বিরজাসুন্দরী দেবী
বাংলা সাহিত্য ও বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অত্যন্ত স্মরণীয় ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব।  কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ইন্সপেক্টর ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের স্ত্রী। কবি কাজী নজরুল ইসলাম নিজের গর্ভধারিণী মায়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁকে 'মা' বলে ডাকতেন।

নজরুলের সাথে বিরজাসুন্দরীর প্রথম পরিচয়
১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে, নজরুলের মানসিক অস্থিরতা কিছুটা কাটিয়ে ওঠার উদ্দেশ্যে আলী আকবর খান তাঁকে তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দৌলতপুরে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। মোসলেম ভারত-এর পরিচালক আফজাল-উল হক তাঁকে কুমিল্লা যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। এই সূত্রে
এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে (সোমবার, ২২ চৈত্র ১৩২৭), কুমিল্লায় আলী আকবর ও নজরুল এসে উঠেছিলেন কুমিল্লার ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে। এখানেই ইন্দ্রকুমার-এর স্ত্রী বিরজাসুন্দরীর সাথে প্রথম নজরুলের দেখা হয়। ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের স্ত্রী ছিলেন- বিরজাসুন্দরী। তিনি প্রথম দর্শনেই  নজরুলকে পুত্রস্নেহে কাছে টেনে নেন। নজরুলও তাঁকে তাঁকে পরমভক্তিতে মাতৃরূপে গ্রহণ করেন।

নজরুল তাঁর 'হারা ছেলের চিঠি'-তে এ বিষয়ে লিখেছেন-

    'তুমি এসে দাঁড়াতেই আমি কেন অভিভূতের মতো তোমার পানে চেয়ে রইলাম। আমার এখন মুখর মুখও মূকের মতো কথা হারিয়ে ফেলল।
    আমি তোমায় চিনলাম। কত দেশ-বিদেশেই তো ঘুরে বেড়ালাম, কিন্তু এমন ভরাট শান্ত স্নিগ্ধ মাতৃরূপ তো আর আমার চোখে পড়েনি। সে রাজরাজেশ্বরী বিশ্বমাতার অন্নপূর্ণা-রূপে দু-চোখ আমার ভরে গেল! তোমার বিহ্বল চোখের চাওয়াতেও জন্ম-জন্মান্তরের মাতৃত্বের অতৃপ্ত ক্ষুধিত চেনা চাওয়া দেখেই আমি চিনলাম, এ যে আমারই হারা-মায়ের দৃষ্টি! তুমি বলেছিলে নাকি, তোমার কোন-সে অতীত-জন্মের হারা-মানিককে খুঁজে পেতেই এমন করে বারেবারে শত শত মা-হারা ছেলের মা হচ্ছ! এমন করে বিশ্বমায়ের ফাঁদ পেতেছে সেই পলাতকা শিশুকে ধরবার জন্য। তাই তুমি ধর্ম-সমাজ কিছু মানোনি, সকল পথে-পাওয়া ছেলেকেই সমানভাবে কোলে দিয়েছ। আকাশে বাতাসে আমার মনের কথা ধ্বনিত হলো; ওরে, এবার আমায় পথে বেরিয়ে পড়া সার্থক হয়েছে! এবার আমি বুঝি 'অসংখ্য বন্ধন মাঝে লভিব মুক্তির স্বাদ'। কত কথাই না মনে হলো তখন, সে যেন কেমন এক অভিভূতের ভাব। সেসব মনে পড়ে এত বিহ্বল হয়ে পড়ছি আমি যে, আজ তা জানাতে গিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলছি। ... যাক, সে রাত্রিতে বড় শান্তির ঘুম ঘুমালাম- এই সুখে যে, আজ আমি ঘরের কোলে ঘুমাচ্ছি। ... তারপর, বুকে তীর বিঁধে আবার যখন আহত পাখিটির মতন রক্তবমন করতে করতে তোমার দ্বারে এসে লুটিয়ে পড়লাম, তখন তুমি আর মাসি-মা আমায় কী যত্নেই না বুকে করে এসে তুলে নিলে। তোমরা আর আমার ঐ শিশু-বোন কটিই আবার যমের দ্বার হতে আমায় ফিরিয়ে আনলে। আজ ভাবছি কী ঘরের মায়ায় বনের হরিণকে মুগ্ধ করলে ? আশীর্বাদ করো মা, তোমাদের এই দেওয়া প্রাণ যেন তোমাদেরই কাজে লাগিয়ে যেতে পারি।

এই সময় ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বৌদি (প্রয়াত বসন্তকুমার সেনগুপ্তের স্ত্রী) গিরিবালা সেনগুপ্তা তাঁর কন্যা আশালতা সেনগুপ্তাকে (দোলন বা দুলী) নিয়ে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের আশ্রয়ে ছিলেন। কান্দিরপাড়ে অবস্থানকালে  বিরজাসুন্দরীকে নজরুল মা সম্বোধন করার পাশাপাশি গিরিবালাকে মাসিমা সম্বোধন করেছিলেন। এই সময় আশালতার বয়স ছিল ১৩ বৎসর। পরে আশালতার সাথে নজরুলের বিবাহ হয়েছিল। কবি তাঁর নাম দিয়েছিলেন প্রমীলা

৫ এপ্রিল (মঙ্গলবার, ২৩ চৈত্র ১৩২৮) আলী আকবর খান নজরুলকে সাথে নিয়ে, কুমিল্লা শহর থেকে তাঁর গ্রামের বাড়ি  দৌলতপুরের যান। সেখানে নজরুলের সাথে আলী আকবর খানের ভাগ্নী সৈয়দা খাতুনের পরিচয় এবং প্রণয় ঘটে। নজরুল এঁর নাম রেখেছিলেন নার্গিস।

১৭ই জুন ১৯২১ (শুক্রবার ৩রা আষাঢ় ১৩২৮) কুমিল্লার দৌলতপুরে, নজরুল ইসলামের সাথে নার্গিসের আক্‌দ আসর বসে দৌলতপুরস্থ আলী আকবর খানের  বাসায়। এই অনুষ্ঠানে আলী আকবর খান কুমিল্লা থেকে সপরিবারে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। বিবাহ অনুষ্ঠানে  ইন্দ্রকুমারের পরিবারের প্রায় সকলেই  দৌলতপুরে গিয়েছিলেন। মুজাফ্ফর আহমদের 'কাজী নজরুল ইস্‌লাম স্মৃতিকথা' গ্রন্থে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের সাথে আর যাঁরা দৌলতপুর গিয়েছিলেন তাঁর একটি তালিকা পাওয়া যায়। এঁরা ছিলেন- ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত, বিরজাসুন্দরী দেবী (ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের স্ত্রী), বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের ছেলে, বীরেন্দ্রকুমারের স্ত্রী, বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের শিশুপুত্র প্রবীরকুমার সেনগুপ্ত, গিরিবালা দেবী (বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বিধবা জ্যেঠী মা), কুমারী প্রমীলা সেনগুপ্তা (গিরিবালা দেবীর ১৩ বছরের কন্যা), কুমারী কমলা সেনগুপ্তা (ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের ১২ বছরের মেয়ে), অঞ্জলি সেনগুপ্তা ওর্ফে জটু (ইন্দ্রকুমারের ৬ বছরের শিশুকন্যা) ও সন্তোষকুমার সেন (জ্ঞাতি কিশোর)।

১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে গিরিবালা দেবীর কন্যা আশালতা'র সাথে নজরুলের বিবাহ হয়। পারিবারিকভাবে কুমিল্লার সেনগুপ্ত পরিবারের সবাই এই বিবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। বিরজাসুন্দরী এই বিবাহ বন্ধ করার জন্য কলকাতায় এসে আশালতা এবং গিরিবালাকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু গিরিবালার দৃঢ়তার মুখে বিরজাসুন্দরী ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। এই বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে ২৪ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার, ১১ বৈশাখ ১৩৩১)।

১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্সি/হুগলি জেলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বন্দী অবস্থায় নজরুল যখন ৩৯ দিন ধরে আমরণ অনশন করছিলেন, তখন বিরজাসুন্দরী দেবীর হাত থেকেই লেবুর জল পান করে তিনি অনশন ভঙ্গ করেছিলেন।

১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল 'সর্বহারা' কাব্যগ্রন্থ বিরজাসুন্দরী দেবীকে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গপত্রে লেখা: 'মা (বিরজাসুন্দরী দেবী)র শ্রীচরণারবিন্দে'। উৎসর্গ কবিতায় তিনি তাঁকে 'সর্বসহা সর্বহারা জননী' বলে অভিহিত করেন।

বিরজাসুন্দরী নজরুল সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় (১১ আগস্ট ১৯২২) 'মায়ের আশিস' শিরোনামে তাঁর একটি লেখা প্রকাশিত হয়।  

১৯৩৫ সালের ১৬ আগস্ট নজরুল তাঁকে একটি চিঠি লেখেন (৩৯, সীতানাথ রোড থেকে), যেখানে তিনি তাঁকে প্রথম গুরু ও আদি মাতৃমূর্তি বলে স্মরণ করেন এবং জীবনের সংকটে তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।

বিরজাসুন্দরী দেবী সপরিবারে কলকাতায় চলে আসেন। নজরুল নিয়মিত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় তিনি দেহত্যাগ করেন। নজরুল তাঁর শয্যাপাশে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর অনুরোধে নিয়মিত হরি-নাম গেয়ে শোনাতেন।

এঁদের একমাত্র পুত্রের নাম ছিল- বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত।