তুমি আমায় যবে জাগাও গুণী তোমার উদার সঙ্গীতে
মোর হাত দ'টি হয় লীলায়িত নমস্কারের ভঙ্গিতে॥
সিন্ধু জলের জোয়ার সম, ছন্দ নামে অঙ্গে মম
রূপ হলো মোর নিরুপম তোমার প্রেমের অমৃতে॥
আমার আঁখির পল্লবদল উদাস অশ্রুভারে,
ভোরের করুণ তারার মতো কাঁপে বারেবারে।
আনন্দে ধীর বসুন্ধরা, হলো চপল নৃত্যপরা
ঝরে রঙের পাগল ঝোরা তোমার চরণ রঞ্জিতে॥
- ভাবসন্ধান: পরমাত্মার স্পর্শে জীবাত্মার জাগরণ, আত্মসমর্পণ ও রূপান্তরের এক নান্দনিক চিত্র ফুটে উঠেছে। ভক্তি, প্রেম, বিরহ ও মহাজাগতিক আনন্দৎসব মিলিয়ে ভক্তের সত্তায় যে রূপান্তর ঘটে, তারই এক নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই গানে।
এখানে 'গুণী' বলতে সেই পরম স্রষ্টাকে বোঝানো হয়েছে, যাঁর সৃষ্টির সুরে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অনুরণিত। তাঁর 'উদার সঙ্গীত' হলো বিশ্বপ্রকৃতির ছন্দ ও ঐশ্বরিক আহ্বান। এই সুরের স্পর্শে মানুষের জড়তা দূর হয় এবং ঘটে আত্মিক জাগরণ। তখন ভক্তের স্বতঃস্ফূর্ত ভক্তি হয়ে ওঠে বিনম্র আত্মসমর্পণ। ভক্ত করজোড়ে নিজেকে নিবেদন করে লীলায়িত নমস্কারে।
জোয়ারের জল যেমন নদ-নদীকে কানায় কানায় ভরিয়ে দেয়, পরমেশ্বরের সান্নিধ্য তেমনি ভক্তের দেহ-মনে এক স্বর্গীয় ছন্দের সঞ্চার করে। এই ছন্দ হলো আনন্দের স্পন্দন। স্রষ্টার প্রেমের পরশ যখন ভক্তকে স্পর্শ করে, তখন তার সাধারণ রূপ মর্ত্যের ঊর্ধ্বে উঠে 'নিরুপম' বা অতুলনীয় হয়ে ওঠে। প্রেমের এই অমৃত আস্বাদন ভক্তকে সাধারণ থেকে অসাধারণে রূপান্তর করে।
পরমসত্তাকে মিলনানন্দে পাওয়ার ব্যকুলতায় চোখের পাতা ভারি হয়ে ওঠে অশ্রুতেল ভোরের তারা যেমন দিনের আলো আসার মুহূর্তে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায় কাঁপে, ভক্তের হৃদয়ও তেমনি পরম জ্যোতির মাঝে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার পূর্বক্ষণে কম্পিত হয়।
পরমসত্তার সাথে সম্পূর্ণ মিলনের আকাঙ্ক্ষায় ভক্তের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। সূর্যের আলোয় যেমন ভোরের করুণ তারার মতো বিলীন হওয়ার পূর্বমুহূর্তে কাঁপে- ভক্তের হৃদয়ও তেমনি পরমসত্ত্বার জ্যোতিতে আত্মবিসর্জনের শিহরিত হয়। এখানে অশ্রু দুঃখের নয়, বরং প্রাপ্তির আকুলতার। ভক্ত মনে করেন জগতের সমস্ত সৌন্দর্য সেই পরমসত্তার চরণে নিবেদিত হয়, তা একটি আরাধনা মাত্র। মূলত ভক্তি ও প্রেমের মাধ্যমে আত্মার শুদ্ধিকরণ। যখন মানুষ তার অহং ত্যাগ করে মহান স্রষ্টার সুরের সাথে নিজের জীবনকে মিলিয়ে দেয়, তখন দুঃখ-অশ্রু সবকিছু আনন্দের রঙে পরিণত হয়। জীবন তখন আর বোঝা থাকে না, বরং স্রষ্টার চরণে নিবেদিত একটি 'লীলায়িত নমস্কার' হয়ে ওঠে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৪) মাসে এইচএমভি গানটির রেকর্ড করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৫১
- রেকর্ড: এইচএমভি [জুন ১৯৩৭ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৪)। এন ৯৯০১। শিল্পী: রেণু বসু। সুর: নজরুল ইসলাম]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সুধীন দাশ। নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (নবম খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ, তৃতীয় মুদ্রণ [কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। ২ পৌষ, ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ/ ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ। অষ্টম গান] [নমুনা]
- সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম।
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পর্মসত্তা, আত্মনিবেদন
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: দাদরা
- গ্রহস্বর: ঋসা