লালচাঁদ বড়াল
(১৮৭০-১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দ)
সঙ্গীতশিল্পী।

১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে  কলকাতার বহুবাজারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা নবীনচন্দ্র বড়াল ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং হিতবাদী জাতীয়তাবাদী সাপ্তাহিক সাহিত্য পত্রিকার অন্যতম পরিচালক ও অংশীদার। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য সেই সময়ে পত্রিকার মূল সম্পাদক ছিলেন কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য আর সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক ছিলেন যুবক রবীন্দ্রনাথ।

পিতামহ প্রেমচাঁদ ছিলেন সেকালের এক গণ্যমান্য ব্যক্তি। মাতা ছিলেন কলকাতার বিত্তশালী দানবীর সাগর দত্তের কনিষ্ঠা কন্যা।

শৈশব থেকে তিনি সঙ্গীতের প্রতি আসক্ত ছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সমাজে গানবাজনাকে খুব একটা সম্মানের চোখে দেখতো না। লালচাঁদের সঙ্গীতপ্রীতিকে তিনি ভালো চোখে দেখতেন না। তিনি হিন্দু স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি করেছিলেন। স্কুলে থাকাকালীনই লালচাঁদ পাখোয়াজ বাজানো শিখেছিলেন মুরারিমোহন গুপ্তের কাছে। স্কুলে যাতায়াতের পথে ছিল একটি মুদির দোকানলালচাঁদ তাঁর পাখোয়াজ রাখতেন। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে সেখানেই তিনি পাখোয়াজ বাজাতেন। উল্লেখ্য, বাবার উৎসাহ কিংবা সাহায্য না পেলেও লালচাঁদ মায়ের সাহায্য ও অনুপ্ররণা পেয়েছিলেন। তিনি ছেলের সঙ্গীতপ্রীতির কথা তিনি জানতেন এবং ছেলেকে একটি পাখোয়াজ কিনে দিয়েছিলেন। সঙ্গীতের প্রতি তাঁর এই অদম্য আগ্রহ থেকে সরিয়ে আনার জন্য এই কলেজ থেকে এফ.এ পাশ করার পর, তাঁর পিতা তাঁকে  আর কলেজে যেতে দেন নি।

১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতা কাস্টম হাউসের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অল্প বয়সে চাকরি জীবনে ঢুকলেও সঙ্গীতের প্রতি অদম্য টানে তিনি চাকরিতে মনোনিবেশ করতে পারেন নি। তাই তাঁর বেশিরভাগ সময় কেটেছে নানা ধরনের সঙ্গীত সাধনায়।

সেই সময়ে কলকাতার সঙ্গীতের আসরে ধ্রুপদী সঙ্গীতের কদর ছিল। তরুণ পাখোয়াজ বাদক হিসেবে ইতিমধ্যেই লালচাঁদ পরিচিতি লাভ করেছেন। মাঝেমধ্যেই তিনি বন্ধু তথা ধ্রুপদ গায়ক হরিনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সঙ্গত করতেন। হরিনাথ ছিলেন ধ্রপদী অঘোরনাথ চক্রবর্তীর অন্যতম প্রিয় শিষ্য। লালচাঁদের বহু দিনের শখ ছিল অঘোরবাবুর সঙ্গে সঙ্গত করার। এক সময়ে তিনি জানতে পারলেন অঘোরবাবু পাথুরিয়াঘাটায় মহারাজ যতীন্দ্রমোহনের প্রাসাদে রয়েছেন। সেই পরিবারেরই আত্মীয় রণেন্দ্রমোহন ঠাকুর লালচাঁদের বিশেষ বন্ধু ছিলেন। লালচাঁদ একদিন তাঁর ইচ্ছের কথা রণেন্দ্রমোহনকে জানিয়ে অনুরোধ করেছিলেন, অঘোরবাবুকে বলে একদিন তাঁর গানের সঙ্গে সঙ্গত করার ব্যবস্থা করার জন্য। রণেন্দ্রমোহন সে ব্যবস্থা করেছিলেন। নির্ধারিত দিনে নিজের পাখোয়াজটি নিয়ে লালচাঁদ উপস্থিত হলে- অঘোরবাবু বলেছিলেন পরের দিন আসতে বলেন। পরের দিন লালচাঁদ যথাসময়ে হাজির হলেও অঘোরবাবুর সে দিন গান গাওয়ার ইচ্ছে নেই বলে আসর বাতিল করে দেন। তৃতীয় দিনে অঘোরবাবু তাঁর সাথে গান গেতে অস্বীকৃতি জানান। মনের ইচ্ছে পূরণ না হওয়ায় লালচাঁদ অপমানিত বোধ করেন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এত দিন তিনি যে বাদ্যযন্ত্রটি নিয়ে সাধনা করেছেন, সেটি সম্পূর্ণ পরনির্ভর। গায়কের ইচ্ছে না হলে বাদ্যযন্ত্রটিও যেন মূল্যহীন! তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, আর কোনও দিন পাখোয়াজ বাজাবেন না। আর মনে মনে গায়ক হওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।

এরপর তিনি কণ্ঠসঙ্গীতে তালিম নেওয়া শুরু করেন। এই সময় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে এসেছিলেন তৎকালীন গভর্নর, ইংরেজ রাজকর্মচারী ও শহরের প্রভাবশালীরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নবীনচাঁদও। কলেজ কর্তৃপক্ষ ঠিক করেছিলেন সেই অনুষ্ঠানে লালচাঁদ পিয়ানো বাজাবেন ও ইংরেজি গান গাইবেন। কিন্তু প্রথমে লালচাঁদ এতে রাজি হননি। কেননা তিনি ভাল ভাবেই জানতেন, তাঁর বাবা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। তবু কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুরোধে নিরুপায় হয়েই লালচাঁদ রাজি হয়েছিলেন।

লালচাঁদ বড়ালের বাজনা শুনে এবং ইংরেজি গান সবাই তারিফ করলেও তিনি বিরক্ত হয়েছিলেন। সে দিন উপস্থিত দর্শকরা এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, অনুষ্ঠানশেষে ঘোষণা করা হয় লালচাঁদকে পিয়ানোটি উপহার দেওয়া হবে এবং তা দেবেন স্বয়ং গভর্নর।   

বাড়িতে সঙ্গীতচর্চার উপযুক্ত জায়গা না থাকায় লালচাঁদ তাঁর মাকে বার বার বলতে লাগলেন। নবীনচাঁদ প্রথমে রাজি না হলেও, স্ত্রীর কথায় কিছু দিন পরে আলাদা একটি বাড়িতে লালচাঁদের সঙ্গীতচর্চার অনুমতি দেন। ৯৮ প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটে তাঁদের বসতবাড়ির কাছেই ২১ মদনগোপাল লেনের একটি বাড়িতে শুরু হয় লালচাঁদের সঙ্গীতচর্চা। প্রথমে বারাণসীর কাশীনাথ মিশ্রের কাছে ধ্রুপদের তালিম শুরু হয়। বিশ্বনাথ রাওয়ের কাছে ধামার, তারানা ও সরগমের তালিম নিয়ে ছিলেন। এর পরে লালচাঁদ টপ্পা-গুণী রমজান খানের কাছে টপ্পা ও টপ্‌খেয়াল শিখেছিলেন। কিছু দিনের মধ্যেই লালচাঁদ হয়ে উঠেছিলেন তাঁর অন্যতম প্রিয় শিষ্য। এ ছাড়াও লালচাঁদ খেয়াল শিখেছিলেন গোপাল চক্রবর্তীর কাছে।

১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানি তাঁর প্রথম দুটি ডিস্ক রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই রেকর্ড দুটির গান ছিল-
১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের দিকে 'ডোয়ার্কিন এন্ড সন ' তাঁর গানের রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এছাড়া ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে হেমেন্দ্রমোহনের ‘এইচ বোসেস রেকর্ড- এ তিনি গান গেয়েছিলেন।

১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর তিন পুত্রের ভিতরে ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল ছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক। তাঁর অপর দুই পুত্র বিষণচাঁদ ও কিষণচাঁদও সঙ্গীতজগতে খ্যাতিমান হয়েছিলেন।

তাঁর গাওয়া উল্লেখযোগ্য গান হলো-
তথ্যসূত্র: