বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: দিনগুলি মোর পদ্মেরই দল যায় ভেসে' যায় কালের স্রোতে
দিনগুলি মোর পদ্মেরই দল যায় ভেসে' যায় কালের স্রোতে
ওগো সুদূর ওগো বিধূর তোমার সাগর-তীর্থ-পথে॥
বিফল দিনের কমলগুলি
পড়লো ঝ'রে পাপড়ি খুলি'
নিও প্রিয় তাদের তুলি' দিন শেষের ম্লান আলোতে॥
সঞ্চিত মোর দিনগুলি হায় ছড়িয়ে গেল অযতনে;
তোমার বরণ-মালা গাঁথা হলো না আর এ জীবনে।
অন্য মনে কখন বেভুল
ভাসিয়ে দিলাম দলি' সে ফুল
বঞ্চিত তাই হবে কি হায় তোমার চরণ-ছোঁওয়া হ'তে॥
- ভাবসন্ধান: মানুষের জীবন
অমূল্য সময়ের সমষ্টি; কিন্তু অসচেতনতা ও অন্যমনস্কতায় সেই সময় নষ্ট হয়ে গেলে
জীবনের কাঙ্ক্ষিত সাধনা ও আত্মনিবেদনের মালা আর গাঁথা হয়ে ওঠে না। জীবনের
অন্তিম মুহূর্তে তাই অনুতপ্ত হৃদয় পরমপ্রিয় তথা পরমসত্তার কাছে প্রার্থনা করে—বিফল ও ঝরে-পড়া
দিনগুলোকেও যেন তিনি করুণার সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং সেই অপূর্ণ জীবনের মানুষটিকে
তাঁর চরণ-স্পর্শ থেকে বঞ্চিত না করেন। এই ভাবদর্শে রচিত এই গানে কবি তাঁর অতীত জীবনকে পদ্মের পাপড়ির মতো একে একে কালের স্রোতে ভেসে যাওয়া দিনগুলোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। জীবনের প্রতিটি দিন ছিল যেন একটি করে পদ্মের দল, যা সময়ের প্রবাহে ধীরে ধীরে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। সেই দিনগুলো ভেসে চলেছে সুদূর ও বিধূর পরমপ্রিয়ের সাগর-তীর্থের পথে—অর্থাৎ পরমসত্তার সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষিত পথে।
কিন্তু কবির মনে গভীর আক্ষেপ- জীবনের অনেক দিনই তাঁর কাছে বিফল দিনের কমল হয়ে ঝরে পড়েছে। সেই দিনগুলোকে তিনি কোনো মহৎ সাধনা বা প্রেমের অর্ঘ্যে পরিণত করতে পারেননি। তাই জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তিনি প্রিয়তমের কাছে অনুরোধ করছেন, তাঁর সেই ঝরে-পড়া, বিবর্ণ দিনগুলোকেও যেন অবহেলা না করে দিনশেষের ম্লান আলোয় কুড়িয়ে নেন। অর্থাৎ, জীবনে যা কিছু অপূর্ণ ও ব্যর্থ হয়ে গেছে, পরমপ্রিয় যেন তার মধ্যেও তাঁর আন্তরিকতার সামান্যতম অর্ঘ্যটুকু গ্রহণ করেন।
কবি আরও উপলব্ধি করছেন, তাঁর জীবনে যে দিনগুলো সঞ্চিত হয়েছিল, সেগুলোও তিনি অযত্নে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সেই দিনগুলোর ফুল দিয়ে প্রিয়তমের জন্য যে বরণমালা গাঁথার কথা ছিল, তা আর গাঁথা হয়ে ওঠেনি। জীবনের মূল্যবান সময়কে পরমপ্রিয়ের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার পরিবর্তে তিনি কখনো অসচেতনভাবে, কখনো অন্যমনস্কতায় সেই ফুলগুলো ভাসিয়ে দিয়েছেন।
এখন জীবনের অন্তিম সময়ে তাঁর মনে তাই এক গভীর সংশয় ও বেদনা—এভাবে জীবনের ফুলগুলো নষ্ট করে ফেলার কারণে তিনি কি তবে প্রিয়তমের চরণ-স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হবেন? তাঁর এই প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে অনুতাপ, আত্মসমালোচনা এবং একই সঙ্গে পরমপ্রিয়ের করুণার প্রত্যাশা।
- রচনাকাল:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। পূর্বাচল পত্রিকার
আশ্বিন ১৩৪১ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৩৪) সংখ্যায় গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল
৩৫ বৎসর ৪ মাস।
- রেকর্ড:
এইচএমভি। এপ্রিল ১৯৩৫ (চৈত্র ১৩৪১-বৈশাখ ১৩৪২) এন ৭৩৫০। শিল্পী: যূথিকা রায়
- পত্রিকা: পূর্বাচল।
সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ (১৫ ভাদ্র-১৩ আশ্বিন ১৩৪১)
- স্বরলিপি:
সুধীন দাশ।
[নজরুল-সঙ্গীত
স্বরলিপি, ষষ্ঠ খণ্ড (নজরুল ইন্সটিটিউট, ফাল্গুন ১৪০৩। ফেব্রুয়ারি
১৯৯৭)-এর
১৪ সংখ্যক
গান। পৃষ্ঠা: ৭২-৭৬।]
[নমুনা]
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: পরমসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। অনুশোচনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য