচিত্র্যকে একটি একরৈখিক বিবর্তনধারায় বাঁধতে চেয়েছে। আধুনিক প্রত্নতত্ত্বে বরং স্বীকৃত হয়েছে যে, মানব প্রযুক্তির বিকাশ বহুরৈখিক (multilinear) এবং অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন পথে অগ্রসর হতে পারে।
 

এই প্রেক্ষাপটে মুভিয়াস লাইনকে আজ আর একটি কঠোর সীমানা হিসেবে নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক গবেষণা-অনুমান হিসেবে দেখা হয়—যা নির্দিষ্ট সময়ের তথ্য ও তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই গড়ে উঠেছিল।

উপসংহার
মধ্য বার্মায় ১৯৩৭–৩৮ সালের অভিযানের মাধ্যমে মুভিয়াস ও দে টেরা যে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, তা নিঃসন্দেহে এশিয়ার প্রাগৈতিহাসিক গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত অনেক সিদ্ধান্ত—বিশেষত প্রযুক্তিগত “পশ্চাৎপদতা” ও মুভিয়াস লাইন ধারণা—আজ আর অপরিবর্তনীয় সত্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

আধুনিক গবেষণা দেখিয়েছে যে, প্রযুক্তিগত সরলতা ও জটিলতা কোনো সার্বজনীন মানদণ্ডে মাপা যায় না। বরং পরিবেশ, কাঁচামাল, কার্যকরী প্রয়োজন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয়েই প্রত্নতাত্ত্বিক শিল্পের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, মধ্য বার্মার পাথর-হাতিয়ারসমূহকে একটি স্বতন্ত্র ও যুক্তিসঙ্গত আঞ্চলিক প্রযুক্তিগত ঐতিহ্য হিসেবে দেখা উচিত—কোনো “অপূর্ণ” বা “ব্যর্থ” অ্যাশুলিয়ান রূপ হিসেবে নয়।

মুভিয়াসের ব্যাখ্যা ও তার সীমাবদ্ধতা
মধ্য বার্মায় সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মুভিয়াস যে ব্যাখ্যা প্রদান করেন, তার একটি মৌলিক সমস্যা ছিল তথ্য ও সিদ্ধান্তের মধ্যকার অসমতা। সীমিত, বিচ্ছিন্ন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্তরগতভাবে অনির্দিষ্ট নিদর্শনের ওপর নির্ভর করেই তিনি সুদূরপ্রসারী সাংস্কৃতিক ও বিবর্তনমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

বিশেষত, তিনি ধরে নেন যে মধ্য বার্মার সরল ফ্লেক ও কোর-ভিত্তিক হাতিয়ারসমূহ ইউরোপ, আফ্রিকা ও ভারতের অ্যাশুলিয়ান দ্বিমুখী শিল্পের সমসাময়িক। এই সমসাময়িকতার ধারণাই তাঁকে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে “পশ্চাৎপদ” বা “স্থবির” বলে চিহ্নিত করতে সহায়তা করে। অথচ এই ধারণা যাচাই করার মতো নির্ভরযোগ্য কালানুক্রমিক প্রমাণ তাঁর হাতে ছিল না।

মুভিয়াসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুমান ছিল—প্রযুক্তিগত জটিলতা মানেই বৌদ্ধিক বা সাংস্কৃতিক অগ্রগতি। এই দৃষ্টিভঙ্গি সে সময়ের ইউরোপ-কেন্দ্রিক বিবর্তনবাদী চিন্তার প্রতিফলন, যেখানে মানবসভ্যতার বিকাশকে একটি একরৈখিক সোপানক্রমে কল্পনা করা হত। এই কাঠামোর মধ্যে ইউরোপ ও আফ্রিকার অ্যাশুলিয়ান ঐতিহ্য ছিল “মানদণ্ড”, আর অন্যান্য অঞ্চলকে তার সঙ্গে তুলনা করেই বিচার করা হত। কিন্তু বাস্তবে প্রযুক্তিগত বৈচিত্র্য অনেক ক্ষেত্রেই পরিবেশ, কাঁচামাল ও কার্যকরী প্রয়োজনের দ্বারা নির্ধারিত হয়। কোনো অঞ্চলে হ্যান্ডঅ্যাক্সের অনুপস্থিতি সেই সমাজের অক্ষমতার প্রমাণ নয়; বরং তা ভিন্ন ধরনের অভিযোজন কৌশলের ইঙ্গিতও হতে পারে। মুভিয়াস এই বিকল্প ব্যাখ্যাগুলিকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেন। এ ছাড়া, তিনি মধ্য বার্মার হাতিয়ারসমূহের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্যও যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করেননি। ভিন্ন ভিন্ন স্থান ও ভূ-প্রেক্ষাপটে পাওয়া নিদর্শনগুলিকে তিনি প্রায় একই সাংস্কৃতিক শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করেন, ফলে স্থানিক ও কালিক পার্থক্য আড়ালে থেকে যায়।

মুভিয়াস লাইন ধারণার উৎপত্তি

মধ্য বার্মা, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের তথ্য একত্রিত করে মুভিয়াস একটি কল্পিত বিভাজনরেখার কথা ভাবতে শুরু করেন, যা পরবর্তীকালে “মুভিয়াস লাইন” নামে পরিচিত হয়। এই রেখার পশ্চিমদিকে তিনি অ্যাশুলিয়ান দ্বিমুখী ঐতিহ্যের বিস্তৃতি কল্পনা করেন, আর পূর্বদিকে দেখান সরল ফ্লেক ও কোর-ভিত্তিক শিল্পের আধিপত্য। এই রেখাটি কোনো ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক সীমানা ছিল না; বরং এটি ছিল একটি তাত্ত্বিক নির্মাণ। তবু ধীরে ধীরে এটি প্রাগৈতিহাসিক গবেষণায় একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যামূলক কাঠামোতে পরিণত হয়। বহু দশক ধরে গবেষকরা এই রেখার অস্তিত্ব মেনে নিয়েই পূর্ব এশিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য ব্যাখ্যা করেছেন। সমস্যা হল, এই রেখাটি মূলত নেতিবাচক প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে—অর্থাৎ যেখানে হ্যান্ডঅ্যাক্স পাওয়া যায়নি, সেখানেই রেখাটি টানা হয়েছে। ইতিবাচক প্রমাণের অভাবকে এখানে সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল। পরবর্তীকালে চীন, কোরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে দ্বিমুখী হাতিয়ারের আবিষ্কার এই রেখার সার্বজনীন বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, এই আবিষ্কারগুলিকে প্রায়ই “ব্যতিক্রম” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, মূল তত্ত্ব পুনর্বিবেচনা করার পরিবর্তে।

পুনর্মূল্যায়ন: মুভিয়াস কোথায় ভুল করেছিলেন
পশ্চাৎদৃষ্টিতে বিচার করলে, মুভিয়াসের মূল ভুলটি ছিল তথ্যের সীমাবদ্ধতাকে তাত্ত্বিক নিশ্চিততা হিসেবে গ্রহণ করা। মধ্য বার্মায় তাঁর স্বল্পকালীন মাঠকাজ তাঁকে বিস্তৃত ও গভীর তথ্যভিত্তি দেয়নি, অথচ তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল মহাদেশব্যাপী। আরও একটি সমস্যা ছিল সময়নির্ধারণ। আধুনিক তারিখ নির্ণয় পদ্ধতি—যেমন প্যালিওম্যাগনেটিজম, অপটিক্যাল লুমিনেসেন্স বা রেডিওমেট্রিক ডেটিং—তখনো অনুপস্থিত ছিল। ফলে মুভিয়াস যে সমসাময়িকতার ধারণার ওপর তাঁর তত্ত্ব নির্মাণ করেন, তা আজকের মানদণ্ডে অত্যন্ত অনিশ্চিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুভিয়াস পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে মানব বিবর্তনের ' প্রান্তিক অঞ্চল ' হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। আধুনিক গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে এই অঞ্চলগুলি ছিল গতিশীল, বৈচিত্র্যময় এবং মানব অভিযোজনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার
মধ্য বার্মায় ১৯৩৭ - ৩৮ সালের অভিযান মুভিয়াসের চিন্তাজগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু এই অভিযানের সীমাবদ্ধ তথ্য থেকেই যে তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মিত হয়েছিল—তা দীর্ঘদিন ধরে এশীয় প্রাগৈতিহাসিক গবেষণাকে প্রভাবিত করেছে, কখনো কখনো বিভ্রান্তও করেছে। আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, মুভিয়াস লাইন কোনো স্থায়ী বাস্তবতা নয়; বরং এটি বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের প্রত্নতাত্ত্বিক চিন্তার একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। মধ্য বার্মার পাথর-হাতিয়ারসমূহকে এখন আর “অপরিণত” বলে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা প্রযুক্তিগত ঐতিহ্য হিসেবে দেখা হয়।