বিষয়:নজরুলসঙ্গীত।
শিরোনাম: আধো ধরণী আলো আধো আঁধার।
আধো ধরণী আলো আধো আঁধার।
কে জানে দুখ-নিশি পোহাল কার॥
আধো কঠিন ধরা আধেক জল,
আধো মৃণাল-কাঁটা আধো কমল।
আধো সুর, আধো সুরা — বিরহ, বিহার॥
আধো ব্যথিত বুকের আধেক আশা,
আধেক গোপন আধেক ভাষা!
আধো ভালোবাসা আধেক হেলা
আধেক সাঁঝ আধো প্রভাত-বেলা
আধো রবির আলো — আধো নীহার॥
- ভাবসন্ধান: জীবন কোনো একক ও সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতার নাম নয়; এটি বিপরীত অনুভূতি ও অবস্থার এক অনন্ত সমন্বয়। আলোকে যেমন আঁধারের বিপরীতে বুঝতে হয়, সুখকে তেমনি দুঃখের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়। কবির দৃষ্টিতে পৃথিবীর এই আধো-আলো আধো-আঁধার, পাওয়া ও না-পাওয়ার মধ্যবর্তী অবস্থাই মানবজীবনের প্রকৃত ও চিরন্তন রূপ। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে কবি মানবজীবন ও বিশ্বপ্রকৃতির এক চিরন্তন দ্বৈত সত্যকে তুলে ধরেছেন। এই পৃথিবী কখনো সম্পূর্ণ আলোয়, আবার কখনো সম্পূর্ণ অন্ধকারে আবৃত নয়; জীবনও তেমনি সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, মিলন-বিরহ, সৌন্দর্য-বেদনা এবং পাওয়া-না-পাওয়ার সমন্বয়ে গঠিত। তাই কবির চোখে সমগ্র জগৎ যেন ‘আধো’—অর্থাৎ অসম্পূর্ণতার মধ্য দিয়েই পূর্ণতার সন্ধানী।
গানের শুরুতে কবি উপস্থাপন করেছেন- ‘আলো ও আঁধার’ এই দুই সত্তার সন্ধিক্ষণকে। এই সন্ধিক্ষণে কার জীবনের দুঃখের রাত্রি শেষ হলো, আর কার জীবনে এখনও অন্ধকার রয়ে গেল—তা কেউ জানে না। একজনের জীবনে যখন প্রভাত আসে, অন্য কারও জীবনে তখনও দুঃখের নিশি বিরাজমান থাকতে পারে। মানবজীবনের সুখ ও দুঃখের এই আপেক্ষিক এবং রহস্যময় অবস্থাই এখানে প্রকাশিত হয়েছে।
গানের পরবর্তী অংশে কবি পৃথিবীর দ্বৈত রূপকে নানা প্রতীকের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। ‘আধো কঠিন ধরা আধেক জল’—পৃথিবীর গঠন যেমন স্থল ও জলের মিলনে সম্পূর্ণ, তেমনি জীবনের প্রকৃতিও বিপরীত উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। ‘আধো মৃণাল-কাঁটা আধো কমল’—সৌন্দর্যের সঙ্গে কষ্ট, কোমলতার সঙ্গে আঘাত এবং সুখের সঙ্গে বেদনা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। পদ্মের সৌন্দর্য যেমন তার জন্মের পরিবেশ ও মৃণালের সঙ্গে সম্পর্কিত, তেমনি জীবনের আনন্দও বহু সময় দুঃখের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। ‘আধো সুর, আধো সুরা—বিরহ, বিহার’ পঙ্ক্তিতে কবি জীবনের রসের দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতাকে পাশাপাশি এনেছেন। সুর যেমন হৃদয়কে সৌন্দর্য ও অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়, সুরা তেমনি মানুষের চৈতন্যকে অন্য এক আবেশে আচ্ছন্ন করে। আবার বিরহ ও বিহার—বিচ্ছেদ ও আনন্দময় মিলন—এই দুই বিপরীত অনুভূতিই মানবপ্রেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
গানটির পরবর্তী অংশে পরবর্তী স্তবকে মানুষের অন্তর্জগতের অসম্পূর্ণতা ও দ্বিধাবিভক্ত অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। ‘আধো ব্যথিত বুকের আধেক আশা’—দুঃখে জর্জরিত হৃদয়েও আশা সম্পূর্ণ নিভে যায় না। আবার সেই আশাও পূর্ণ নয়; জীবনের অনিশ্চয়তা তাকে আধখানা করে রাখে। ‘আধেক গোপন আধেক ভাষা’—মানুষ তার সমস্ত অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। হৃদয়ের কিছু কথা উচ্চারিত হয়, আর কিছু কথা চিরকাল অব্যক্ত থেকে যায়।
গানটির শেষাংশে প্রেম ও সময়ের দ্বৈততা আরও গভীরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘আধো ভালোবাসা আধেক হেলা’—মানুষের সম্পর্কেও সম্পূর্ণ সমর্পণ ও সম্পূর্ণ অবহেলা সব সময় থাকে না; অনেক সম্পর্কের মধ্যে প্রেমের সঙ্গে অভিমান, আকর্ষণের সঙ্গে উদাসীনতা মিশে থাকে। তেমনি ‘আধেক সাঁঝ আধো প্রভাত-বেলা’ হলো সময়ের সন্ধিক্ষণের প্রতীক—যেখানে একটি অবস্থা শেষ হচ্ছে, আর একটি নতুন অবস্থার সূচনা হচ্ছে।
‘আধো রবির আলো—আধো নীহার’ পঙ্ক্তিতে গানটির মূল দর্শন আবার প্রকট হয়ে উঠেছে। সূর্যের আলো ও কুয়াশা মিলেমিশে যেমন পৃথিবীকে এক অস্পষ্ট, আধো-আলো আধো-আঁধারের রূপ দেয়, তেমনি জীবনও কখনো সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। মানুষের ভাগ্য, সুখ, দুঃখ, প্রেম ও ভবিষ্যৎ—সবকিছুর মধ্যেই এক ধরনের রহস্য ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
এই গানটি 'আলেয়া' গীতিনাট্যে প্রস্তাবনা'র গান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। উল্লেখ্য, কল্লোল পত্রিকার 'আষাঢ় ১৩৩৬' সংখ্যার 'সাহিত্য-সংবাদ' বিভাগে' বিষয়ে
একটি তথ্য পাওয়া যায়। তথ্যটি হলো-
'নজরুল ইসলাম একখানি অপেরা লিখেছেন।
প্রথমে তার নাম দিয়েছিলেন 'মরুতৃষ্ণা'। সম্প্রতি তার নাম বদলে 'আলেয়া' নামকরণ
হয়েছে। গীতি-নাট্যখানি সম্ভবত মনোমোহনে অভিনীত হবে। এতে গান আছে ত্রিশখানি। নাচে
গানে অপরূপ হয়েই আশা করি এ অপেরাখানি জনসাধারণের মন হরণ করেবে।'
এই বিচারে ধারণা করা যায়, গানটি নজরুল রচনা করেছিলেন, ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের
জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসের দিকে। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩০ বৎসর ১ মাস।
- মঞ্চস্থ নাটক:
আলেয়া।
'
নাট্যনিকেতন'
রঙ্গমঞ্চ। ৩রা পৌষ ১৩৩৮ (শনিবার ১৯ ডিসেম্বর ১৯৩১)। চরিত্র: কাকলি ও সখীরা।
- গ্রন্থ:
- আলেয়া।
- প্রথম সংস্করণ [ডি,এম, লাইব্রেরী। ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ। প্রথম অঙ্ক:
মালার গান।]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮।
মে ২০১১। আলেয়া। প্রথম অঙ্ক: তরুণীদের গান। পৃষ্ঠা: ৩২৬-৩২৭]
-
নজরুল-গীতিকা।
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০। ঠুংরী । তিলক-কামোদ-পিলু-কাওয়ালি। পৃষ্ঠা ৪৫]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা
ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭] নজরুল গীতিকা। ৩৩।
ঠুংরী। তিলক-কামোদ-পিলু। পৃষ্ঠা: ১৯৫-১৯৬]
- নজরুল-সংগীত সংগ্রহ
[রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ১৮৩৪]
- পত্রিকা:
- নাচঘর। ২ পৌষ ১৩৩৮ (শুক্রবার ১৮ ডিসেম্বর ১৯৩১)।
আলেয়ার গান