এই সময় ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বৌদি (প্রয়াত বসন্তকুমার সেনগুপ্তের স্ত্রী) গিরিবালা সেনগুপ্তা তাঁর কন্যা আশালতা সেনগুপ্তাকে (দোলন বা দুলী) নিয়ে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের আশ্রয়ে ছিলেন। কান্দিরপাড়ে অবস্থানকালে বিরজাসুন্দরীকে নজরুল মা সম্বোধন করার পাশাপাশি গিরিবালাকে মাসিমা সম্বোধন করেছিলেন। এই সময় আশালতার বয়স ছিল ১৩ বৎসর। পরে আশালতার সাথে নজরুলের বিবাহ হয়েছিল। কবি তাঁর নাম দিয়েছিলেন প্রমীলা।'তুমি এসে দাঁড়াতেই আমি কেন অভিভূতের মতো তোমার পানে চেয়ে রইলাম। আমার এখন মুখর মুখও মূকের মতো কথা হারিয়ে ফেলল।
আমি তোমায় চিনলাম। কত দেশ-বিদেশেই তো ঘুরে বেড়ালাম, কিন্তু এমন ভরাট শান্ত স্নিগ্ধ মাতৃরূপ তো আর আমার চোখে পড়েনি। সে রাজরাজেশ্বরী বিশ্বমাতার অন্নপূর্ণা-রূপে দু-চোখ আমার ভরে গেল! তোমার বিহ্বল চোখের চাওয়াতেও জন্ম-জন্মান্তরের মাতৃত্বের অতৃপ্ত ক্ষুধিত চেনা চাওয়া দেখেই আমি চিনলাম, এ যে আমারই হারা-মায়ের দৃষ্টি! তুমি বলেছিলে নাকি, তোমার কোন-সে অতীত-জন্মের হারা-মানিককে খুঁজে পেতেই এমন করে বারেবারে শত শত মা-হারা ছেলের মা হচ্ছ! এমন করে বিশ্বমায়ের ফাঁদ পেতেছে সেই পলাতকা শিশুকে ধরবার জন্য। তাই তুমি ধর্ম-সমাজ কিছু মানোনি, সকল পথে-পাওয়া ছেলেকেই সমানভাবে কোলে দিয়েছ। আকাশে বাতাসে আমার মনের কথা ধ্বনিত হলো; ওরে, এবার আমায় পথে বেরিয়ে পড়া সার্থক হয়েছে! এবার আমি বুঝি 'অসংখ্য বন্ধন মাঝে লভিব মুক্তির স্বাদ'। কত কথাই না মনে হলো তখন, সে যেন কেমন এক অভিভূতের ভাব। সেসব মনে পড়ে এত বিহ্বল হয়ে পড়ছি আমি যে, আজ তা জানাতে গিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলছি। ... যাক, সে রাত্রিতে বড় শান্তির ঘুম ঘুমালাম- এই সুখে যে, আজ আমি ঘরের কোলে ঘুমাচ্ছি। ... তারপর, বুকে তীর বিঁধে আবার যখন আহত পাখিটির মতন রক্তবমন করতে করতে তোমার দ্বারে এসে লুটিয়ে পড়লাম, তখন তুমি আর মাসি-মা আমায় কী যত্নেই না বুকে করে এসে তুলে নিলে। তোমরা আর আমার ঐ শিশু-বোন কটিই আবার যমের দ্বার হতে আমায় ফিরিয়ে আনলে। আজ ভাবছি কী ঘরের মায়ায় বনের হরিণকে মুগ্ধ করলে ? আশীর্বাদ করো মা, তোমাদের এই দেওয়া প্রাণ যেন তোমাদেরই কাজে লাগিয়ে যেতে পারি।