টোডরমল
(১৫২৩-১৫৮৯ খ্রিষ্টাব্দ)
মোগল সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার সদস্য, অর্থনীতিবিদ, প্রশাসনিক ও ভূমি সংস্কার, মুদ্রাব্যবস্থা সংস্কারক, চার হাজারি মনসবদার, সেনাপতি এবং বিভিন্ন কাজে তিনি আকবরের মুখ্য উপদেষ্টা ছিলেন।

১৫২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৪ নভেন্বর, টোডরমলের বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের লাহারপুরে এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।  শৈশবে তাঁর পিতার মৃত্যু হলে- তাঁর পরিবার অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে।

তাঁর শৈশবের শিক্ষার বিষয় বিস্তারিত জান যায় না। তবে লেখালেখির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেছিলেন।
শেরশাহ সুরি যখন দিল্লির সিংহাসন দখল করেন, তখন তাকে পাঞ্জাবের রোহতাসের একটি নতুন দুর্গ নির্মাণের দায়িত্ব অর্পণ করেন।

১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে
শেরশাহ-এর মৃত্যুর পর ১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দে হুমায়ুন লাহোর দখল করে নেন। এই বৎসরেই তিনি সিকন্দর সুরকে পরাজিত করে দিল্লী ও আগ্রা দখল করেন মোলগ সম্রাট হুমায়ুন। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর দিল্লীর সিংহাসনে বসেন আকবর। সম্রাট আকবর প্রথমে টোডর মলকে আগ্রার দায়িত্ব প্রদান করেন। পরে তাকে গুজরাটের গভর্নর করা হয়।

১৫৬৭ খ্রিষ্টাব্দে চিতৌড় দখলের পর  (ডিসেম্বর,  একটি সুড়ঙ্গ তৈরির ড়ানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন টোডরমল। ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে সুরাতে শত্রুপক্ষের শক্তি পরীক্ষার কাজ দেওয়া হয়েছিল তাঁকেই। ১৫৭২-৭৩ খ্রিষ্টাব্দে গুজরাতের ভূমি-রাজস্বের বন্দোবস্ত করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের কর্‌রানি রাজবংশের দাউদ মোগল শাসন অগ্রাহ্য করলে আকবরের নির্দেশে টোডরমল ও
মুনিম খান দাউদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়।

মুনিম খান ২০,০০০ সৈন্য নিয়ে বাংলার দিকে অগ্রসর হন এবং বিনা বাধায় সুরজগড়, মুঙ্গের, ভাগলপুর ও কহলগাঁও অধিকার করেন। এরপর তিনি তেলিয়াগড়ি গিরিপথে এসে পৌঁছালে, দাউদ প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করেন। মুনিম খান স্থানীয় জমিদারদের সাহায্যে রাজমহল পবর্তমালার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। এরপর ১৫৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বাংলার রাজধানী তান্ডায় প্রবেশ করেন। ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ৩ মার্চ সুবর্ণরেখা নদীর নিকট সংঘটিত তুকারয়ের যুদ্ধে দাউদ পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান। এরপর রাজা টোডরমলের ভিন্ন পথে ভদ্রকে উপস্থিত হন। দাউদ আত্মরক্ষার জন্য কটক দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। রাজা টোডরমলের কটক অবরোধ করলে দাউদ নিরুপায় হয়ে সন্ধির প্রস্তাব দেন। ১২ এপ্রিল তিনি মুনিম খানের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। উভয়পক্ষে সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।

গুজরাতের বিশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থা ঠিক করার জন্য আকবর ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে সুবাদার করে সেখানে পাঠান।

বাংলাদেশে নিযুক্ত সেনাপতি মুনিম খাঁর মৃত্যুর পর- মোগল সেনাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। এই সময় অনেক সৈন্য বাংলা ত্যাগ করা শুরু করে। ফলে বাংলাদেশে মোগলশাসনমুক্ত হ্‌ওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এই অবস্থায় বাংলাদেশের মীর্জা হাকিম স্বাধীনতা ঘোষণা করে।  এই সময় আকবর টোডরমলে নেতৃত্বে একদল সৈন্য প্ররণের সিদ্ধান্ত নেন।
১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দে টোডরমলের বঙ্গের জায়গীরদারদের বিদ্রোহ দমন করার জন্য বঙ্গদেশে আসেন এবং এই বিদ্রোহ দমন করে- বাংলাকে মোগল শাসনাধীনে সমর্থ হন। এই সময় বাংলার সুবেদার ছিলেন মুজাফফর খান তুরবারি।

তিনি বিভিন্ন সময়ে বাংলায় আকবরের টাকশাল পরিচালনা করেন এবং পাঞ্জাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলার জমিদারদের কাছ থেকে রাজস্ব নেওয়ার রীতি প্রচলন করেন। কাটোয়ার খাজুরডিহি গ্রামের ভগবানচন্দ্র রায়কে তিনি বাংলা, বিহার, উড়িশার প্রধান কানুনগো হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন।

টোডরমলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান, যা আজও প্রশংসিত হয়। তিনি আকবরের মুঘল সাম্রাজ্যের রাজস্ব ব্যবস্থাকে সংশোধন করেছিলেন। তিনি উত্তরপ্রদেশের সীতাপুর জেলার লাহারপুরে একটি দুর্গ-প্রাসাদ নির্মাণ করেন। টোডর মল ভাগবত পুরাণ ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করেন ।

১৫৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৪ নভেম্বর  টোডারমল লাহোরে মৃত্যুবরণ করেন।