মালকাজান ও গহরজান

গহরজান
১৮৭৩ -১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দ
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কলকাতার প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী।

১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে জুন উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ের  জন্ম। তাঁর পিতা রবার্ট উইলিয়াম ইয়োয়ার্ড ছিলেন ইহুদি। মা রুক্মিণী ছিলেন ভারতীয়। বিবাহের পর রুক্মিণীর নাম হয়েছিল ভিক্টোরিয়া।
১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে এলাহাবাদ মরথডিস্ট এপিস্কপাল চার্চে ব্যাপ্টাইজ করে এঁদের একমাত্র কন্যার নাম রাখা হয়েছিল ইলিন অ্যাঞ্জেলিনা এডোয়ার্ড। ভিক্টোরিয়া ও রবার্টের সংসার বেশি দিন স্থায়ী হয় নি। ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে উভয়ের ভিতর ছাড়াছাড়ি হয়। এরপর সংসারের অভাবের তাড়নায় মালকাজান গণিকাবৃ্ত্তির পথ বেছে নেন।

এই সময়
ভিক্টোরিয়া খুরশিদ নামক একজন মুসলমান যুবকের সাথে ঘনিষ্ঠতা জন্মে। এরপর এঁরা বারাণসী শহরে চলে আসেন। এখানেই উভয়েই মা ও মেয়ে ধর্মান্তরিত হন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর ভিক্টোরিয়ার নাম হয় মালকাজান (বড়) এবং অ্যাঞ্জেলিনা নাম হয় গহরজান। উল্লেখ্য,
এই সময় আরও কয়েজন বাইজির নাম মালকাজান ছিলেন। এঁরা হলেন- আগ্রার মালকাজান, মুলক্ পুখরাজের মালকাজান, চুলবুলির মালকাজান। এদের ভিতরে বেনরাসের মালকাজান ছিলেন বয়সে বড়। তাই তিনি নিজের নাম রেখেছিলেন বড় মালকাজান

তরুণী গহরজান

মালকাজান ভাল গান করতেন এবং উর্দু ভাষায় কবিতা লিখতেন। এখানেই মালকাজান তাঁর কন্যা গহরজানকে সঙ্গীত শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেন। এখানে তাঁর সঙ্গীত গুরু ছিলেন পণ্ডিত বেচু মিশ্র। সহজাত প্রতিভায় এবং শিক্ষায় তিনি সঙ্গীতে অভাবনীয় উন্নতি করেন এবং অল্প সময়ের ভিতরেই তিনি বারানসির বাঈজিদের মধ্যে শ্রেষ্টত্ব লাভে সমর্থ হন।

চার বছর বারাণসীতে থাকার পর,  খুরশিদ, মালকাজান এবং গহরজানকে নিয়ে কলকাতার  কলুটোলা অঞ্চলে থাকা শুরু করেন। ইতিমধ্যেই দেশের রাজা-মহারাজাদের দরবারে মালকাজানের ডাক পড়া শুরু হয়। ক্রমে ক্রমে কলকাতায় তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে, ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মেটিয়াবুরুজের নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের দরবার ডাক পান । এখানে তাঁর সাথে পরিচয় ঘটে কত্থকের প্রবাদপ্রতিম গুরু বিন্দাদিন মহারাজের সাথে। গহরজানে সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে মহারাজ গহরের নাচের তালিম শুরু করেন ১১ বছর বয়সে। একই সাথে তিনি গানের চর্চা চালিয়ে যেতে থাকেন।

মায়ের ইচ্ছায় তিনি বাংলা গান শিখেছিলেন বামাচরণ ভট্টাচার্যের কাছে, আর রমেশচন্দ্র দাস বাবাজির কাছে শিখেছিলেন কীর্তন। এছাড়া শ্রীজান বাঈয়ের কাছে ধ্রুপদ-ধামার এবং মিসেস ডি’সিলভার কাছে কিছু ইংরেজি গানও শিখেছিলেন। তাঁর অন্যান্য গুরুদের মধ্যে ছিলেন রামকুমার মিশ্র, গণপত রাও প্রমুখ।

গহরজান হিন্দি, বাংলা, উর্দু, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, সংস্কৃত ইত্যাদি ভাষায় সমান দক্ষতায় গান করতে পারতেন। তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য মেহেফিল ছিল দ্বারভাঙার মহারাজা লক্ষণেশ্বর সিংহের দরবারে। এরপর থেকেই গহরজানের নাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

মূল ছবি থেকে এআই দ্বারা পরিমার্জিত

মূল ছবি থেকে এআই দ্বারা পরিমার্জিত

১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে দেশীয় শিল্পীদের গান রেকর্ড করে বাজারজাত করার জন্য কলকাতায় 'গ্রামোফোন ও টাইপরাইটার লিমিটেড' নামে একটি অফিস খোলে। ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ অক্টোবর গেইসবার্গ তাঁর দলবল নিয়ে কলকাতায় পৌঁছান। প্রথমে তিনি মিস্ শশীমুখী ও মিস্ ফণীবালার গানের রেকর্ড করেন। এই সূত্রে রেকর্ডের বাংলা গানের প্রথম শিল্পী হিসেবে মিস্ শশীমুখী এবং মিস্ ফণীবালা স্মরণীয়া হয়ে রয়েছেন। তবে এই গানে গেইসবার্গ সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। এরপর তিনি আরও ভালো কণ্ঠের শিল্পীদের খুঁজতে থাকেন। এর দুই দিন পর, তৎকালিন ক্ল্যাসিকাল থিয়েটারের সহায়তায় গেইসবার্গ আরও কিছু শিল্পীর গান রেকর্ড করেন। এঁদের গানেও গেইসবার্গ সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। এরপর তিনি ১১ই নভেম্বর গহরজানের গান রেকর্ড করেন। এবার গহরজানের গান শুনে গেইসবার্গ মুগ্ধ হন। তিনি গেয়েছিলেন দাদরা অঙ্গের একটি হিন্দি গান। গানটির শিরোনাম হিসেবে উল্লেখ ছিল 'Mahomedan Song'। তাঁর কণ্ঠে রেকর্ডকৃত প্রথম বাংলা গান ছিল 'ভালবাসিবে বলে ভালোবাসিনে।'

তাঁর প্রথম রেকর্ড:

সঙ্গীতাসরে গহরজান

এই সময় থেকে তিনি প্রতিটি গানের অনুষ্ঠানের জন্য সম্মানী নিতেন তিন হাজার টাকা! নিজ প্রতিভাগুণে তিনি সেকালের অভিজাত শিল্পীতে পরিণত হয়েছিলেন। সে সময় তিন থাকতেন নাখোদা মসজিদের পাশেই এক প্রাসাদসম বাড়িতে। এই বাড়ির নাম ছিল ‘গহর বিল্ডিং’। তাঁর বিলাসী জীবনযাপনের কথা সে যুগে লোকের মুখে মুখে ফিরত। শোনা যায় পোষা বেড়ালের বিয়েতে তিনি নাকি খরচ করে ছিলেন কুড়ি হাজার টাকা।

গহরজানকে নিয়ে নানা ধরনের চমকপ্রদ গল্প আছে। শোনা যায়, কলকাতাস্থ জোড়াসাঁকোর মল্লিকবাড়ির এক অনুষ্ঠানে গান শোনাতে এসে, গৃহকর্তা ভাষা অনুসারে শ্রোতাদের বসানোর জন্য অনুরোধ করেন। গৃহকর্তা সেই ব্যবস্থাই করেন। পরে বহুমূল্য অলঙ্কারে সুসজ্জিতা তিনি আসর থেকে প্রাঙ্গণে নেমে প্রথম ইংরেজ সাহেবদের কাছে একটা ইংরেজি গান শোনান। এর পরেই পাঞ্জাবি, মারাঠি, হিন্দি ও বাংলা ভাষীদের কাছে গিয়ে ওই সব ভাষায় গান শোনান।

সে কালের প্রখ্যাত রঙ্গমঞ্জ স্টার থিয়েটারে গান গেয়ে বহুবার শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। সে সময়ে তাঁকে দেখার জন্য রাস্তায় ভিড় জমে যেত। দেশলাইয়ের বাক্সে তাঁর যুক্ত ছবি করা হয়েছিল। সে যুগে পাওয়া যেত গহরজানের ছবিওয়ালা রঙিন পোস্টকার্ড।

তিনি শ্রোতার প্রকৃতি দেখে গান নির্বাচন করতেন। এই কারণে তিনি আসরে মাঝে মাঝে লঘু চালের জনপ্রিয় সাধারণ গান করতে। কিন্তু ওস্তাদী বৈঠকে তিনি গাইতেন খেয়াল, ধ্রুপদ। মূলতানী, মালকোষ, কিংবা ভূপালি রাগের খেয়ালগানে অত্যন্ত পারঙ্গম ছিলেন। তাঁর গাওয়া বহু গান বাঙালি সমাজে অসম্ভব খ্যাতি লাভ করেছিল। এর ভিতরে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো গান  ছিল ‘ফাঁকি দিয়ে প্রাণের পাখি’, ‘আজ কেন বঁধু’, ‘নিমেষেরই দেখা যদি’।

ব্যক্তি জীবনে তাঁর ম্যানেজার পেশওয়ারি যুবক আব্বাস এক সময় খুব ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছিলেন। শোনা যায়, পরে সেই আব্বাসই বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। তাঁর কারণেই গহরজান তাঁর প্রভূত ধনসম্পত্তি হারিয়ে ছিলেন। এ নিয়ে দীর্ঘ মামলা মকদ্দমাও চলেছিল। ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে মাসিক ৫০০ টাকা বেতনে মহীশুর দরবারে সভাগায়িকা নিযুক্ত হয়েছিলেন গহরজান। এই কারণে তাঁর প্রিয় শহর কলকাতা ছেড়ে মহীশুরে চলে গিয়েছিলেন।

১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই জানুয়ারি মহীশুরে তাঁর মৃত্যু হয়।


তথ্যসূত্র :